মিয়ানমার সীমান্তে মিলল স্থলমাইনের ট্রিগার প্লেট

মিয়ানমার সীমান্তে মিলল স্থলমাইনের ট্রিগার প্লেট
টেকনাফ সীমান্ত থেকে উদ্ধার হওয়া স্থলমাইনের চাপ প্লেট। ছবি: সংগৃহীত
Advertisement
Advertisement

মিয়ানমার সীমান্তঘেঁষা কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার হোয়াইক্যংয়ের সীমান্তবর্তী অঞ্চল থেকে স্থলমাইনের চাপ প্লেট বা ট্রিগার অংশ উদ্ধার করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও সেনাবাহিনী।

প্রাথমিকভাবে এসব অংশে কোনো বিস্ফোরক না থাকলেও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে বিজিবি।

মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে হোয়াইক্যং ইউনিয়নের উলুবনিয়া সীমান্ত এলাকায় এসব স্থলমাইনের ট্রিগার প্লেট উদ্ধার করা হয়।

স্থানীয় সূত্র ও বিজিবি জানায়, সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত সীমান্ত এলাকায় অভিযান চালিয়ে সেনাবাহিনী ও বিজিবি সদস্যরা বিপুল সংখ্যক স্থলমাইনের চাপ প্লেট সংগ্রহ করেন। উদ্ধার হওয়া এসব চাপ প্লেটের সংখ্যা আনুমানিক ৫০ থেকে ৬০টি হতে পারে। পরে সেগুলো হোয়াইক্যং বিজিবি ফাঁড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়।

উখিয়ার বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. জহিরুল ইসলাম বলেন, ‘সীমান্ত এলাকা থেকে স্থলমাইনের চাপ প্লেটের মতো বেশ কয়েকটি অংশ পাওয়া গেছে। আপাতত সেগুলোতে কোনো বিস্ফোরক পাওয়া যায়নি। তবে বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে পরীক্ষা করে বিষয়টি নিশ্চিত করা হচ্ছে।’

একটি স্থলমাইনে সাধারণত চারটি প্রধান অংশ থাকে। এগুলো হলো–অগ্রভাগ বা চাপ প্লেট, কেসিং (বাইরের আবরণ), বিস্ফোরক অংশ ও বুস্টার চার্জ এবং ফায়ারিং মেকানিজম ও ডিটোনেটর।

উদ্ধার হওয়া অংশগুলো মূলত স্থলমাইনের অগ্রভাগ বা চাপ প্লেট, যা মাটির ওপরে বসানো থাকে এবং চাপ পড়লে মাইন সক্রিয় করে। তবে এসব অংশের সঙ্গে বিস্ফোরক, ডেটোনেটর বা বুস্টার চার্জ পাওয়া যায়নি।

স্থানীয়দের অভিযোগ, মিয়ানমারের বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মির পুঁতে রাখা স্থলমাইন এবং সীমান্তের ওপার থেকে ছোড়া গুলিতে টেকনাফ সীমান্ত এলাকায় বসবাসকারীরা নিয়মিত হতাহত হচ্ছেন। এতে সীমান্তবাসীর মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।

আরও পড়ুন

স্থানীয় বাসিন্দা আবদুল করিম বলেন, ‘আমরা মাঠে যেতে পারি না, সীমান্তে যেতেও ভয় লাগে। কখন যে মাইনে পা পড়ে যায়, সেই চিন্তায় সারাক্ষণ আতঙ্কে থাকি। সন্তানদের ঘর থেকে বের হতে দিতেও ভয় লাগে।’

নাফ নদীতে মাছ ধরে এক জেলে হাবিব উল্লাহ বলেন, ‘নদী আর সীমান্তই আমাদের জীবিকা। কিন্তু এখন নৌকা নামালেই ভয় লাগে।’

ওপার থেকে গুলি আসে, সঙ্গে মাইনের আতঙ্ক; এইভাবে কী মানুষ বাঁচতে পারে?–প্রশ্ন রাখেন তিনি।

এর আগে গত ১২ জানুয়ারি হোয়াইক্যং সীমান্তে নাফ নদীতে মাছ ধরতে গিয়ে মাইন বিস্ফোরণে মোহাম্মদ হানিফ নামে এক যুবক গুরুতর আহত হন। তার আগের দিন একই এলাকায় মিয়ানমার থেকে ছোড়া গুলিতে শিশু হুফাইজা আফনান গুলিবিদ্ধ হয়।

জনপ্রতিনিধিদের উদ্বেগ

স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা জানান, সীমান্ত এলাকার মানুষ কার্যত মৃত্যু-ভয় নিয়েই দিন কাটাচ্ছেন। শিশুদের স্কুলে পাঠানো নিয়েও পরিবারগুলো চরম শঙ্কায় রয়েছে। দ্রুত কার্যকর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হলে টেকনাফের সীমান্ত জনপদে আতঙ্ক আরও গভীর হবে বলে তারা আশঙ্কা করছেন।

হোয়াইক্যং ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শাহ জালাল বলেন, ‘সীমান্ত এলাকায় একের পর এক স্থলমাইনের অংশ উদ্ধারের ঘটনায় হোয়াইক্যংবাসীর মধ্যে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। মানুষ এখন মাঠে যেতে ভয় পাচ্ছে, নদীতে নামতেও সাহস করছে না। শিশুদের স্কুলে পাঠানো নিয়েও পরিবারগুলো দুশ্চিন্তায় রয়েছে। সীমান্তের ওপারের সংঘাতের প্রভাব এপারে এসে সাধারণ মানুষের জীবনকে মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে। দ্রুত সীমান্ত এলাকায় কার্যকর নিরাপত্তা জোরদার এবং ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলো চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।’

সীমান্তে বিজিবির নজরদারি জোরদার

বিজিবি জানিয়েছে, সীমান্ত এলাকায় নজরদারি আরও জোরদার করা হয়েছে এবং সন্দেহজনক এলাকায় নিয়মিত তল্লাশি অভিযান চালানো হচ্ছে। তবে মিয়ানমারের অভ্যন্তরে চলমান সংঘাতের কারণে পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।

বিজিবির উর্ধতন এক কর্মকর্তা টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘সীমান্ত এলাকায় উদ্ধার হওয়া স্থলমাইনের চাপ প্লেটগুলোতে আপাতত কোনো বিস্ফোরক পাওয়া যায়নি। তবে আমরা এটি সম্পূর্ণভাবে নিশ্চিত করতে বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে পরীক্ষা করাচ্ছি। সীমান্ত এলাকায় নজরদারি এবং তল্লাশি অভিযান জোরদার করা হয়েছে। এছাড়া সন্দেহজনক সব এলাকায় নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে। তবে সীমান্তের ওপারের সংঘাতের কারণে পুরো এলাকা এখনো নিরাপদ নয়। তাই স্থানীয়দের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আরও তৎপরতা প্রয়োজন।’

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad