রাজনৈতিক প্রভাব থেকে বের হতে পারছে না জাতীয় প্রেস ক্লাব। দীর্ঘদিন থেকে রাজনীতিকরণে জাতীয় এই প্রতিষ্ঠানটির সুনাম মুখ থুবড়ে পড়েছে।
প্রতিষ্ঠার পর থেকে প্রতিটি গণতান্ত্রিক সংগ্রাম ও আন্দোলনে বিশেষ ভূমিকা রাখা প্রতিষ্ঠানটির বেশিরভাগ সদস্যের মাঝে এখন দেখা দিয়েছে চাপা ক্ষোভ ও হতাশা। সবশেষ প্রতিষ্ঠানটির ২০২৬-২০২৭ মেয়াদের নির্বাচন স্থগিত হওয়ার পর বিষয়টি ফের আলোচনায় এসেছে।
সদস্যরা বলছেন, আগামী ৩১ ডিসেম্বর জাতীয় প্রেস ক্লাবের দ্বিবার্ষিক ওই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ‘সব কয়জন সভাপতি প্রার্থী এবং তিনজনের মধ্যে দুইজন সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী নির্বাচন স্থগিতের আবেদনের কথা বলেই নির্বাচন পরিচালনা কমিটি বৃহস্পতিবার ওই নির্বাচন স্থগিত করেছে।
মূলত ‘বিশেষ রাজনৈতিক’ কারণে নির্বাচন স্থগিত করা হয়েছে বলে একাধিক সূত্রে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
স্থগিত হওয়া নির্বাচনে একজন সাধারণ সম্পাদক প্রার্থীসহ বেশ কয়েকজন ক্ষুব্ধ সদস্য প্রেস ক্লাবের ভোট বন্ধ হয়েছে বলেও ফেসবুক স্ট্যাটাসও দিয়েছেন।
২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর চলমান কমিটির মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তার কয়েক মাস আগে অর্থাাৎ ২০২৪ সালের ৫ আগস্টে গণঅভ্যুত্থানে সরকার পতনের পর বিশেষ পরিস্থিতিতে একটি ‘বিশেষ গোষ্ঠী’ তাদের নিজ স্বার্থে নামমাত্র বিশেষ সাধারণ সভা দেখিয়ে কমিটির মেয়াদ এক বছর বাড়ায়।
অবশ্য তার আগে আর সরকার পতনের কিছুদিন পর তৎকালীন সভাপতি ফরিদা পারভীন ও সাধারণ সম্পাদক শ্যামল দত্তকে ‘ফ্যাসিস্টের সহযোগী’ হিসেবে প্রেস ক্লাব থেবক বহিষ্কার করা হয়। ফলে, সিনিয়র সহসভাপতি হাসান হাফিজ সভাপতি ও সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক কে আইয়ুব ভুঁইয়া সাধারণ সম্পাদের দায়িত্ব পান। যদিও এটি প্রতিষ্ঠানটির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী ‘অবৈধ’ বলেও অভিযোগ রয়েছে।
একই সময়ে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিসহ বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। তারপর ব্যাপক চাপের মুখে শেষ পর্যন্ত গত ১২ নভেম্বর প্রেস ক্লাবের নির্বাচনে তফসিল ঘোষণা করা হয়েছিল।
তফসিল ঘোষণার দিনে অনুষ্ঠিত সভায় সম্পূর্ন অবৈধভাবে সাবেক একজন সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ ৬ জনের সদস্যপদ স্থগিত করে, যা নজীরবিহীন। বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হয়। মূলত একাধিক সম্ভাব্য জনপ্রিয় প্রার্থীকে নির্বাচনের বাইরে রাখতে ওই ছয়জনের সদস্যপদ স্থগিত রাখা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
