ইসরায়েল-হামাস যুদ্ধবিরতি কার্যকরের দুই সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও ভয়াবহ খাদ্য সংকটে ভুগছে গাজাবাসী। উপত্যকার দুর্ভিক্ষকে ‘বিধংসী’ আখ্যা দিয়ে সতর্কতা জারি করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। গাজা সীমান্তজুড়ে ইসরায়েলি অবরোধ বলবৎ থাকা এবং আন্তর্জাতিক ত্রাণ সংস্থাগুলোকে গাজায় প্রবেশে বাধা দেওয়াকে এই ‘বিপর্যয়কর’ খাদ্য সংকটের মূল কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে জাতিসংঘ।
আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়, গত বৃহস্পতিবার বিভিন্ন ত্রাণ সংস্থার স্বেচ্ছাসেবীরা গাজায় জনগণের খাদ্যাভাব নিয়ে শঙ্কা জানিয়ে উপত্যকায় মানবিক সাহায্য প্রবেশে বাধা দেওয়া থেকে ইসরায়েলকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। তারা বলছেন, অবরুদ্ধ উপত্যকায় যে স্বল্প পরিমাণ খাবার প্রবেশ করছে তাতে গাজাবাসীর ন্যূনতম পুষ্টি চাহিদাও মিটছে না।
জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) জানিয়েছে, গাজায় গড়ে প্রতিদিন দুই হাজার টন খাদ্য সহায়তা প্রবেশের লক্ষ্য থাকলেও, কেবল ৭৫০ মেট্রিকটন খাবার গাজায় ঢুকছে। ইসরায়েলি বাহিনী উপত্যকায় প্রবেশে কেবল দুটি সীমান্ত ক্রসিং-দক্ষিণে কারেম আবু সালেম ও মধ্য গাজায় আল-করারা খোলা রাখায় এবং ত্রাণের ট্রাকগুলোকে কড়া নিরাপত্তা চেকিং-এ বাধ্য করায় অতিরিক্ত সময়ক্ষেপণ হচ্ছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
বৃহস্পতিবার অক্সফাম ও নরওয়েজিয়ান রিফিউজি কাউন্সিলসহ ৪১টি ত্রাণ সংস্থা এক খোলা চিঠিতে অভিযোগ করেছে, ইসরায়েল তাদের ‘ইচ্ছেমতো’ ত্রাণবাহী ট্রাকের চালান আটকে দিচ্ছে। তাদের দাবি, গত ১০ অক্টোবর যুদ্ধবিরতি কার্যকরের পর থেকে ২১ অক্টোবরের মধ্যে আন্তর্জাতিক ত্রাণ সংস্থাগুলোর অন্তত ৯৯টি ত্রাণ অনুরোধ এবং জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার ছয়টি অনুরোধ ইসরায়েল প্রত্যাখ্যান করেছে।
এসব ট্রাকে তাঁবু, কম্বল, বিছানার গদি, খাদ্য ও পুষ্টি সামগ্রী, স্বাস্থ্য ও পরিচ্ছন্নতা পণ্য, স্যানিটেশন উপকরণ, প্রতিবন্ধীদের সহায়তা সামগ্রী এবং শিশুদের পোশাক সরবারহ করার চেষ্টা করা হয়। যুদ্ধবিরতির চুক্তি অনুযায়ী, জীবনধারণের জন্য অতি প্রয়োজনীয় এ পণ্যগুলো গাজায় অবাধে প্রবেশ করতে দেওয়ার কথা ছিল।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক টেড্রোস আধানম গেব্রেয়েসুস বলেন, ‘গাজার পরিস্থিতি এখনও বিপর্যয়কর। যে মানবিক সহায়তা গাজায় ঢুকছে তা যথেষ্ট নয়, এমনকি ন্যূনতম চাহিদাও মেটাতে সক্ষম নয়। পর্যাপ্ত খাদ্যের অভাবে গাজাবাসীর অবস্থা দিন দিন আরও শোচনীয় হয়ে পড়ছে।’
এদিকে জাতিসংঘ বুধবার এক সতর্কবার্তায় বলেছে, গাজার মোট জনসংখ্যার অন্তত এক-চতুর্থাংশ মানুষ অনাহারে ও অপুষ্টিতে ভুগছেন। তাদের মধ্যে ১১ হাজার ৫০০ জনের বেশি গর্ভবতী নারী। এই অপুষ্টির প্রভাব গর্ভের সন্তানের ওপর প্রভাব ফেললে গাজার দুর্ভিক্ষ ‘প্রজন্মব্যাপী’ বিস্তার পেতে পারে।
জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের (ইউএনএফপিএ) উপ-নির্বাহী পরিচালক অ্যান্ড্রু সেবার্টন জানান, বর্তমানে গাজায় ৭০ শতাংশ নবজাতকই সময়ের আগে জন্ম নিচ্ছে। জন্মের সময় তাদের প্রায় সবার ওজনই শঙ্কাজনকভাবে যথাযথ ওজনের চেয়ে কম। গাজা যুদ্ধের আগে এই পরিমাণ ছিল কেবল ২০ শতাংশ।
সেবার্টন বলেন, ‘এই অপুষ্টির প্রভাব শুধু মায়ের ওপর নয়, নবজাতকের ওপরও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলবে, যা সারাজীবনের যত্ন ও জটিলতার কারণ হতে পারে।’
গত আগস্টেই গাজা সিটি ও আশপাশের এলাকায় দুর্ভিক্ষ ঘোষণা করে জাতিসংঘ। ‘ইন্টিগ্রেটেড ফুড সিকিউরিটি ফেজ ক্লাসিফিকেশন’ (আইপিসি) তাদের পরিসংখ্যানে দাবি করে, গাজার পাঁচ কোটিরও মানুষ ‘বিধ্বংসী দুর্ভিক্ষের’ কবলে পড়েছে।
ফিলিস্তিনি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান পিএআরসি’র বৈদেশিক সম্পর্ক বিভাগের পরিচালক বাহা জাকউত বলেন, ‘যুদ্ধবিরতির দুই সপ্তাহ পরও গাজার অবস্থা ভয়াবহ। কিছু বাণিজ্যিক ট্রাকে বিস্কুট, চকলেট ও সোডা ঢুকতে দেওয়া হলেও, শস্য ও ফলের মতো পুষ্টিকর খাদ্যপণ্য ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না। দুঃখজনকভাবে এগুলো শিশু ও গর্ভবতী নারীর মতো ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর ন্যূনতম পুষ্টি চাহিদাও মেটাতে পারছে না।’
স্থানীয়রা যেসব ফল ও সবজি উৎপাদন করছেন, সেগুলোর দামও সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। এমনকি ত্রাণের পণ্য থেকে কিছু পণ্য বিনিময় প্রথাতেও হাত বদল করছেন যুদ্ধবিধ্বস্ত ফিলিস্তিনিরা।


