ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে এক আবেগঘন পরিবেশে শিক্ষার্থীদের মুখোমুখি হয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দীর্ঘ ৩৫ বছর পর নিজের প্রিয় ক্যাম্পাসে ফিরে তিনি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সরাসরি মতবিনিময় করেন।
এ সময় দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, দুর্নীতি দমন, শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষা নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা করেন। মঙ্গলবার দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মুজাফফর আহমদ চৌধুরী অডিটোরিয়ামে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নের শর্ত
অনুষ্ঠানে চারুকলা অনুষদের স্নাতকোত্তর পর্বের শিক্ষার্থী কাবেরী আজাদের প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী দেশের সামগ্রিক স্থিতিশীলতার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
তিনি বলেন, ‘দেশে যদি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে না পারি, তবে আমরা কোনো কিছুই স্থায়ীভাবে গড়ে তুলতে পারব না। যা তৈরি হবে, তা ভেঙে যাবে।’
তিনি শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে বলেন, ভবিষ্যৎ আপনাদের। তাই সমাজ ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি ইতিবাচক জনমত তৈরি করতে হবে যাতে রাজনীতি রাজপথের বিশৃঙ্খলা থেকে বেরিয়ে এসে সংসদীয় ও আলোচনার সংস্কৃতিতে ফিরে আসে। প্রধানমন্ত্রীর মতে, কোনো কিছু গড়ার জন্য শান্ত পরিবেশ ও গভীর চিন্তার প্রয়োজন।
জাদুঘর ও সাংস্কৃতিক আধুনিকায়ন
শিল্পের বাজার এবং মিউজিওলজি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের মিউজিয়ামগুলো বর্তমানে অবহেলিত বা এতিম হয়ে পড়ে আছে। দক্ষ কিউরেটর ও বিশেষজ্ঞ তৈরির জন্য সরকার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছে।’
এ বিষয়ে শিক্ষা ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়কে কাজ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ব্রিটিশ পার্লামেন্টের আদলে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ ভবনকেও শিশুদের জন্য শিক্ষামূলক ভ্রমণের আওতায় আনা হয়েছে, যাতে তারা দেশের সংসদীয় ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্পর্কে জানতে পারে।

দুর্নীতির লাগাম টানা ও অর্থপাচার রোধ
ইসলামী ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষার্থী মোবাশেরুজ্জামান হাসান হলের আসন সংকট ও চাকরিতে অনিয়ম নিয়ে প্রশ্ন করলে প্রধানমন্ত্রী বিগত সময়ের দুর্নীতির চিত্র তুলে ধরেন। তিনি রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ‘বালিশ কাণ্ড’ ও ১৬ বিলিয়ন ডলার পাচারের উদাহরণ টেনে বলেন, যদি এই বিপুল পরিমাণ সম্পদ পাচার না হতো, তবে দেশের প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসন ও খাবারের সমস্যার স্থায়ী সমাধান করা সম্ভব হতো।
দুর্নীতি প্রসঙ্গে তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, ‘জিরো টলারেন্স’ শব্দটি অনেক সময় অবাস্তব মনে হতে পারে। কারণ, এটি একটি দীর্ঘকালীন অভ্যাসের বিষয়। তবে সরকার দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে।
তিনি নাগরিকদের মানসিকতা পরিবর্তনের ওপর গুরুত্ব দিয়ে বলেন, পানির অপচয় বা নিয়ম না মানাও এক ধরনের অনৈতিকতা।
শিক্ষক নিয়োগে রাজনৈতিক প্রভাব ও র্যাঙ্কিং
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক র্যাঙ্কিং পিছিয়ে থাকা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী আক্ষেপ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, অতীতে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে মেধার চেয়ে ‘পলিটিক্যাল বায়াসনেস’ বা রাজনৈতিক আনুগত্যকে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।
তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যকে অনুরোধ করেন, আগামীতে যেন শুধুমাত্র একাডেমিক রেজাল্ট, মেধা এবং গবেষণা বা পাবলিকেশনের ভিত্তিতে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়।
মাতৃভাষা ও পারিবারিক শিক্ষা
শিক্ষার্থী আল-আমিনের প্রশ্নের প্রেক্ষিতে ইংলিশ মিডিয়াম কারিকুলাম ও মাতৃভাষার গুরুত্ব নিয়ে প্রধানমন্ত্রী তার নিজের মেয়ে জাইমা রহমানের উদাহরণ দেন।
তিনি জানান, দীর্ঘ ১৭ বছর ইংল্যান্ডে থাকার পরও জাইমা দেশের অধিকাংশ উপজেলার নাম জানে এবং তার কথা বলায় কোনো বিদেশি প্রভাব নেই।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, নিজের ভাষার প্রতি ভালোবাসা গড়ে তোলা পরিবারের দায়িত্ব। এটি আইন দিয়ে নয়, বরং মানসিকতা দিয়ে অর্জন করতে হবে।
বক্তব্যের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী ৩৫ বছর পর ক্যাম্পাসে আসার অনুভূতি ব্যক্ত করেন। হেঁটে কলাভবনের চারপাশ দেখার ইচ্ছা থাকলেও নিরাপত্তার কারণে তা সম্ভব না হওয়ায় তিনি দুঃখ প্রকাশ করেন। তিনি শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেন, ‘আপনারা কেমন বাংলাদেশ দেখতে চান, তা আমাকে জানান। আমরা আপনাদের স্বপ্নগুলোকে নিয়েই কাজ করতে চাই।’
অনুষ্ঠানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এবিএম ওবায়দুল ইসলাম এবং মোর্শেদ হাসান খানসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের ঊর্ধ্বতন শিক্ষক ও দুই শতাধিক শিক্ষার্থী উপস্থিত ছিলেন।


