পুরান ঢাকায় ভাঙারি ব্যবসায়ী লাল চাঁদ ওরফে সোহাগ হত্যার ঘটনায় বিব্রতকর অবস্থায় পড়েছে জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। যুবদল কর্মী সোহাগকে প্রকাশ্যে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় অভিযুক্তরাও যুবদল, ছাত্রদলসহ বিএনপির অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মী।
এ ঘটনায় সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে খুনিদের পৈশাচিক উল্লাস। চাঁদার দাবিতে ব্যবসায়ীকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় বিএনপিকে দায়ী করে প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন এনসিপিসহ বিভিন্ন সংগঠনের নেতৃবৃন্দ। বিক্ষোভ মিছিল হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্তত সাতটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। এ ঘটনায় ইতিমধ্যে যুবদল, ছাত্রদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের পাঁচজনকে বহিষ্কার করা হয়েছে। খুনের ঘটনার নিন্দা জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

নিহত লাল চাঁদ ওরফে সোহাগ মিটফোর্ড এলাকায় ভাঙাড়ি ও পুরোনো বৈদ্যুতিক কেবল ব্যবসায় জড়িত ছিলেন। তার দোকানের নাম ‘সোহানা মেটাল’। বিদ্যুতের তামার ও সাদা তারের ব্যবসার একটি সিন্ডিকেট পরিচালনা করতেন তিনি। এই ব্যবসার অর্ধেক নিয়ন্ত্রণ নিতে ব্যর্থ হয়ে একটি চক্র নিয়মিত চাঁদা দাবি করছিল। তা দিতে রাজি না হওয়ায় এ হত্যাকাণ্ড বলে স্থানীয় সূত্রের দাবি।

সোহাগের বোন মঞ্জুয়ারা বেগম ঘটনার পর কোতোয়ালি থানায় একটি হত্যা মামলা করেছেন। এজাহারে নাম উল্লেখ করে ১৯ জন এবং অজ্ঞাতপরিচয় আরও ১৫-২০ জনকে আসামি করা হয়েছে। অধিকাংশ আসামি ৩০ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। আসামিদের মধ্যে রয়েছেন- মাহমুদুল হাসান মহিন, সারোয়ার হোসেন টিটু, মনির ওরফে ছোট মনির, আলমগীর, মনির ওরফে লম্বা মনির, নান্নু, সজীব, রিয়াদ, টিটন গাজী, রাকিব, সাবা করিম লাকী, কালু ওরফে স্বেচ্ছাসেবক কালু, রজব আলী পিন্টু, মো. সিরাজুল ইসলাম, রবিন, মিজান, অপু দাস, হিম্মত আলী ও আনিসুর রহমান হাওলাদার।
বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত চা্ইলেন ফখরুল
ভাঙারি ব্যবসায়ী লাল চাঁদ ওরফে সোহাগকে কুপিয়ে ও পিটিয়ে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় নিন্দা জানিয়েছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
শুক্রবার (১১ জুলাই) রাতে গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘দুষ্কৃতিকারীদের দ্বারা সংঘটিত এই বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ এবং তীব্র নিন্দা, প্রতিবাদ ও ধিক্কার জানাই।এ ই পৈশাচিক ঘটনা কেবল একটি জীবনহানিই নয়—এটি রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা, নাগরিক অধিকার ও আইন শৃঙ্খলা রক্ষায় গভীর হতাশার বহিঃপ্রকাশ। আমাদের সংগঠনের নীতি, আদর্শ ও রাজনীতির সঙ্গে সন্ত্রাস ও বর্বরতার কোনও সম্পর্ক নেই। অপরাধী যেই হোক, তার স্থান কখনোই আইন ও ন্যায়বিচারের ঊর্ধ্বে হতে পারে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘জুলাই-আগস্টের গণ-আন্দোলনে ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের পর উল্লিখিত নির্মম ঘটনাটি দেশের মানুষের বিবেককে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। প্রকাশ্য দিবালোকে সংঘটিত পৈশাচিক ও ন্যাক্কারজনক ঘটনাটির দৃষ্টান্তমূলক বিচার না হলে বিচারহীনতার সংস্কৃতি আমাদের সমাজকে আরও গভীর অন্ধকারে নিমজ্জিত করবে।’

