অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা অধ্যাদেশ বাতিল হওয়ায় জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের কার্যক্রম নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে গণমাধ্যমে খোলা চিঠি পাঠিয়েছেন পাঁচজন কমিশনার।
সোমবার এই চিঠিতে নিজেদের অবস্থান এবং অধ্যাদেশ রহিত হওয়ার বিষয়ে বিভিন্ন মতামত তুলে ধরনের মুহাম্মদ ইউনূস সরকারের আমলে নিয়োগ পাওয়া এই কমিশনাররা।
কমিশনার ইলিরা দেওয়ান টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, অধ্যাদেশ বাতিল হওয়ার কারণে আমরা কমিশনের সদস্যরা এক ধরনের ধোঁয়াশার মধ্যে আছি। আমাদের নানা জায়গা থেকে প্রশ্ন করা হচ্ছে কমিশন গঠনের পর যে সব পদক্ষেপ নেয়া হয়েছিল সেগুলোর কী করা হবে?
সেনা নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ২০০৭ সালের ৩ ডিসেম্বর একটি অধ্যাদেশের মাধ্যমে এই কমিশন গঠন হয়। ২০০৯ সালের ১৪ জুলাই আওয়ামী লীগ সরকার সেই অধ্যাদেশ সংসদে অনুমোদন করে।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ২০২৫ সনের ৬২ নং অধ্যাদেশ দিয়ে এই আইন রহিত করে ৪ ডিসেম্বর জারি করা হয় নতুন অধ্যাদেশ।
এর অধীনে কমিশনের চেয়ারপারসন হিসেবে নিয়োগ পান হাইকোর্টের সাবেক বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী। সদস্য হিসেবে নিয়োগ পান অন্তর্বর্তী সরকারের সময় করা গুম কমিশনের সদস্য মো. নূর খান, নাবিলা ইদ্রিস, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক মো. শরিফুল ইসলাম ও মানবাধিকারকর্মী ইলিরা দেওয়ান।
বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসে অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা বেশ কিছু অধ্যাদেশ অনুমোদন করেনি। এর একটি মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ।
গত বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (রহিতকরণ ও পুনঃপ্রচলন) বিল পাস হয়। রাষ্ট্রপতির অনুমোদন সাপেক্ষে গেজেট প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে এটি কার্যকর হবে। এতে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০০৯ সালে করা ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন’ আবার চালু হবে বলে ব্যাখ্যায় বলা হচ্ছে।
তবে কমিশন সদস্যরাও বিষয়টি নিয়ে নিশ্চিত নন, আর কমিশনের কাছে নানা বিষয়ে প্রতিকার চাইতে আসা ব্যক্তিরাও বিভ্রান্তিতে আছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে অধ্যাদেশ জারির পর মানবাধিকার কমিশনার হিসেবে নিয়োগ পাওয়া ইলিরা দেওয়ান টাইমসকে বলেন, তাদের অবস্থান ও কার্যক্রম সম্পর্ক পরিষকার করতে গণমাধ্যমে খোলা চিঠি পাঠানো হয়েছে।
এ বিষয়ে আইন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কোনো আলোচনা হয়েছে কি না এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, একবার সৌজন্য সাক্ষাৎ হয়েছে, পরে আর এ বিষয়ে কোনো আলোচনা হয়নি।
ভুক্তভোগীদের প্রশ্ন, ‘এখন আমাদের কী হবে’
খোলা চিঠিতে লেখা হয়, ‘আমরা পাঁচজন সদ্য বিদায়ী মানবাধিকার কমিশনার। স্ব-স্ব ক্ষেত্রে আমাদের কর্মজীবন মানবাধিকার সুরক্ষায় নিবেদিত ছিল।…তাই কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বা ব্যক্তিস্বার্থে নয়, ভুক্তভোগীদের প্রতি কর্তব্যবোধ থেকে আজ আমরা কলম হাতে নিয়েছি।’
পাঁচ কমিশনার লেখেন, ভুক্তভোগীরা বারবার প্রশ্ন করছেন, ‘এখন আমাদের কী হবে?’। তাদের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকেই এই খোলাচিঠি লেখা হয়।
চিঠিতে বলা হয়, অধ্যাদেশটি বাতিল হওয়ায় মানবাধিকার কমিশনের স্বাধীনতা খর্ব হবে। এটি আবার আইন মন্ত্রণালয়ের অধীনে ফিরে আসবে।
সংসদে ‘ভুল তথ্য’
মানবাধিকার ও গুম বিষয়ক অধ্যাদেশ বাতিলের পক্ষে সংসদে যেসব যুক্ত দেওয়া হয়েছে, তাতে বেশ কিছু ভুল তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে বলেও চিঠিতে উল্লেখ করা হয়।
সেসব ‘ভুল’ তথ্যের বিপরীতে জবাবও দেওয়া হয়। বলা হয়, গুম বিষয়ক অধ্যাদেশ বাতিল হওয়ায় ১১ এপ্রিল থেকে কোনো নতুন গুম হলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ভুক্তভোগীরা কোনো প্রতিকার পাবেন না।
পুনর্বহালকৃত ২০০৯ আইনে, মানবাধিকার কমিশন নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের তদন্ত করতে পারবে না বলেও লেখা হয় এতে।
চিঠিতে লেখা হয়, সংসদীয় বিশেষ কমিটিমানবাধিকার কমিশনের আইনগত স্বাধীনতা খর্ব করতে চেয়েছে।
সরকারের অবস্থানে ‘একটি মৌলিক অন্তর্দ্বন্দ্ব’ আছে বলেও খোলা চিঠিতে উল্লেখ করা হয়। বলা হয়, বিশেষ সংসদীয় কমিটির আপত্তিগুলো মানলে, অনিবার্যভাবে পুনর্বহালকৃত ২০০৯ আইনের মতো দুর্বল আইন তৈরি হবে, যা জন্মলগ্ন থেকে ভুক্তভোগীদের সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ।


