ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে যুক্তরাষ্ট্র আটক করেছে–এমন দাবি করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এরপর বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে।
তবে ভেনেজুয়েলার ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ জানিয়েছেন, মাদুরো ও তার স্ত্রী বর্তমানে কোথায় আছেন, সে বিষয়ে সরকার এখনো নিশ্চিত নয়।
শনিবার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে সম্প্রচারিত এক অডিও বার্তায় তিনি বলেন, ‘মাদুরো ও সিলিয়া ফ্লোরেস জীবিত আছেন–এমন প্রমাণ যুক্তরাষ্ট্রকে দ্রুত দিতে হবে।’
এই নাটকীয় ঘটনা ক্যারিবিয়ান সাগর ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে যুক্তরাষ্ট্রের ধারাবাহিক সামরিক তৎপরতার সবশেষ পর্ব বলে মনে করা হচ্ছে।

ওয়াশিংটনের দাবি অনুযায়ী, মাদক পাচারের সঙ্গে জড়িত নৌযান লক্ষ্য করে তারা একাধিক প্রাণঘাতী হামলা চালিয়েছে। পাশাপাশি ভেনেজুয়েলার মাদকবাহী নৌযানের কথিত ডকিং এলাকাতেও আঘাত হানা হয়েছে।
উত্তেজনার শুরু থেকেই ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন নিকোলাস মাদুরোর বিরুদ্ধে মাদক সন্ত্রাসের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ তুলে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার হুমকি দিয়ে আসছিল।
মাদুরোর আটক হওয়ার দাবির পর অনেকের মনে যুক্তরাষ্ট্রের অতীত সামরিক অভিযানের স্মৃতি ফিরে এসেছে।
এর আগে, পানামার সাবেক নেতা ম্যানুয়েল নোরিয়েগা কিংবা ইরাকের সাবেক প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনের মতো রাষ্ট্রনেতাদের যুক্তরাষ্ট্র গ্রেপ্তার করেছিল।
ম্যানুয়েল নোরিয়েগা
লাতিন আমেরিকায় যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপ নতুন নয়। ১৯৮৯ সালে পানামার সামরিক শাসক ও কার্যত রাষ্ট্রনেতা ম্যানুয়েল নোরিয়েগাকে ক্ষমতাচ্যুত করতে দেশটিতে সামরিক অভিযান চালায় যুক্তরাষ্ট্র।
সে সময় ওয়াশিংটন বলেছিল, পানামায় অবস্থানরত মার্কিন নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা, দুর্নীতি দমন ও মাদক পাচার রোধ ছিল অভিযানের উদ্দেশ্য।
তার আগে, ১৯৮৮ সালে মিয়ামিতে নোরিয়েগার বিরুদ্ধে মাদক পাচারের অভিযোগে মামলা করে যুক্তরাষ্ট্র, যা বর্তমান মাদুরো ইস্যুর সঙ্গে তুলনীয় বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

নোরিয়েগা ১৯৮৫ সালে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস আরদিতো বারলেত্তাকে পদত্যাগে বাধ্য করেন এবং ১৯৮৯ সালের নির্বাচন বাতিল করেন।
এক পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তার সম্পর্কের অবনতি ঘটে এবং ওয়াশিংটন তাকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে।
ভিয়েতনাম যুদ্ধের পর এটি ছিল যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সামরিক অভিযান। গ্রেপ্তারের পর নোরিয়েগাকে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে বিচার করা হয় এবং তিনি ২০১০ সাল পর্যন্ত সেখানে কারাবন্দী ছিলেন। পরে তাকে ফ্রান্স ও পানামায় পাঠানো হয়। ২০১৭ সালে পানামার কারাগারে তার মৃত্যু হয়।
সাদ্দাম হোসেন
ইরাকের সাবেক প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনকে ২০০৩ সালের ১৩ ডিসেম্বর মার্কিন বাহিনী গ্রেপ্তার করে। এর নয় মাস আগে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা ইরাকে সামরিক আগ্রাসন চালায়।
ইরাকের কাছে গণবিধ্বংসী অস্ত্র (ডব্লিউএমডি) রয়েছে–এমন গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ওই আগ্রাসন চালানো হলেও পরে এ ধরনের অস্ত্রের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।

একসময় ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় সাদ্দাম হোসেন ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ মিত্র। পরে ওয়াশিংটন দাবি করে, তিনি আল-কায়েদার মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীকে সহায়তা দিচ্ছেন। যদিও এরও সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
শেষ পর্যন্ত নিজ শহর তিকরিতের কাছে একটি গর্তে লুকিয়ে থাকা অবস্থায় তাকে আটক করা হয়।
ইরাকি আদালতে বিচার শেষে মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়ে ২০০৬ সালের ৩০ ডিসেম্বর তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।
জুয়ান অরল্যান্ডো হার্নান্দেজ
হন্ডুরাসের সাবেক প্রেসিডেন্ট জুয়ান অরল্যান্ডো হার্নান্দেজের ঘটনাও যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের আরেকটি উদাহরণ।
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে, প্রেসিডেন্ট পদ ছাড়ার কয়েক দিনের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের এজেন্ট ও হন্ডুরাসের নিরাপত্তা বাহিনীর যৌথ অভিযানে তাকে নিজ বাসভবন থেকে আটক করা হয়।

পরে তাকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রত্যর্পণ করা হয় দুর্নীতি ও মাদক পাচারের অভিযোগে। ওই বছরের জুনে তাকে ৪৫ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
তবে নাটকীয়ভাবে ২০২৫ সালের ১ ডিসেম্বর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাকে ক্ষমা করে দেন।
এর কয়েক দিনের মধ্যেই হন্ডুরাসের প্রধান কৌসুলি তার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন, যা দেশটিতে নতুন রাজনৈতিক ও আইনি সংকট সৃষ্টি করে।