বিএনপির মহাসচিব বলেন, ‘আমি অন্তর্বর্তী সরকারের উদ্দেশে বলতে চাই, উল্লিখিত ঘটনাটির অবিলম্বে নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত নিশ্চিত করুন এবং প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দৃষ্টান্ত স্থাপন করুন।’
পৃথক অভিযানে গ্রেপ্তার ৪
সোহাগ খুনের ঘটনায় চার জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে দুজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া শাখার উপপুলিশ কমিশনার (ডিসি) মোহাম্মদ তালেবুর রহমান ৪ জনকে গ্রেপ্তারের তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

পুলিশ ঘটনাস্থলের আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে তা যাচাইয়ের পর রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে এজাহারভুক্ত দুই আসামি মাহমুদুল হাসান মহিন (৪১) ও তারেক রহমান রবিনকে (২২) গ্রেপ্তার করে। রবিনের কাছ থেকে একটি বিদেশি পিস্তল উদ্ধার হয়েছে।
এদিকে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) পৃথক অভিযানে এ মামলার আরও দুজন আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে। তারা হলেন- আলমগীর হোসেন এবং মনির হোসেন ওরফে লম্বা মনির। কেরানীগঞ্জ থেকে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। আলমগীর ও মনির এজাহারে পর্যায়ক্রমে চার এবং পাঁচ নম্বর আসামি।
পৈশাচিক উল্লাস
নিহতের পরিবার জানায়, ঘটনার দিন অভিযুক্ত সারোয়ার হোসেন টিটু সকালে সোহাগের বাসায় গিয়ে খাওয়া-দাওয়া করেন এবং শান্তিপূর্ণ আলোচনার আশ্বাস দিয়ে তাকে বাইরে নিয়ে যান। এরপরই ঘটে মর্মান্তিক এ ঘটনা।
সোহাগকে দেশীয় অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে, পিটিয়ে ও পাথর ছুড়ে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। হত্যার পর মরদেহের ওপর চলে নৃশংস উন্মত্ততা। ভাইরাল ভিডিওতে দেখা যায়, কয়েকজন ব্যক্তি সোহাগকে প্রথমে নির্মমভাবে মারধর করে, পরে কুপিয়ে মাটিতে ফেলে দেয়। এরপর দুই যুবক তার নিথর দেহ রাস্তায় টেনে নিয়ে এসে একের পর এক লাথি, ঘুষি ও বুকের ওপর লাফিয়ে বর্বরতা চালায়। পরে তার মাথা ও শরীরের ওপর ছোড়া হয় বড় বড় পাথর।
ঘটনার সময় শত শত মানুষ আশপাশে দাঁড়িয়ে থাকলেও কেউ এগিয়ে আসেনি। এমনকি হাসপাতালের দায়িত্বপ্রাপ্ত আনসার সদস্যরাও নীরব ছিলেন।
যুবদলের দুই নেতা আজীবন বহিস্কার
পিটিয়ে হত্যার এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে বিএনপির অঙ্গ সংগঠন যুবদলের দুই নেতাকে বহিস্কার করা হয়েছে। তারা হলেন রজ্জব আলী পিন্টু ও সাবাহ করিম লাকি।
রজ্জব আলী পিন্টু যুবদল কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সাবেক সহ-জলবায়ু বিষয়ক সম্পাদক। আর সাবাহ করিম লাকি ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক। তাদের প্রাথমিক সদস্য পদসহ দল থেকে আজীবন বহিষ্কার করা হয়েছে বলে এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে যুবদল জানিয়েছে।
এছাড়া ছাত্রদলের দুই নেতা ও স্বেচ্ছাসেবক দলের একজনকে বহিষ্কার করার কথা জানা গেছে।

এদিকে, হত্যাকাণ্ডের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে নিন্দা ও ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। নাগরিক সমাজের মতে, প্রকাশ্যে এমন নৃশংসতার বিচার নিশ্চিত না হলে সামাজিক নিরাপত্তা দুর্বল হবে। এ ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিবাদ জানিয়েছে বিভিন্ন দল ও সাধারণ মানুষ। রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মিছিল বের করেন শিক্ষার্থীরা।


