মিয়ানমারের নির্বাচনে সেনা সমর্থিত ইউএসডিপির ভূমিধস জয়

মিয়ানমারের নির্বাচনে সেনা সমর্থিত ইউএসডিপির ভূমিধস জয়
নির্বাচনে জয়ের পর ইউএসডিপির সমর্থকদের উল্লাস। ছবি: এপি/ইউএনবি
Advertisement
Advertisement

মিয়ানমারের সাধারণ নির্বাচনে ভূমিধস জয় পেয়েছে সেনা সমর্থিত ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (ইউএসডিপি)। তিনধাপের নির্বাচনের সব ধাপের ফলেই দলটির আধিপত্য দেখা গেছে।

রয়টার্সের খবরে বলা হয়, মিয়ানমারের দুই কক্ষবিশিষ্ট আইনসভায় বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে ইউএসডিপি। বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার প্রকাশিত ফল অনুযায়ী, পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ পাইথু হ্লুত্তাও-এ ২৬৩টি আসনের মধ্যে ইউএসডিপি জিতেছে ২৩২ আসন। উচ্চকক্ষ অ্যামিওথা হ্লুত্তাও-এ ১৫৭টি আসনের মধ্যে এখন পর্যন্ত ১০৯টি আসন দখল করেছে জান্তা সরকারের সমর্থন পাওয়া দলটি।

জান্তা মুখপাত্র জাও মিন তুনের বরাতে প্রো-সামরিক ইলেভেন মিডিয়া গ্রুপ চলতি মাসের শুরুর দিকে জানায়, আগামী মার্চে পার্লামেন্ট যাত্রা শুরু করবে এবং নির্বাচিত প্রতিনিধিরা দেশের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করবেন। এরপর এপ্রিলে নির্বাচিত সরকারের হাতে দেশের দায়িত্ব তুলে দেবে সেনাবাহিনী।

২০২০ সালে সবশেষ সাধারণ নির্বাচনে জয় পায় গৃহবন্দি নেতা ও নোবেল জয়ী অং সান সুচির নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি পার্টি। তবে ২০২১ সালে ওই সরকার উৎখাত করে মিয়ানমারের শাসনভার নেয় সেনাবাহিনী। জান্তা সরকার সে সময় দাবি করে, অং সান সু চির দল বিপুল জয় পেলেও তা বড় ধরনের ভোটার নিবন্ধন অনিয়মের কারণে অবৈধ ছিল।

ভোট গণনা করছেন নির্বাচনী দায়িত্বরত কর্মীরা। ছবি: এপি/ইউএনবি

এমন পরিস্থিতিতে সেনা সরকারের বিরুদ্ধে বিভিন্নগোষ্ঠী সশস্ত্র অবস্থান নিলে তা গৃহযুদ্ধে রূপ নেয়। হাজারও সংখ্যালঘু সেনাবাহিনীর নির্যাতনের শিকার হয়ে বাস্তুচ্যুত ও মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত হওয়ার পর বিশ্বজুড়েও জান্তা সরকারের বিরুদ্ধে ব্যাপক জনবিরোধিতা তৈরি হয়।

তারই ধারাবাহিকতায় বিশ্বনেতাদের চাপের মুখে প্রায় চার বছর পর সাধারণ নির্বাচন আয়োজনে বাধ্য হয় সেনাবাহিনী। গত ২৮ ডিসেম্বর দেশটিতে তিনধাপের নির্বাচনের প্রথম ধাপ শুরু হয়। ১১ জানুয়ারি দ্বিতীয় ধাপ ও ২৫ জানুয়ারি শেষ ধাপের ভোট শেষ হয়।

ভোটার উপস্থিতিতে প্রভাব ফেলেছে গৃহযুদ্ধ

আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার তথ্যানুযায়ী, এবার নির্বাচনে তিন ধাপ মিলিয়ে ভোটার উপস্থিতি ছিল প্রায় ৫৫ শতাংশ, যা আগের নির্বাচনের তুলনায় বেশ কম। এর আগে ২০১৫ ও ২০২০ সালের নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি ছিল প্রায় ৭০ শতাংশ।

