একজন পঙ্গু মানুষ। প্রকাশ্যে একটি হত্যা। হামলাকারীদের পরিচয়ও স্থানীয়দের কাছে স্পষ্ট। মামলাও হয়েছে। তবে বাদী কারও নাম দিতে পারেননি মামলায়। আর পুলিশের সেই তদন্তে কোনো আগ্রহই নেই।
প্রায় দুই বছর আগে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাবেক নেতা আবদুল্লাহ আল মাসুদ হত্যার ঘটনায় তার স্বজনরা আদৌ বিচার পাবে কি না, এ নিয়ে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
মাসুদের ভাই আয়াতুল্লাহ বেহেস্তী এই ঘটনায় একটি মামলা করেছিলেন। কিন্তু বাহিনীটির কোনো পদক্ষেপ না দেখে চরমভাবে হতাশ।
টাইমস অব বাংলাদেশকে তিনি বলেন, ‘পুলিশের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত আমার বা আমাদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়নি। আদৌ ন্যায়বিচার পাব কিনা তা নিয়েও শঙ্কার মধ্যে রয়েছি।’
মামলায় আসামি হিসেবে কারও নাম কেন দেননি- এই প্রশ্নে বেহেস্তী বলেন, ‘পুলিশ আসামিদের নাম উল্লেখ করতে নিষেধ করেছিল। আমাকে বলা হয়েছিল আসামিদের নাম উল্লেখ করার দরকার নেই। পুলিশ সব জানে। বলেছিল, “আপনি অজ্ঞাত আসামি লিখেন”।’
মাসুদকে পিটিয়ে হত্যার ভিডিও আছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘ওই ঘটনার ভিডিও ফুটেজ অনেকে দেখছে। সবাই জানে।’
মাসুদকে যখন পিটিয়ে থানায় নেওয়া হয়েছিল, সেখানে উপস্থিত ছিলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের বর্তমান সাধারণ সম্পাদক ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন সমন্বয়ক জিএস সালাহউদ্দিন আম্মার।
মাসুদের মৃত্যুর ব্যাপারে ওই সময় আম্মার দাবি করেন, তারা অন্য দুইজনকে থানায় নিয়ে গিয়েছিলেন। তার মধ্যেই আহত অবস্থায় একজনকে আনতে দেখেন। কিন্তু কারা তাকে এনেছিল, তা চিনতে পারিনি।
মাসুদ যখন মারা যান, সে সময় তিনি ছিলেন অঙ্গহীন একজন মানুষ। ২০১৪ সালের ২৯ এপ্রিল সকালে ক্লাসে যাওয়ার পথে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের জিয়া হলের সামনে হামলার শিকার হন তিনি। হামলাকারীরা তার ডান পায়ের নিচের অংশ গোড়ালি থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। আর কেটে দেওয়া হয়েছিল তার হাতের রগ।
সে সময় তিনি ছিলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাবেক সহসম্পাদক ও কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য। সেই হামলায় পা হারিয়ে মাসুদ একটি প্লাস্টিকের পা লাগিয়ে চলাচল করতেন।
এরপর রাজনীতি থেকে নিস্ক্রিয় হয়ে পড়েন তিনি। আট বছর বেকার থাকার পর নিজের দুর্দশার কথা জানিয়ে ২০২২ সালের শেষ দিকে একটি চাকরি চেয়ে সে সময়ের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে চিঠি লেখেন তিনি।
পরে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের চিঠি পেয়ে মাসুদকে বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টারে স্টোর অফিসার পদে নিয়োগ দেয় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। ওই বছরের ২২ ডিসেম্বর চাকরিতে যোগ দেন তিনি।
২০২৪ সালের ৭ সেপ্টেম্বর হত্যার শিকার হওয়ার কেবল চার দিন আগে একটি কন্যা সন্তানের বাবা হন মাসুদ। তার জন্য ওষুধ কিনতেই বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন বিনোদপুর বাজারে গিয়েছিলেন তিনি।
সেখানে তাকে বেদম মারধর করা হয়, ভেঙে দেওয়া হয় অন্য পা। এরপর চ্যাং দোলা করে নিয়ে যাওয়া হয় বোয়ালিয়া মডেল থানায়।
সেখানকার একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে ফেসবুকে। থানায় শুয়ে থাকা অবস্থায় তাকে বলতে দেখা যায়, ‘আমি বিনোদপুরে ওষুধ নিতে এসেছিলাম ভাই। আমি ছাত্রলীগ করতাম ওই জন্য ধরেছে। কিন্তু আমার পা ২০১৪ সালে কেটেছে ভাই। রগটগ সব কাটা ভাই। আমি তো অনেক দিন আগে থেকেই ছাত্রলীগ করা বাদ দিয়েছি ভাই।’
পরে হাসপাতালে মারা যান মাসুদ।
মামলায় কী অভিযোগ
মাসুদ হত্যার চার দিন পর ১১ সেপ্টেম্বর দুপুরে তার ভাই আয়াতুল্লাহ বেহেস্তি মামলা করেন মতিহার থানায়। এতে আসামি হিসেবে কারও নাম না দিয়ে ‘অজ্ঞাত ব্যক্তিদের’ দায়ী করা হয়।
এজাহারে বলা হয়, মাসুদ নবজাতক সন্তান ও অসুস্থ স্ত্রীর জন্য ওষুধ আনতে বিনোদপুর বাজারের ফার্মেসিতে যান। সন্ধ্যা পৌনে ৭টার দিকে ‘অজ্ঞাত কেউ বা কারা’ কৌশলে তাকে আটক করে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে গিয়ে উপর্যুপরি মারধোর করে।
তার অবস্থা মুমূর্ষু হয়ে পড়লে এক ব্যক্তি মতিহার থানায় খোঁজ নিতে আসে যে, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন পরবর্তী সময়ে কোনো হত্যা মামলা হয়েছে কিনা।
থানায় কোনও হত্যা মামলা না থাকায় ‘ওই ব্যক্তি’র নির্দেশনায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়করা তাকে বোয়ালিয়া মডেল থানায় নিয়ে যায় হত্যা মামলার আসামি হিসেবে গ্রেপ্তার দেখাতে।
থানার ফ্লোরে শুইয়ে দিয়ে এক ছাত্র সমন্বয়কের নেতৃত্বে একটি দল তাকে ঘিরে ফেলে। মারাত্মক অসুস্থ অবস্থায় তিনি এক গ্লাস পানির জন্য আকুতি-মিনতি করেন। কিন্তু সমন্বয়ক ও হামলাকারীরা তাকে পানি পান করতে দেয়নি।
মাসুদকে চিকিৎসার সুযোগ না দিয়ে তাকে হত্যা মামলার আসামি হিসেবে গ্রেপ্তার দেখানো নিয়ে ওসির সঙ্গে বাক-বিতণ্ডাও হয়। পরে ওসি তাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তায় রাত সাড়ে ১০টার দিকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাত ১২টা ৩ মিনিটে মারা যান তিনি।
এই ‘অজ্ঞাত ব্যক্তিরা’ ২০১৪ সালেও মাসুদকে মারধর করে জানিয়ে এজাহারে লেখা হয়, ‘ধারালো অস্ত্রের আঘাতে তার ডান পা হাঁটুর নিচ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। তখন থেকেই অজ্ঞাত ব্যক্তি বা ব্যক্তিরা তাকে প্রাণে মেরে ফেলার চেষ্টা করে আসছিল।’
তদন্ত থমকে
মামলার ১৮ মাস পর মতিহার থানার ওসি মো. আবুল কালাম আজাদ এই মামলার বিষয়ে কিছুই বলতে পারছেন না। টাইমসের প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘অনেক দিন আগের ঘটনা। খোঁজ নিয়ে দেখতে হবে। আর এ ব্যাপারে মিডিয়ায় আমার পক্ষে কোনো তথ্য দেওয়া সম্ভব নয়। আমাদের মহানগর পুলিশের মিডিয়া মুখপাত্র আছেন তার কাছ থেকে বক্তব্য নিতে হবে।’
রাজশাহী মহানগর পুলিশের মিডিয়া মুখপাত্র ও অতিরিক্ত উপকমিশনার গাজীউর রহমানের বক্তব্যে কোনো সারবত্তা নেই। তিনি বলেন, ‘বর্তমানে মামলাটি তদন্ত প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে। তদন্ত শেষে পরবর্তীতে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
কন্যাকে নিয়ে স্ত্রী ফিরেছেন বাবার বাড়ি
স্বামীকে হত্যার পর চাঁপাইনবাবগঞ্জে বাবার বাড়িতে ফিরে গেছেন স্ত্রী বিউটি আরা।
মাসুদদেরও গ্রামের বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার খাসেরহাট মাদ্রাসাপাড়া। পাশের গ্রাম বিনোদপুরের কবরস্থানে শেষ শয্যা হয়েছে তার।
বেহেস্তী বলেন, ‘মাসুদের স্ত্রী মেয়েকে নিয়ে বাবার বাড়িতে থাকে। তার কোনো আয়-রোজগার নেই। তারা বাইরের কারও সঙ্গে তেমন কথা বলে না।’