এদিকে, আগের মেয়াদ ২০২৩-২৪ মেয়াদের নির্বাচনেও আওয়ামী লীগ পন্থী ‘ফরিদা-শ্যামল’ প্যানেলকে জয়ী করতে সেসময় ‘সরকারের নানা সংস্থা’ কাজে লাগানো হয়। একই সঙ্গে সদস্যদের ব্যাপক ভয়-ভীতি প্রদর্শন করা হয়।
অভিযোগ রয়েছে, ওই ভয়ভীতি প্রদর্শনের সঙ্গে প্রতিবেশী একটি রাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাও জড়িত ছিল, যা ছিল জাতীয় প্রেস ক্লাবের ইতিহাসে নজীরবিহীন ঘটনা।
প্রেস ক্লাবের জ্যেষ্ঠ সদস্যরা বলছেন, নব্বই দশকের শুরুতে অবিভক্ত সাংবাদিক ইউনিয়ন দু’ভাগে বিভক্ত হওয়ার পর থেকেই মূলত সাংবাদিকদের মাঝে বিভাজনের রাজনীতি শুরু হয়, যার প্রভাব পড়ে জাতীয় প্রেস ক্লাবেও। পর্যায়ক্রমে জাতীয় এই প্রতিষ্ঠোনে রাজনীতিকরণ বাড়তে থাকে।
পাশ্ববর্তী দেশের জাতীয় প্রেস ক্লাবগুলো সে দেশে মুক্ত চিন্তা বিকাশ, সাংবাদিকদের পেশাদারত্বের মানোন্নন ও নানা গবেষণায় বিশেষ ভূমিকা রাখলেও বাংলাদেশের জাতীয় প্রেস ক্লাব একেবারে ভিন্ন চিত্র।
বর্তমান জাতীয় প্রেস ক্লাব ১৯৫৪ সালের ২০ অক্টোবর পূর্ব পাকিস্তান প্রেস ক্লাব নামে প্রতিষ্ঠা করা হয়। দেশ স্বাধীনের এটি জাতীয় প্রেস ক্লাব নামে রূপান্তরিত হয়। এটি রাজধানীর প্রাণকেন্দ্র তোপখানা রোডে অবস্থিত। ১৯৫৫ সালে ক্লাবের লোগো নির্বাচন করা হয়।
১৯৪৭ সালের পূর্বে এ ভবনটি ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক ভবন। যেখানে পদার্থবিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসু বসবাস করতেন। এ ক্লাবের প্রথম আজীবন সদস্য হলেন এন এম খান এবং ক্লাবের প্রথম সভাপতি ছিলেন মুজীবুর রহমান খাঁ।
প্রতিষ্ঠার পর থেকে ২০২৪ সালের ফ্যাসিস্টবিরোধী আন্দোলনের প্রতিটি ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে প্রতিষ্ঠানটির রয়েছে গৌররোজ্জ্বল ভূমিকা।
বিশেষ করে স্বাধিকার আন্দোলন, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধা ও পরবর্তীতে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা রক্ষায় এবং স্বৈরাচার এরশাদ পতন আন্দোলন এবং চব্বিশের ছাত্র গণঅভ্যুত্থানেও জাতীয় প্রেস ক্লাব গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা পালন করে।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি বাহিনীর অপারেশন সার্চলাইট এর সময় প্রেস ক্লাব ভবনে মর্টারশেল নিক্ষেপ করা হয়েছিল। এর ফলে পুরো ক্লাব ভবনটি বিধ্বস্থ হয়ে যায়। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালের ৫ মার্চ তৎকালীন সভাপতি আবদুল আউয়াল খানের সভাপতিত্বে আনুষ্ঠানিকভাবে ক্লাব ব্যবস্থাপনা কমিটির সভায় ক্লাবের নাম পূর্ব পাকিস্তান প্রেস ক্লাবের পরিবর্তে জাতীয় প্রেস ক্লাব রাখার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
১৯৭৭ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সরকার এ জায়গাটি জাতীয় প্রেস ক্লাবের নিজস্ব জায়গা হিসেবে বরাদ্দ দেয় এবং নতুন ভবন নির্মাণ করে দেয়।