আরও পড়ুন

মিয়ানমারের ৩৩০টি টাউনশিপের মধ্যে ২৬৩টিতে ভোট হয়। এসব টাউনশিপের বেশ কয়েকটির নিয়ন্ত্রণ এখনো সশস্ত্র বিদ্রোহীদের হাতে। বেশ কয়েকটি টাউনশিপে সেনাবাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে বাতিল হয় ভোট গ্রহণ।

বিতর্কিত নির্বাচন 

জনগণের ভোটাধিকার ফিরিয়ে দিয়ে নির্বাচন আয়োজন করার পরও সমালোচনা জান্তা বাহিনীর পিছু ছাড়েনি। এই নির্বাচনকে অনেকটাই সাজানো বলে মনে করছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও বিরোধী গোষ্ঠীগুলো। কয়েকটি পশ্চিমা দেশও এই নির্বাচনকে ভুয়া বা প্রহসন বলে নিন্দা করেছে।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক জোট আসিয়ান-এর ১১টি সদস্য রাষ্ট্রই জানিয়েছে, তারা এই নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে সমর্থন করবে না।

তারা জানায়, প্রধান বিরোধী অং সান সু চির দল ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্রেসিসহ (এনএলডি) আরও কয়েক ডজন রাজনৈতিক দল ভেঙে দেওয়ায় নির্বাচনে প্রকৃত কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল না। সেনাবাহিনী তাদের অধিনস্ত একটি দলকে সমর্থন দেওয়ায় কিছু দল নিজেরাই নির্বাচনে অংশ নিতে অস্বীকৃতি জানায়।

সমালোচকদের মতে, এই পুরো প্রক্রিয়ার উদ্দেশ্যই ছিল সামরিক শাসনকে জনগণের সরকার গঠনের নামে আরও পাকাপোক্ত করা। মিয়ানমারের সামরিক সরকার অবশ্য দাবি করছে, নির্বাচন ছিল অবাধ ও সুষ্ঠু এবং এতে জনগণের পূর্ণ সমর্থন ছিল।

মিয়ানমারের রাজনৈতিক প্রথা অনুযায়ী, সামরিক বাহিনীর জন্য সংসদের ২৫ শতাংশ আসন সংরক্ষিত থাকে। ফলে বেসামরিক কোনো সরকারের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের পরও পার্লামেন্টে সেনাবাহিনীর বড় নিয়ন্ত্রণ থাকে।

নির্বাচনে জয়ের পর ইউএসডিপির সমর্থকদের উল্লাস। ছবি: এপি/ইউএনবি

নির্বাচিত ইউএসডিপি

মিয়ানমারে কয়েক দশকের সামরিক শাসনের পর ২০১০ সালে অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেলের নেতৃত্বে ইউএসডিপি দল প্রতিষ্ঠা করে সশস্ত্র বাহিনীর শীর্ষ নেতারা। মূলত জান্তা সরকারের প্রতিনিধিত্বকারী রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে কাজ করাই ছিল তাতমাদাও নামে পরিচিটি পাওয়া দলটির উদ্দেশ্য।

এবারের নির্বাচনে দলটি মোট এক হাজার ১৮ জন প্রার্থী দিয়েছে, যা মোট নিবন্ধিত প্রার্থীর প্রায় এক-পঞ্চমাংশ। জান্তা সরকারের প্রধান মিন অং হ্লাইং নবনির্বাচিত সরকারেও প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

গত সোমবার দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে এক ভাষণে তিনি বলেন, ‘দেশের রাজনৈতিক দল বা সংগঠনের মধ্যে যেকোনো পরিবর্তন হোক না কেন, তাতমাদাও জাতীয় প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তার দায়িত্ব সততার সঙ্গে এবং অবহেলা ছাড়াই এখনো পালন করে যাচ্ছে।’

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad