জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার বিচারের জন্য পুনর্গঠন করা হয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। এই আদালতে ২৪টি মামলা বিচারের আওতায় এসেছে। এর মধ্যে বিচার শেষে তিনটি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে, রায়ের অপেক্ষায় আছে আরও দুটি।
গত প্রায় দেড় বছরে এসব মামলায় সাড়ে চারশোর বেশি আসামিকে প্রসিকিউশন বিচারের মুখোমুখি করতে সক্ষম হলেও, তাদের মধ্যে ২৯৩ জনই রয়ে গেছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। যাদের মধ্যে রয়েছেন শেখ হাসিনার মতো হেভিওয়েট আসামিও।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের গ্রেপ্তার করতে পারেনি। তাদের হাজির হতে ট্রাইব্যুনালের পক্ষ থেকে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হলেও তারা হাজির হননি। তাদের অনুপস্থিতিতে বিচার চলছে।
এছাড়া গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছেন ১৬১ জন।
এ বিষয়ে চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার শেষ করতে প্রসিকিউশন টিম বদ্ধপরিকর। যেসব আসামি পলাতক, তাদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। এ বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো কাজ করছে। তবে, গ্রেপ্তারের আগ পর্যন্ত তাদের অনুপস্থিতিতে বিচার চলবে। আমরা চাই, আইনের স্পিরিট অনুযায়ী এই বিচার দ্রুত নিষ্পত্তি হোক।’
আওয়ামী লীগের শাসনামলে গুম, খুন এবং জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে এসব মামলা হয়েছে। সব মামলার বাদী চিফ প্রসিকিউটর। তিনি ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি বা পক্ষের পক্ষ হয়ে ট্রাইব্যুনালে মামলাগুলো করেন।
গণঅভ্যুত্থানের পর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনে সংশোধনী আনা হয়। এর মাধ্যমে একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের পাশাপাশি চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারেরও পথ উন্মুক্ত হয়। পাশাপাশি গুমের বিচারের বিধানও যুক্ত হয়।
বিচার কার্যক্রম সরাসরি সম্প্রচার, ব্যক্তির পাশাপাশি সংগঠন বা দলের বিচারও করা যাবে সংশোধিত আইনে।
প্রসিকিউশন কার্যালয়ের সূত্র মতে, দুটি ট্রাইব্যুনালে ৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ২৪টি আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল হয়েছে। এর মধ্যে তিনটি মামলা রায়ের মাধ্যমে নিষ্পত্তি ঘটেছে। বাকি ২১টিতে এখনও বিচার চলমান।
রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ হত্যা মামলা এবং রামপুরায় ভবনের কার্নিশে ঝুলে থাকা আমির হোসেনকে গুলি ও দুজনকে হত্যার মামলা রায়ের অপেক্ষায় রয়েছে। এই দুই মামলায় মোট আসামির সংখ্যা ৩৫ জন।
এ বিষয়ে প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামীম বলেন, আবু সাঈদ হত্যাসহ অপেক্ষমাণ দুটি মামলার রায় শিগগিরই ঘোষণা করা হবে বলে আশা করছি।
প্রাপ্ত তথ্য মতে, গ্রেপ্তার আসামিদের মধ্যে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রী, উপদেষ্টা, সংসদ সদস্যসহ বিভিন্ন বেসামরিক ব্যক্তি রয়েছেন ৭৪ জন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের মধ্যেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আসামি রয়েছেন। এর মধ্যে পুলিশ ৬৫ জন, সেনাবাহিনীর বিভিন্ন পর্যায়ের (বর্তমান ও সাবেক) ২০ জন এবং আনসারের একজন সদস্য রয়েছেন।
এদিকে ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন মূল মামলাগুলোর পাশাপাশি তদন্তে থাকা বিবিধ মামলা (মিস কেস) ৩৪টি।
এর মধ্যে ট্রাইব্যুনাল-১, এ ৩২টি এবং ট্রাইব্যুনাল-২, এ দুটি মামলা রয়েছে। এসব মামলায় ২০৭ আসামির মধ্যে ৯৬ জন গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে এবং ১২৫ জন পলাতক।
একজন প্রসিকিউটর টাইমসকে বলেন, ‘আরও কিছু মামলার তদন্ত চলছে, তদন্ত শেষে এসব মামলাও আনুষ্ঠানিক অভিযোগের মাধ্যমে ট্রাইব্যুনালে বিচারের জন্য উপস্থাপন করা হবে। তবে, তদন্ত চলমান থাকায় তিনি এসব বিষয়ে এখনই বিস্তারিত তথ্য প্রকাশে অপরাগতা প্রকাশ করেন।’
উল্লেখযোগ্য আসামির মধ্যে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, সাবেক প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান, সাবেক আইনমন্ত্রী সালমান এফ রহমান, সাবেক মন্ত্রী অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল মুহাম্মদ ফারুক খান, শাহজাহান খান, কামরুল ইসলাম, ডা. দীপু মনি রয়েছেন।
এছাড়া সুপ্রিম কোর্টের অসরপ্রাপ্ত বিচারপতি এএইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী, সাবেক প্রধানমন্ত্রীর ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়, সাবেক তথ্য ও যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহমেদ পলক, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, যুবলীগের সভাপতি শেখ ফজলে শামস পরশ, সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল, ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক ওয়ালি আসিফ ইনানও রয়েছেন।
গত বছরের ১৭ নভেম্বর প্রথম রায়ে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ তিন আসামির মামলার রায় ঘোষণা করে আদালত।
ওই রায়ে শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃত্যুদণ্ড এবং রাজসাক্ষী হয়ে বিচারে সহযোগিতা করায় সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। রাজধানীর চানখারপুলে ছয়জনকে হত্যার ঘটনায় ২৬ জানুয়ারি ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ তিনজনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।
৫ ফেব্রুয়ারি তৃতীয় রায়ে আশুলিয়ায় লাশ পোড়ানোর মামলায় সাবেক এমপি মো. সাইফুল ইসলামসহ ছয়জনের মৃত্যুদণ্ড হয়। এ মামলায় রাজসাক্ষীকে ক্ষমা করা হলেও বাকি নয় আসামিকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়।


