সিনেমা হলের অন্ধকার পর্দায় চলছে বিল্লি জিন। গানটির তালে মাতাল দর্শকদের কেউই আসনে বসে নেই। কেউ গুনগুন করছে, কেউ উঠে দাঁড়িয়েছে, কেউ নাচছে। মুহূর্তটা সিনেমার হলেও পুরো হল কনসার্টে রূপ নিয়েছে। এমনই চিত্র দেখা যাচ্ছে বিশ্ব জুড়ে মাইকেল জ্যাকসন প্রেমীদের মধ্যে। মৃত্যুর ১৭ বছর পর মুক্তি পেয়েছে তার বায়োপিক ‘মাইকেল’। সিনেমাটি রীতিমত বক্স অফিসে ঝড় তুলেছে। এই ঝড় অবশ্য সমালোচকদের মনেও উঠেছে, মাইকেলকে নিয়ে থাকা নানা বিতর্কের কারণে। তাদের যৌক্তিক প্রশ্ন— বায়োপিক কি সত্যের বিকল্প হতে পারে?
শুক্রবার (২৪ এপ্রিল) মুক্তির দিনেই উত্তর আমেরিকায় প্রায় ৩৯.৫ মিলিয়ন ডলার আয়—এক কথায় বিস্ময়কর। বিশ্বব্যাপী এখন পর্যন্ত ২১৭ মিলিয়ন ডলার। ‘স্ট্রেট আউটা কম্পটন’, ‘বোহেমিয়ান র্যাপসোডি’, ‘ওপেনহাইমার’-এর প্রথমদিককার আয়কেও ছাড়িয়ে গেছে। প্রযোজনা সংস্থা লায়ন্সগেটের জন্যও এ সফলতা দরকার ছিল। কোভিড-১৯ এর পরে তাদের ঝুলিতে খুব বেশি বাণিজ্যিকভাবে সফল সিনেমা আসছিল না। এ ছবিটি সে ধারা ভেঙেছে।
মজার ব্যাপার হচ্ছে যেখানে দর্শকরা আবেগে ভাসছেন সিনেমাটি দেখে, সেখানে সমালোচকরা করছেন সরাসরি আক্রমণ ‘নীরস’, ‘ক্লিশে’, ‘প্রাণহীন’— এমন মন্তব্য থাকছে তাদের লেখা জুড়ে। সমালোচকদের সবচেয়ে বড় অভিযোগ সিনেমাটি জ্যাকসনের জীবনের অনেক জটিল বাস্তবতাকে পাশ কাটিয়ে গেছে। রটেন টম্যাটোসে সমালোচকদের ৩৫ শতাংশ স্কোরের বিপরীতে দর্শকদের স্কোর ৯৭ শতাংশ। দর্শকদের স্কোর এত বেশি হওয়ার কারণ এটি তাদের নস্টালজিক করছে; ফিরে যাচ্ছেন শৈশব, কৈশোর, যৌবনের প্রেমে।
এত বিভক্তির মধ্যেও সবপক্ষ এক জায়গায় এসে বিতর্ক করছেন না— জাফর জ্যাকসনের অভিনয়। মাইকেল জ্যাকসনের ভাতিজা হিসেবে সিনেমাটিতে যখন তাকে কাস্ট করা হয়, তখন অনেক সমালোচনা শুনতে হয়েছে নির্মাতাদের। তবে সমালোচকদের মনে যে তাকে নিয়ে কৌতূহল ছিল না তা বলা যাবে না। তিনি তার শরীরী ভাষা, নাচ, কণ্ঠস্বর— সবকিছুতে এতটাই রূপান্তর ঘটিয়েছেন যা শুধু ভক্তদের মন ভরায় নি, সমালোচকদের সমালোচনার ভাষা দুর্বল করে দিয়েছে। ‘বিল্লি জিন’ কিংবা ‘ম্যান ইন দ্য মিরর’ গানের দৃশ্যগুলোতে তিনি অসাধারণ পারফরম্যান্স করেছেন।
তবে মোটা দাগে সিনেমাটিকে দুর্বল বলার পিছনের যুক্তিগুলো এমন— নিঃসন্দেহে এটি একটি আন্তর্জাতিক মানের প্রোডাকশন। এর কনসার্ট দৃশ্যগুলো কেউ সিনেমা হল ব্যতীত দেখে উপভোগ করবে না। কিন্তু গল্পের জায়গায় যত্ন নেন নি নির্মাতা। মাইকেলের কষ্টের শৈশব, ওই বয়সে বাবার কাছ থেকে পাওয়া কঠোরতা— এসব দৃশ্য আবেগাপ্লুত করে ঠিকই। কিন্তু তার ব্যক্তিজীবনের অন্ধকার দিকগুলো দেখানোর বেলায় স্পষ্টভাবে সর্তক থেকেছেন পরিচালক। তার জীবনের নিঃসঙ্গতা, মানসিক চাপ, সবসময় পরিচয় সংকটে ভোগার ব্যাপারগুলো হৃদয় ছুঁয়েছে, কিন্তু অতটাও গভীরভাবে নয়।
তার বিরুদ্ধে শিশু নির্যাতনের অভিযোগ বহু পুরানো। কিন্তু এত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি একদমই অনুপস্থিত সিনেমায়। যেন এরকম কোনো ঘটনায় ঘটেনি মাইকেল জ্যাকসনের জীবনে। অবশ্য এটি যে একদমই ইচ্ছেকৃত বাদ দেওয়া হয়ে ব্যাপারটা এমনও না। সিনেমার মূল চিত্রনাট্যে থাকলেও এই বিষয়ে আইনী জটিলতা থাকায় তা বাদ দিতে হয়েছে। ৫০ মিলিয়ন ডলার খরচ করে পুনরায় শুটিং করতে হয়েছে। সিনেমাও শেষ করা হয়েছে ১৯৮৮ সালের ‘ব্যাড ট্যুর’ দিয়ে; যখন মাইকেলের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ উঠেইনি। এটিকে অনেকেই সরাসরি ‘হোয়াইট ওয়াশিং’ বলছেন।
সিনেমাটির কাহিনি, নির্মাণ, চিত্রনাট্য থেকে শুরু করে সবকিছুতে মাইকেল জ্যাকসনের এস্টেট ও পরিবারের প্রভাব স্পষ্ট। নির্মাণ প্রক্রিয়া নিয়ে পরিবারের ভেতরেও মতভেদ ছিল—কিছু সদস্য অংশ নেননি। ফলে পুরো নির্মাণটাই যেন একটি ‘কিউরেটেট ট্রিউবিউট’—যেখানে শিল্পীকে উদযাপন করা হয়েছে, কিন্তু মানুষটিকে পুরোপুরি উন্মোচন করা হয়নি।
শেষ দৃশ্যের ‘হিজ স্টোরি কন্টিনিউজ’— এমন বার্তা ইঙ্গিত দিচ্ছে সিক্যুয়েলের। তাই একটি প্রশ্ন বেশ জোরেসোরে আসছে— তখন কি বিতর্কিত অধ্যায়গুলো সামনে আসবে? নাকি তখন ‘গুড ইমেজ’-এর দোহায় দিয়ে এড়িয়ে যাওয়া হবে?


