মাদকের পাহারায় কিশোর, পেছনে ‘বড় ভাই’

মাদকের পাহারায় কিশোর, পেছনে ‘বড় ভাই’
প্রতীকী ছবি
Advertisement
Advertisement

চট্টগ্রামের বাকলিয়ায় মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে গত রোববার রাতে দুই পক্ষের সংঘর্ষ হয়। পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও ইটপাটকেল নিক্ষেপে এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এ ঘটনায় জসিমসহ ১৫ জনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এর পরদিন পটিয়া থেকে গ্রেপ্তার করা হয় মুরাদ বাহিনীর প্রধান মো. মুরাদকে।

পুলিশ ও স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, দুই পক্ষের বিরোধের সঙ্গে মাদক ব্যবসা ও কিশোর গ্যাংয়ের সম্পৃক্ততা রয়েছে। এ ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করেছে।

বাকলিয়ার এই ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। এর একদিন পর নগরের খুলশী থানার ওয়্যারলেস কলোনিতে বাসা থেকে ডেকে নিয়ে হৃদয় (১৬) নামের এক কিশোরকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় পাঁচজনকে আটক করেছে পুলিশ। প্রাথমিকভাবে চাঁদাবাজি ও সিনিয়র-জুনিয়র বিরোধের বিষয়টি সামনে এসেছে। তবে নিহত কিশোর ও আটক ব্যক্তিদের কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার বিষয়টিও তদন্ত করছে পুলিশ। এ ঘটনায় মামলা প্রক্রিয়াধীন বলে জানিয়েছে পুলিশ।

দুই দিনের এই দুই ঘটনা আবারও সামনে এনেছে চট্টগ্রামের কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তারের চিত্র। এসব দলে শুধু অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোর নয়, ১৮ বছরের বেশি বয়সী তরুণদেরও পাওয়া যাচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি, অস্ত্র প্রদর্শন ও এলাকার নিয়ন্ত্রণের মতো অপরাধে কিশোরদের ব্যবহার করার অভিযোগ রয়েছে।

বাকলিয়ার ঘটনা থেকে মাদক ব্যবসার সঙ্গে কিশোর গ্যাংয়ের যোগসূত্রের একটি চিত্র পাওয়া গেছে। পুলিশ ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মুরাদের সঙ্গে একসময় কাজ করতেন জসিম। মুরাদের কাছ থেকে মাদক নিয়ে বিক্রি করতেন তিনি। পরে দুইজনের সম্পর্কের অবনতি হলে জসিম অন্য উৎস থেকে মাদক সংগ্রহ শুরু করেন এবং নিজস্ব একটি বলয় গড়ে তোলেন।

এরপর মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ, জায়গা দখল ও এলাকায় আধিপত্য বিস্তার নিয়ে দুই পক্ষের বিরোধ বাড়তে থাকে। সেই বিরোধের জেরেই রোববার রাতে বাকলিয়ার সৈয়দ শাহ সড়কে সংঘর্ষ হয় বলে পুলিশ ও স্থানীয় বাসিন্দারা জানান।

স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, সংঘর্ষে দুই পক্ষের বিপুলসংখ্যক লোক অংশ নেয়, যাদের মধ্যে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরাও ছিল। পুলিশ বলছে, ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

স্থানীয় বাসিন্দা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নগরের কয়েকটি এলাকায় মাদক কারবারে কিশোরদের ব্যবহার করার অভিযোগ রয়েছে। মাদক বিক্রির জায়গায় বহিরাগতদের ওপর নজর রাখা, ক্রেতা-বিক্রেতার নিরাপত্তা দেওয়া কিংবা বিরোধ দেখা দিলে প্রতিপক্ষকে ঠেকানোর কাজে তাদের ব্যবহার করা হয়।

আরও পড়ুন

পুলিশ কর্মকর্তাদের মতে, অপরাধীদের একটি অংশ কিশোরদের সামনে রেখে নিজেদের আড়ালে রাখে। ফলে কোনো ঘটনায় কিশোররা গ্রেপ্তার হলেও নেপথ্যে থাকা প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিদের শনাক্ত করা অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে।

কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তারের সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনুপস্থিতির সম্পর্কও উঠে এসেছে পুলিশের এক জরিপে। ২০২৪ সালের মার্চে নগর পুলিশ কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নবম ও দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি নিয়ে অনুসন্ধান করে গড়ে ৪৬ শতাংশ শিক্ষার্থীর উপস্থিতি পায়। অর্থাৎ ৫৪ শতাংশ শিক্ষার্থী অনুপস্থিত ছিল।

