ব্রহ্মপুত্র বিধৌত ময়মনসিংহের ১১টি সংসদীয় আসনে বইছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের হাওয়া। এবারের নির্বাচনে জেলার নির্বাচনী চিত্র বেশ বৈচিত্র্যময়। মাঠ পর্যায়ের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, ১১টি আসনের মধ্যে ৬টিতে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী, ৪টিতে দলটির বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থী এবং একটি আসনে জামায়াতের প্রার্থী এগিয়ে রয়েছেন। মূলত আওয়ামী লীগের ভোট ব্যাংক এবং বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলই এখন ময়মনসিংহের ভোটের ভাগ্যলিপি নির্ধারণের মূল নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ময়মনসিংহের এই লড়াইয়ে বিএনপির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন দলটিরই বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। বিশেষ করে ৬টি আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থীর সঙ্গে নিজ দলের বিদ্রোহীদের হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, আওয়ামী লীগের বিশাল ভোট ব্যাংক যে দিকে ঝুঁকে পড়বে, সেই প্রার্থীর বিজয়ই নিশ্চিত হবে। তবে কিছু কিছু আসনে আঞ্চলিকতার টানও প্রার্থীদের জয়ের পথ সুগম করতে পারে।
আসনভিত্তিক লড়াই
ময়মনসিংহ-১ (হালুয়াঘাট-ধোবাউড়া): এই আসনে ৬ জন প্রার্থীর মধ্যে বিএনপির হেভিওয়েট প্রার্থী দলের যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স। তবে তার প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছেন বিদ্রোহী প্রার্থী সালমান ওমর রুবেল। এখানে আওয়ামী লীগ ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ভোট টানায় রুবেল এগিয়ে গেছেন। এ ছাড়া নির্বাচনী সহিংসতায় তার একজন সমর্থক নিহত হওয়ার ঘটনাতেও সহানুভূতি পাচ্ছেন তিনি। সব মিলিয়ে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের মাঠে এখন পর্যন্ত খানিকটা হলেও এগিয়ে আছেন বিদ্রোহী রুবেল।
ময়মনসিংহ-২ (ফুলপুর-তারাকান্দা): ৭ জন প্রার্থীর এই আসনে লড়াই হচ্ছে বিএনপির মোতাহার হোসেন তালুকদার এবং দলটির বহিষ্কৃত সাবেক এমপি শাহ শহীদ সারোয়ারের মধ্যে। এখানে আঞ্চলিক প্রভাব এবং নতুন ভোটারদের টানার লড়াই চলছে। তবে এগিয়ে আছেন বিএনপি প্রার্থী মোতাহার হোসেন তালুকদার।
ময়মনসিংহ-৩ (গৌরীপুর): বিএনপির ইঞ্জিনিয়ার ইকবাল হোসাইনের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ও দলের বিদ্রোহী প্রার্থী আহমেদ তায়েবুর রহমান হিরণ। এখানে ৫ জন প্রার্থীর লড়াইয়ে বিএনপি মনোনীত প্রার্থীর চেয়ে এগিয়ে আছেন বিদ্রোহী প্রার্থী।
ময়মনসিংহ-৪ (সদর): এই আসনে সর্বাধিক ৯ জন প্রার্থী লড়াই করছেন। এখানে বিএনপির সহ-সংগঠনিক সম্পাদক আবু ওয়াহাব আকন্দের সরাসরি লড়াই হবে জামায়াতে ইসলামীর মহানগর আমীর মাওলানা কামরুল আহসান এমরুলের সঙ্গে। তবে এগিয়ে আছেন ওয়াহাব আকন্দ।
ময়মনসিংহ-৫ (মুক্তাগাছা): পাঁচজন প্রার্থীর এই আসনে বিএনপির প্রার্থী সাবেক প্রতিমন্ত্রী এ কে এম মোশাররফ হোসেনের ছোট ভাই জাকির হোসেন। তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নেতা অ্যাডভোকেট মতিউর রহমান আকন্দ। বর্তমানে এই আসনে মোটামুটি নিরাপদে আছে বিএনপি।
ময়মনসিংহ-৬ (ফুলবাড়িয়া): এই আসনে প্রার্থী মোট পাঁচজন। বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন আখতারুল আলম। অন্যদিকে, জামায়াত প্রার্থী কামরুল হাসান মিলন। তবে এখানে বিএনপি ও জামায়াত দুই দলেরই দুজন বিদ্রোহী প্রার্থী আছেন। এর মধ্যে বিএনপির বিদ্রোহী আখতার সুলতানা বেশ শক্তিশালী। ফলে ত্রিমুখী লড়াইয়ে বিএনপির ভোট ভাগাভাগি হতে যাচ্ছে, আর সেই সুযোগে এগিয়ে আছেন জামায়াত প্রার্থী মিলন।
ময়মনসিংহ-৭ (ত্রিশাল): এখানে ছয়জন প্রার্থীর মধ্যে দু’জনই বিএনপির বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থী। এরপরও লড়াইয়ে এগিয়ে আছেন বিএনপি মনোনীত মাহবুবুর রহমান লিটন। তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের আসাদুজ্জামান সোহেল। তবে শেষ পর্যন্ত বিদ্রোহীরা ভোটের বড় অংশে ভাগ বসালে বেকায়দায় পড়তে পরবেন তিনি।
ময়মনসিংহ-৮ (ঈশ্বরগঞ্জ): জেলার মধ্যে সবচেয়ে কম চারজন প্রার্থীর এই আসনে অনেকটা নির্ভার বিএনপির প্রার্থী প্রকৌশলী লুৎফুল্লাহেল মাজেদ বাবু। এখানে জামায়াতের কোনো প্রার্থী নেই। তবে ইসলামী আন্দোলনের মনোনয়ন নিয়ে প্রার্থী হয়েছেন বিএনপির সাবেক নেতা শাহ নুরুল কবীর। বিএনপির সঙ্গে তিনিই এখানে নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী।
ময়মনসিংহ-৯ (নান্দাইল): এই আসনের লড়াই এখন পারিবারিক লড়াইয়ে রূপ নিয়েছে। বিএনপির প্রার্থী ইয়াসির খান চৌধুরী। আর বিদ্রোহী প্রার্থী প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী তার চাচি হাসিনা খান চৌধুরী। বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য খুররম খান চৌধুরীর স্ত্রী হাসিনা চৌধুরী এখানে এগিয়ে আছেন। তার সঙ্গে ত্রিমুখী লড়াই করবেন বিডিপির আনোয়ারুল ইসলাম ও বিএনপির ইয়াসির খান।
ময়মনসিংহ-১০ (গফরগাঁও): এই আসনে বিএনপির নবীন প্রার্থী আকতারুজ্জামান বাচ্চুর মুখোমুখি হয়েছেন প্রবীণ বিদ্রোহী প্রার্থী এ বি সিদ্দিকুর রহমান। এখানে নয়জন প্রার্থীর মধ্যে আঞ্চলিকতার প্রভাবে বিদ্রোহী সিদ্দিকুর রহমান এগিয়ে আছেন। বিএনপি মনোনীত প্রার্থীর সঙ্গেই তার মূল লড়াই হবে।
ময়মনসিংহ-১১ (ভালুকা): শিল্পাঞ্চল ভালুকায় পাঁচজন প্রার্থীর মধ্যে লড়াই হবে বিএনপির ফকরউদ্দিন আহমেদ বাচ্চু এবং বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থী মোরশেদ আলমের। তবে এখন পর্যন্ত মাঠের তথ্যে লড়াইয়ে এগিয়ে আছেন বিএনপির ফকরউদ্দিন।
জেলা নির্বাচন অফিসের তথ্যমতে, ময়মনসিংহের ১১টি আসনে মোট ভোটার ৪৪ লক্ষ ৮৩ হাজার ৯১ জন। যার মধ্যে পুরুষ ২২ লক্ষ ৪০ হাজার ৫৮৬ এবং নারী ভোটার ২২ লক্ষ ২ হাজার ৪৭০ জন। ১ হাজার ৩৬০টি কেন্দ্রের ৮ হাজার ৭৪২টি কক্ষে ভোট গ্রহণ করা হবে। এর মধ্যে ৫৮৩টি কেন্দ্রকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।


