চট্টগ্রাম বন্দর পরিচালনায় বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে যুক্ত করার উদ্যোগের সমালোচনা করেছেন অর্থনীতিবিদ ও তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির সংগঠক অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ।
তিনি বলেন, ‘মনে হচ্ছে, সবার আগে সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থ, সবার আগে যুক্তরাষ্ট্র, মার্কিন স্বার্থ কিংবা ট্রাম্পের স্বার্থ। বাংলাদেশের মানুষ তো এ জন্য ভোট দেয়নি।’
তিনি আরও বলেন, ‘সরকারের মুখে সবার আগে বাংলাদেশ শোনা গেলেও বাস্তবে মনে হচ্ছে সবার শেষে বাংলাদেশ।’
মঙ্গলবার জাতীয় প্রেসক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে মিডিয়া অ্যান্ড সিভিল রাইটস সোসিটি আয়োজিত ‘চট্টগ্রাম বন্দর ও জাতীয় স্বার্থ’ শীর্ষক আলোচনায় এসব কথা বলেন আনু মুহাম্মদ।
চট্টগ্রাম বন্দরকে দেশের অর্থনীতির ‘হৃৎপিণ্ড’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘অর্থনীতির ওপর এতটা নির্ভরশীল একটি বন্দর অন্যের হাতে তুলে দেওয়ার বিষয়টি অন্য কিছুর সঙ্গে তুলনা করা যায় না।’
নৌবাহিনী ও দেশীয় বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বন্দর পরিচালনার সক্ষমতা দেখিয়েছে বলেও জানান তিনি।
আনু মুহাম্মদ বলেন, বন্দরের দক্ষতা বাড়াতে কাস্টমস, আমলাতন্ত্র ও অবকাঠামোগত ব্যবস্থায় পরিবর্তন দরকার। এসব সমস্যা সমাধানের সঙ্গে বিদেশি কোম্পানি আনার সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই।
বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে বন্দর পরিচালনায় যুক্ত করার বিষয়টি শুধু অর্থনৈতিক দৃষ্টিতে দেখার বিরোধিতা করেন তিনি। তাঁর মতে, এর রাজনৈতিক ও সামরিক দিকও রয়েছে। জাতীয় স্বার্থ ও সক্ষমতার ভিত্তিতে বন্দর পরিচালনার ব্যবস্থা গড়ে তোলা দরকার।
চট্টগ্রাম বন্দরের শ্রমিক-কর্মচারীদের আন্দোলনের প্রসঙ্গে আনু মুহাম্মদ বলেন, ‘শ্রমিক-কর্মচারীদের আন্দোলন ও প্রতিরোধের কারণে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বন্দর রক্ষা পেয়েছিল।’
জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় সেই প্রতিরোধ অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান তিনি।
আলোচনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, অর্থনীতিবিদ ও গবেষক মোশাহিদা সুলতানা ঋতু বলেন, দেশে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর, বে টার্মিনাল, নিউমুরিং ও লালদিয়ার এপিএম টার্মিনালসহ একাধিক নতুন বন্দর ও টার্মিনাল হচ্ছে। বর্তমানে দেশের কনটেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা প্রায় ৪০ লাখ টিইইউ। ২০৩৫ সালের মধ্যে তা ৮৬ লাখ টিইইউতে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে ভবিষ্যতে এত বড় সক্ষমতার প্রয়োজন হবে কি না, তা পর্যালোচনা করা দরকার বলে মনে করেন মোশাহিদা সুলতানা। কোভিড-১৯, ইউক্রেন যুদ্ধ ও বৈশ্বিক সংকটের কারণে প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও আমদানি-রপ্তানি বাড়ছে না বলেও জানান তিনি।
বন্দরের সমস্যা শুধু সক্ষমতার ঘাটতি নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, কাস্টমসে পণ্য খালাসে বিলম্ব, কনটেইনার ও ট্রাকের জট, রেল যোগাযোগের সীমাবদ্ধতাও বড় সমস্যা। এসব সমাধান না করে শুধু নতুন টার্মিনাল নির্মাণ করলে কাঙ্ক্ষিত সুফল নাও মিলতে পারে।
সিপিবির সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ আল কাফি রতন বলেন, ‘বন্দরকে শুধু আয়-ব্যয়ের হিসাব দিয়ে দেখলে হবে না। এর সঙ্গে জাতীয় স্বার্থ ও জনগণের সম্পদের মালিকানার প্রশ্ন জড়িত।’
মাওলানা ভাসানী পরিষদের সাধারণ সম্পাদক হারুন অর রশিদ বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে দেওয়ার বিষয়টি জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গেও সম্পর্কিত। জনগণের সম্পদ কাকে ও কী শর্তে দেওয়া হচ্ছে, তা জানার অধিকার জনগণের রয়েছে।
আলোচনায় নাগরিক ঐক্যের সাংগঠনিক সম্পাদক সাকিব আনোয়ার, বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রীর সভাপতি দিলীপ রায়, গণতান্ত্রিক ছাত্র কাউন্সিলের সভাপতি সায়েদুল হক নিশান ও সিবিএ নেতা নুরুল্লা বাহারসহ অন্যরা বক্তব্য দেন।