পুলিশের অনুসন্ধানে অনুপস্থিত শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার তথ্য উঠে আসে। স্কুলের সময়টাকেই তারা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে ব্যবহারের সুযোগ হিসেবে নেয় বলে পুলিশের দাবি। তাদের বিরুদ্ধে মাদক সেবন ও কেনাবেচা, ছিনতাই, চুরি, সাইবার অপরাধ, অনলাইন জুয়া ও পর্নোগ্রাফিসংক্রান্ত অপরাধে জড়ানোর তথ্য পাওয়া গেছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা মনে করেন, এলাকায় আধিপত্য বিস্তার এবং নিজেদের ‘হিরো’ হিসেবে প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা অনেক কিশোরকে গ্যাংয়ে টেনে নিচ্ছে। ক্লাস ফাঁকি দিয়ে এলাকার বড় ভাইদের সঙ্গে সময় কাটানো থেকে ধীরে ধীরে অপরাধে জড়িয়ে পড়ার ঘটনাও রয়েছে।

এর একটি উদাহরণ ‘ডট গ্যাং’। র‌্যাবের (বিলুপ্ত) অভিযানে ধরা পড়া এই গ্যাংয়ের সদস্যরা সবাই ছিল দশম শ্রেণির ১৬ বছর বয়সী শিক্ষার্থী। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভাষ্য, এলাকায় আধিপত্য ও নিজেদের প্রভাব দেখানোর উদ্দেশ্যে তারা গ্যাংটি গড়ে তুলেছিল।

নগর পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামে সক্রিয় কিশোর গ্যাংয়ের সংখ্যা প্রায় ২০০। এসব দলে সদস্য প্রায় ১ হাজার ৪০০। গত ছয় বছরে কিশোর গ্যাংয়ের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে ৫ ৪৮টি অপরাধে, যার মধ্যে হত্যাকাণ্ড ৩৪টি।

পুলিশের জরিপে এসব গ্যাংয়ের পৃষ্ঠপোষকতা বা প্রশ্রয়ের সঙ্গে ৫ জন ওয়ার্ড কাউন্সিলরসহ ৬৪ জন ‘বড় ভাই’ জড়িত থাকার তথ্যও উঠে এসেছে।

তবে ‘কিশোর গ্যাং’ নামটি এখন শুধু অপ্রাপ্তবয়স্কদের দল বোঝাতে ব্যবহৃত হচ্ছে না। বিভিন্ন অভিযানে ১৮ থেকে ৩০ বছর বা তার বেশি বয়সী তরুণদেরও এসব দলের সদস্য কিংবা নেতা হিসেবে পাওয়া যাচ্ছে। ফলে কিশোরদের অপরাধে ব্যবহারকারী প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিদের শনাক্ত করা এখন পুলিশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

কিশোর অপরাধ নিয়ন্ত্রণে সম্প্রতি চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ জেলার ১৭টি থানা এলাকায় একযোগে অভিযান চালায়। পাড়া-মহল্লা, বাজার, রেলস্টেশন, মাঠ ও নির্জন এলাকায় চালানো ওই অভিযানে ৪৪৫ জনকে আটক করা হয়; যাদের মধ্যে ৩৫৪ জন ছিল কিশোর।

যাচাই-বাছাই শেষে অপরাধে সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ না পাওয়ায় ২৯৩ জনকে মুচলেকা নিয়ে অভিভাবকদের জিম্মায় দেওয়া হয়। অপরাধে সংশ্লিষ্টতার প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। মাদকসহ বিভিন্ন অভিযোগেও কয়েকজনকে আটক করা হয়।

পুলিশ অভিভাবকদের সন্তানদের চলাফেরা, বন্ধুবান্ধব, পড়াশোনা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের বিষয়ে নজর রাখার পরামর্শ দিয়েছে।

চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মাসুদ আলম বলেন, রাতের বেলায় নির্জন স্থানে কিশোরদের অহেতুক আড্ডা ও মাদক সেবন ঠেকাতে অভিযান অব্যাহত থাকবে। তবে শুধু পুলিশি অভিযানে কিশোর অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়; পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজকেও দায়িত্ব নিতে হবে।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad