রাজবাড়ীতে তীব্র গরমে ডায়রিয়ার প্রকোপ, হাসপাতালে ঠাঁই নেই

রাজবাড়ীতে তীব্র গরমে ডায়রিয়ার প্রকোপ, হাসপাতালে ঠাঁই নেই
হাসপাতালের মেঝেতে রোগীর ভিড়। ছবি: টাইমস
Advertisement
Advertisement

রাজবাড়ীতে অসহনীয় গরমে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। জেলাজুড়ে অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে ডায়রিয়া ও নিউমোনিয়াসহ বিভিন্ন গরমজনিত রোগের প্রকোপ। অতিরিক্ত রোগীর চাপে রাজবাড়ী জেলা সদর হাসপাতালে এখন তিল ধারণের ঠাঁই নেই। ধারণক্ষমতার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি রোগী সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসক ও সেবিকারা।

১০০ শয্যা বিশিষ্ট এই হাসপাতালে বর্তমানে চিকিৎসাধীন আছেন ২৯২ জন রোগী। এর মধ্যে শুধু  ডায়রিয়া ওয়ার্ডেই ভর্তি আছেন ৪৪ জন। মঙ্গলবার পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় অনেক নতুন রোগী ভর্তি হয়েছেন। তাদের মধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ১৪ জন। শয্যা না পেয়ে অনেক রোগীকে হাসপাতালের নিচতলা, দোতলা ও তিনতলার বারান্দা এবং মেঝেতে শুয়ে চিকিৎসা নিতে দেখা গেছে।

ডায়রিয়ার পাশাপাশি শিশু ওয়ার্ডেও রোগীর ভিড় ক্রমেই বাড়ছে। সেখানে নিউমোনিয়া, জ্বর ও সর্দি-কাশি নিয়ে অনেক শিশু ভর্তি আছে। বর্তমানে সেখানে চিকিৎসাধীন আছে ১১ জন হামের রোগীসহ বেশ কিছু শিশু। এছাড়া পুরুষ ও মহিলা মেডিসিন ওয়ার্ডেও রোগীর সংখ্যা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি দেখা গেছে।

হাসপাতালের চিকিৎসকরা জানান, হঠাৎ আবহাওয়া পরিবর্তন ও প্রচণ্ড গরম জনস্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। বিশেষ করে ডায়রিয়া, টাইফয়েড, কলেরা ও জন্ডিসের মতো পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব বেড়েছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় তারা সাধারণ মানুষকে বিশুদ্ধ পানি পানের পরামর্শ দিচ্ছেন।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, সীমিত জনবল ও শয্যা নিয়ে তারা সাধ্যমতো সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। তবে গরমের তীব্রতা না কমলে রোগীর এই চাপ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

সদর উপজেলার মিজানপুর থেকে আসা শিশু রোগী করিম শেখের বাবা বলেন, দুই দিন ধরে তার ছেলের পাতলা পায়খানা ও বমি থামছে না। হাসপাতালে বেড খালি না থাকায় বাধ্য হয়ে বারান্দায়  চাদর বিছিয়ে ছেলেকে শুইয়ে রেখেছেন। ফ্যান থাকলেও বারান্দায় বাতাস লাগছে না বলে গরমে শিশুটি আরও ছটফট করছে।

আরও পড়ুন

হাসপাতালের বারান্দায় থাকা রোগী সাফিয়া বেগম জানান, তার মা প্রচণ্ড জ্বরে প্রায় অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার মতো অবস্থায় আছেন। রোগীর ভিড় এত বেশি যে নার্সদের সময়মতো পাওয়া যাচ্ছে না। চারদিকে মানুষের গাদাগাদি আর গরমে সুস্থ মানুষই অসুস্থ হয়ে যাওয়ার মতো পরিবেশ তৈরি হয়েছে।

হাসপাতালের নিচতলায় চিকিৎসাধীন এক বৃদ্ধের নাতি রাশেদ ইসলাম বলেন, তার দাদা গরমে কাজ করতে গিয়ে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। ডাক্তার জানিয়েছেন তার শরীরে পানিশূন্যতা হয়েছে এবং এখন স্যালাইন চলছে। হাসপাতালের পরিবেশ খুব গরম হওয়ায় তিনি বাইরে থেকে ফ্যান কিনে এনে চালানোর কথা ভাবছেন।

পাংশা থেকে আসা রোগীর স্বজন আমেনা খাতুন বলেন, ওয়ার্ডের ভেতরে জায়গা না পেয়ে তারা সিঁড়ির পাশে আশ্রয় নিয়েছেন। এই রোদ আর গরমে বারান্দায় থাকা খুব কষ্টের হলেও বাড়িতে চিকিৎসা করার মতো অবস্থা নেই বলে তারা এখানেই পড়ে আছেন।

হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডাঃ শেখ মোঃ আব্দুল হান্নান বলেন, তীব্র দাবদাহ ও অসহনীয় গরমের কারণে জেলায় ডায়রিয়ার প্রকোপ অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। প্রচণ্ড গরম ও খাদ্যাভ্যাসের অনিয়মের কারণে মানুষ ডায়রিয়া, নিউমোনিয়া ও জ্বরে আক্রান্ত হচ্ছে।

তিনি জানান, হাসপাতালে ধারণক্ষমতার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি রোগী হওয়ায় সেবা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। তবে সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও হাসপাতাল থেকে প্রয়োজনীয় সব ওষুধ ও স্যালাইন সরবরাহ নিশ্চিত করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

এই অবস্থায় ডাঃ আব্দুল হান্নান পরামর্শ দিয়ে বলেন, গরমে কোনোভাবেই পচা বা বাসি খাবার খাওয়া যাবে না। রান্নার ৬ ঘণ্টার বেশি সময় পার হওয়া খাবার এড়িয়ে চলতে হবে। শিশু ও বড়দের সবসময় টাটকা খাবার এবং প্রচুর পরিমাণে বিশুদ্ধ পানি পান করতে হবে। সুস্থ থাকতে রোদ থেকে ফিরে বাইরের খোলা খাবার বা পানীয় পান করা থেকে বিরত থাকতে হবে।

তিনি আরও বলেন, বাচ্চাদের শরীর ঘেমে গেলে দ্রুত তা মুছে দিতে হবে যেন ঠান্ডা লেগে নিউমোনিয়া না হয়। ডায়রিয়ার লক্ষণ দেখা দিলেই বেশি বেশি বিশুদ্ধ পানি ও খাবার স্যালাইন খাওয়া শুরু করতে হবে। তবে যদি পাতলা পায়খানার পাশাপাশি বমি শুরু হয়, তবে দেরি না করে দ্রুত হাসপাতালে এসে চিকিৎসা নিতে হবে।

এদিকে তীব্র গরমে শ্রমজীবী মানুষের কষ্ট এখন চরমে পৌঁছেছে। রোদ ও হিটস্ট্রোক থেকে বাঁচতে অনেককে ছাতা ও কালো চশমা ব্যবহার করতে দেখা যাচ্ছে। চিকিৎসকরা বলছেন, এই প্রচণ্ড গরমে প্রয়োজন ছাড়া ঘরের বাইরে বের হওয়া উচিত নয়। শিশুদের শরীর ঘেমে গেলে দ্রুত মুছে দেওয়া এবং প্রচুর পরিমাণে বিশুদ্ধ পানি ও তরল খাবার খাওয়ানোর পরামর্শ দিচ্ছেন তারা।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর