নরওয়ের রাজা পঞ্চম হ্যারাল্ড ৮৯ বছর বয়সে মারা গেছেন। শুক্রবার স্থানীয় সময় সকাল ৬টা ৩৫ মিনিটে অসলো ইউনিভার্সিটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয় বলে জানিয়েছে নরওয়ের রাজপ্রাসাদ।
তার মৃত্যুর পর ছেলে হাকন নরওয়ের নতুন রাজা হিসেবে সিংহাসনে বসছেন।
রাজপ্রাসাদের বিবৃতিতে বলা হয়, রাজা হ্যারাল্ড শান্তিপূর্ণভাবে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। গত ১৭ আগস্ট তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। রক্তে ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণের চিকিৎসা চলছিল তার।
ইউরোপের সবচেয়ে প্রবীণ জীবিত রাজা ছিলেন হ্যারাল্ড। ২০২৪ সালে মালয়েশিয়ায় ছুটিতে থাকাকালে সংক্রমণে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন তিনি। সে সময় তার শরীরে সাময়িক পেসমেকার বসানো হয়। পরে নরওয়ের সশস্ত্র বাহিনীর একটি বিমানে তাকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয় এবং স্থায়ী পেসমেকার বসানো হয়।
১৯৯১ সালে সিংহাসনে বসা হ্যারাল্ড ২০২৪ সালে জানিয়েছিলেন, বয়স ও স্বাস্থ্যের কারণে তিনি সরকারি দায়িত্বের অংশগ্রহণ কমিয়ে দেবেন। তবে সিংহাসন ত্যাগের সম্ভাবনা নাকচ করে তিনি বলেছিলেন, রাজা হিসেবে তার শপথ আজীবনের।
নরওয়ের আধুনিক রাজতন্ত্রের রূপকার
ব্রিটেনের রানি ভিক্টোরিয়ার প্রপৌত্র হ্যারাল্ড ১৯৯১ সালে নরওয়ের সিংহাসনে বসেন। তিন দশকের বেশি সময় ধরে তিনি ঐতিহ্যবাহী রাজতন্ত্রে আধুনিকতার ছোঁয়া আনেন এবং রাজপরিবারকে সাধারণ মানুষের আরও কাছে নিয়ে আসেন।
জাতীয় সংকট ও শোকের সময়ে নরওয়েজিয়ানদের পাশে দাঁড়িয়ে বিশেষ জনপ্রিয়তা অর্জন করেন তিনি। ২০১১ সালে উগ্র ডানপন্থী ও ইসলামবিরোধী সন্ত্রাসী আন্দের্স বেরিং ব্রেইভিকের হামলায় অসলো ও উটোয়া দ্বীপে ৭৭ জন নিহত হওয়ার পর জাতির উদ্দেশে দেওয়া এক আবেগঘন ভাষণে হ্যারাল্ড বলেছিলেন, ‘ভয়ের চেয়ে স্বাধীনতা শক্তিশালী।’
বন্যা, ঝড়সহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর তিনি দুর্গত এলাকায় ছুটে যেতেন। অনেক সময় রাবারের বুট ও পুরোনো জ্যাকেট পরে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সঙ্গে দেখা করতেন।
২০০৫ সালে নরওয়ের সুইডেন থেকে স্বাধীনতার শতবর্ষ উপলক্ষে হ্যারাল্ড ও তার স্ত্রী সোনজা হারাল্ডসেন ৫৫০ জন নরওয়েজিয়ানকে রাজপ্রাসাদের এক অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানান। সে সময় তিনি ইউরোপের রাজপরিবারগুলোকে আরও উন্মুক্ত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন।
বাবা রাজা ওলাভের মতো হ্যারাল্ডও খেলাধুলা ও গাড়ির প্রতি আগ্রহী ছিলেন। অনেক অনুষ্ঠানে তিনি প্রায়ই নিজেই গাড়ি চালিয়ে যেতেন।
নৌকা চালানোতেও তার বিশেষ আগ্রহ ছিল। নিজের নৌকা নিয়ে বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ জিতেছিলেন এবং একাধিক অলিম্পিকেও অংশ নিয়েছিলেন। তবে বাবার মতো অলিম্পিক স্বর্ণপদক জয়ের কীর্তি গড়তে পারেননি।
জন্ম ও সিংহাসনে আরোহণ
১৯৩৭ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন হ্যারাল্ড। প্রায় ৫৭০ বছর পর নরওয়ের মাটিতে জন্ম নেওয়া প্রথম রাজপরিবারের উত্তরাধিকারী ছিলেন তিনি। ১৯০৫ সালে সুইডেন থেকে স্বাধীন হওয়ার আগে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ডেনমার্ক ও সুইডেনের রাজারা নরওয়ে শাসন করেন।
হ্যারাল্ডের বয়স যখন মাত্র তিন বছর, তখন নাৎসি জার্মানি নরওয়ে আক্রমণ করে। রাজা হাকন ও তৎকালীন ক্রাউন প্রিন্স ওলাভ ব্রিটেনে পালিয়ে গিয়ে নির্বাসিত সরকার পরিচালনা করেন। আর ছোট্ট হ্যারাল্ড তার মা ক্রাউন প্রিন্সেস মার্থার সঙ্গে প্রথমে নিরপেক্ষ সুইডেন এবং পরে যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান।
পরিবারটি কিছু সময় হোয়াইট হাউসে থাকার পর মেরিল্যান্ডের বেথেসডায় প্রায় পাঁচ বছর কাটায়। সেখানে হ্যারাল্ড ও তার দুই বড় বোন রাগনহিল্ড ও অ্যাস্ট্রিডের সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ফ্র্যাঙ্কলিন ডি. রুজভেল্টের নিয়মিত দেখা হতো। বহু বছর পর হ্যারাল্ড রুজভেল্টকে দাদার মতো একজন মানুষ হিসেবে স্মরণ করেছিলেন।
১৯৪৫ সালে যুদ্ধ শেষে নরওয়েতে ফিরে হ্যারাল্ড ব্যক্তিগত শিক্ষকের পরিবর্তে সরকারি স্কুলে পড়াশোনা করেন।
১৯৬৮ সালে সাধারণ পরিবারের মেয়ে সোনজাকে বিয়ে করেন তিনি। এই বিয়ে রাজপরিবারের প্রচলিত রীতির বাইরে ছিল। সোনজাকে বিয়ে করার অনুমতি নিয়ে বাবার সঙ্গে নয় বছর ধরে মতবিরোধ চলার পর হ্যারাল্ড জানিয়ে দেন, সোনজাকে বিয়ে করতে না পারলে তিনি আর কখনো বিয়েই করবেন না। শেষ পর্যন্ত তার বাবা সম্মতি দেন।
জীবনের শেষ অধ্যায়ে বিতর্ক
১৯৯৮ সালে রাজা হ্যারাল্ড নজিরবিহীন জনসমালোচনার মুখে পড়েন। শিল্পপতিদের একটি গোষ্ঠীর কাছ থেকে ৪০ লাখ ক্রোনার মূল্যের একটি ইয়ট জন্মদিনের উপহার হিসেবে গ্রহণ এবং রাজপ্রাসাদ সংস্কারে সরকারের প্রায় ৫০ কোটি ক্রোনার ব্যয়ের খবর প্রকাশের পর বিতর্ক শুরু হয়।
তখন তার সাবেক উপব্যক্তিগত সচিব ৬৭ বছর বয়সে হ্যারাল্ডের সিংহাসন ত্যাগের পরামর্শ দিয়েছিলেন। তবে জনমত জরিপে আজীবন রাজা হিসেবে থাকার পক্ষে শক্ত সমর্থন পাওয়া যায় এবং বিতর্ক ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়ে যায়।
১৯৯৯ সালে এক সাক্ষাৎকারে হ্যারাল্ড রসিকতা করে বলেছিলেন, পাগল না হওয়া পর্যন্ত তিনি সিংহাসনে থাকবেন। রাজা হিসেবে তার দীর্ঘ শাসনের পর শুক্রবার সেই অধ্যায়ের অবসান হলো।
সংকটে রাজপরিবার
হ্যারাল্ডের মৃত্যু এমন এক সময়ে হলো, যখন নরওয়ের রাজপরিবার নানা বিতর্ক ও সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
রাজা হ্যারাল্ডের ছেলে ক্রাউন প্রিন্স হাকনের স্ত্রী ক্রাউন প্রিন্সেস মেটে-মারিটের সঙ্গে জেফরি এপস্টেইনের বন্ধুত্ব নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা চলছে। এ সম্পর্কের জন্য মেটে-মারিট ইতোমধ্যে ক্ষমা চেয়েছেন।
মেটে-মারিটের আগের সম্পর্কের সন্তান মারিয়ুস হইবি গত জুনে ধর্ষণের চারটি অভিযোগের মধ্যে দুটিতে এবং পারিবারিক সহিংসতার একটি অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হন। সাত সপ্তাহের বিচার শেষে তাঁকে চার বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তবে হইবি ও রাষ্ট্রপক্ষ উভয়েই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেছে।
এর দুই দিন পর রাজপ্রাসাদ জানায়, মেটে-মারিটের ফুসফুস প্রতিস্থাপন সফল হয়েছে। তবে অস্ত্রোপচারটি ঠিক কখন হয়েছে, তা জানানো হয়নি। কয়েক সপ্তাহ হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার পর আগস্টে তিনি বাড়ি ফেরেন এবং হাকনের সঙ্গে ২৫তম বিবাহবার্ষিকী উদযাপন করেন।
এদিকে রাজতন্ত্রের প্রতি জনসমর্থনও কমেছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে সরকারি সম্প্রচারমাধ্যম এনআরকের প্রকাশিত নরস্ট্যাট জরিপে রাজতন্ত্রের প্রতি সমর্থন ৬০ শতাংশে নেমে আসে, যা আগের মাসে ছিল ৭০ শতাংশ। মে মাসে তা কিছুটা বেড়ে ৬৪ শতাংশে দাঁড়ায়।
তবে হ্যারাল্ড নিজে বরাবরই নরওয়েজিয়ানদের কাছে জনপ্রিয় ছিলেন। ফেব্রুয়ারির ওই জরিপে রাজপরিবারের প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে সবচেয়ে উপযুক্ত রাজপরিবারের সদস্য হিসেবে হ্যারাল্ড ১০-এর মধ্যে ৯ দশমিক ২ নম্বর পান।
৫৩ বছর বয়সী ক্রাউন প্রিন্স হাকন এখন নরওয়ের চতুর্থ রাজা। তার স্ত্রী মেটে-মারিট হবেন নরওয়ের রানি।


