আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের দুটি বড় রাজনৈতিক জোটে অস্থিরতা বাড়ছে। বড় দলগুলো জোটবদ্ধ হলেও ভেতরের কোন্দল কমছে না। অনেক প্রভাবশালী নেতা কেন্দ্রের সিদ্ধান্ত মানছেন না। তারা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ভোটে দাঁড়িয়েছেন। আবার অনেক আসনে একই জোটের একাধিক প্রার্থী লড়াই করছেন। এতে ছোট দলগুলোর প্রার্থীরা বিপাকে পড়েছেন। মনোনয়ন প্রত্যাহারের সময় পার হলেও সমাধান না হওয়ায় দুশ্চিন্তায় আছে জোটের কেন্দ্র।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই বিদ্রোহী প্রার্থীরাই জোটের জয়ের পথে বড় বাধা। এতে করে নিশ্চিত ভোট ভাগ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সাব্বির আহমেদ বলেন, ‘অনেক আসনে প্রার্থীর ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা জোটের প্রার্থীর চেয়ে বেশি হতে পারে। দল যখন নিজের নেতাদের বাদ দিয়ে শরিকদের আসন দেয়, তখন স্থানীয় নেতাদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়। এটি পুরো জোটের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।’
সবচেয়ে বেশি সংকট দেখা দিয়েছে বিএনপিতে। নির্দেশ অমান্য করায় দলটির অন্তত ৭২ জন বিদ্রোহী প্রার্থীকে বহিষ্কার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে সাবেক সংসদ সদস্য ও কেন্দ্রীয় নেতারাও আছেন। এর আগে কয়েকজন বহিষ্কৃত নেতা মনোনয়ন প্রত্যাহার করায় তাদের ক্ষমা করা হয়েছিল। বিএনপি এবার শরিকদের জন্য ১৬টি আসন ছেড়ে দেওয়ার ঘোষণা দেয়। এর মধ্যে নিজ নিজ দলের প্রতীক নিয়ে নির্বাচনের জন্য জমিয়তে ওলামায়ে ইসলামের দুটি অংশকে ৪টি এবং বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি), নাগরিক ঐক্য, গণসংহতি আন্দোলন, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি ও এনপিপিকে একটি করে আসন দেওয়া হয়।
এ ছাড়া ধানের শীষ নিয়ে এলডিপির দুই অংশের দুজন এবং গণঅধিকার পরিষদ, ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক মুভমেন্ট, বাংলাদেশ জাতীয় দল, ইসলামী ঐক্যজোট, জাতীয় পার্টির (কাজী জাফর) একজন করে নেতাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। তবে এর মধ্যে নাগরিক ঐক্য ও জাসদের (রব) আসনে বিএনপি নিজেই প্রার্থী দিয়েছে। অন্যদিকে অসুস্থতার কারণে নির্বাচন করছেন না জাতীয় পার্টির (কাজী জাফর) মোস্তফা জামাল হায়দার। ফলে জোটসঙ্গীদের জন্য বিএনপির ছেড়ে দেওয়া আসনের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৩টি।
তবে বিএনপির ছেড়ে দেওয়া এসব আসনেই দলের বিদ্রোহী প্রার্থী আছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী বিদ্রোহী প্রার্থীরা এখন জোটের প্রার্থীদের জন্য বড় ঝুঁকি।
পটুয়াখালী-৩ আসনের প্রার্থী গণঅধিকার পরিষদের নুরুল হক নুর জানান, বিএনপির তৃণমূলের নেতাকর্মীরা পাশে না থাকলে শরিকদের মধ্যে অবিশ্বাস তৈরি হবে। বিএনপি কথা দিয়েছে, ফলাফল যাই হোক তারা মিত্রদের সঙ্গে রাখবে।
এদিকে জামায়াত-এনসিপি জোটের অবস্থাও বেশ নাজুক। সমঝোতা অনুযায়ী এনসিপিকে ৩০টি আসন দেওয়ার কথা ছিল। ২৯টি আসনে শরিকদের প্রার্থী প্রত্যাহারের কথা থাকলেও বাস্তবে ৬টি গুরুত্বপূর্ণ আসনে তারা সরেনি। চট্টগ্রাম-৮ ও নরসিংদী-২, সুনামগঞ্জ-১ ও মৌলভীবাজার-৩ আসনে জামায়াত, নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, সিরাজগঞ্জ-৬ আসনে এবি পার্টি এবং ঢাকা-২০ ও রাজবাড়ী-২ আসনে খেলাফত মজলিসের প্রার্থীরা এখনো বহাল আছেন।
আদালতের নির্দেশে পাবনা-১ ও পাবনা-২ আসনের ভোট স্থগিত আছে। বাকি ২৯৮টি আসনের মধ্যে ১৩টিতে এখনো একই জোটের একাধিক প্রার্থী একে অপরের বিরুদ্ধে লড়ছেন।
হিসাব অনুযায়ী জামায়াত ২১৫, এনসিপি ৩০, বাংলাদেশ খেলাফত ২৩, খেলাফত মজলিস ১২, এলডিপি ৬, এবি পার্টি ও নেজামে ইসলাম পার্টি ৩টি করে এবং বিডিপি ২টি আসনে একক প্রার্থী দেওয়ার কথা। ৪টি আসন সবার জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়েছে। তবে বাস্তবে জামায়াতের প্রার্থীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২২৫ জনে। বরিশাল-৫ আসনে চরমোনাই পীরের সম্মানে প্রার্থী প্রত্যাহারের কথা থাকলেও তা হয়নি। মামুনুল হকের বাংলাদেশ খেলাফত মজলিশ ২৩টি আসন পেলেও প্রার্থী দিয়েছে ২৯টিতে।
এনসিপির মিডিয়া উপকমিটির প্রধান মাহবুব আলম বলেন, কিছু প্রার্থী সময়ের অভাবে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করতে পারেননি। বিষয়টি নিয়ে জোটের শরিকদের সঙ্গে আলোচনা চলছে।
অধ্যাপক সাব্বির আহমেদ মনে করেন, ব্যক্তিগত ও দলীয় স্বার্থের লড়াই নির্বাচনে সবসময়ই থাকে। ছোট দলগুলো বড় দলের জনপ্রিয়তার ওপর নির্ভর করে জিততে চায় বলেই সমস্যা বেশি হয়। বিশেষ করে বিএনপির অনেক নেতার দীর্ঘদিনের ত্যাগ রয়েছে। শেষ মুহূর্তে দল থেকে বাদ পড়লে তাদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক, যা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা প্রায় অসম্ভব।


