ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনির দাফনের আয়োজনের মধ্যেও উপসাগরীয় দেশগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিতে হামলা অব্যাহত রেখেছে ইরান। দেশটির দক্ষিণ উপকূলীয় ও পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জবাবে বৃহস্পতিবার এ পাল্টা হামলা চালানো হয়।
এদিনই জন্মস্থান মাশহাদে দাফন করা হয় আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে। দেশটির অন্যতম পবিত্র ধর্মীয় স্থাপনা ইমাম রেজার মাজার প্রাঙ্গণে তাকে সমাহিত করা হয়।
রয়টার্সের খবরে বলা হয়, পারস্য উপসাগরের দেশগুলোতে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে ইরানের হামলার পর প্রতিশোধমূলক হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। আয়াতুল্লাহ খামেনির দাফন আয়োজন চলাকালে ইরানের দক্ষিণাঞ্চলে একাধিক বিস্ফোরণের খবরও পাওয়া যায়।
দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানায়, বুশেহর, কোনারাক, চোগাদাক ও বন্দর আব্বাসে বিস্ফোরণ হয়েছে। বুশেহরে ইরানের অন্যতম পারমাণবিক স্থাপনা রয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের এক কর্মকর্তা দাবি করেছেন, খামেনির দাফন ঘিরে সাম্প্রতিক সময়ে তাদের বাহিনী ইরানে কোনো হামলা চালায়নি।
ইরানের সেনাবাহিনী রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তারা কুয়েতে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা, কাতারের একটি আগাম সতর্কীকরণ কেন্দ্র এবং বাহরাইনে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর একটি জ্বালানি গুদাম লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে।
কুয়েত জানিয়েছে, তাদের আকাশসীমায় একটি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র, তিনটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ১০টি ড্রোন ভূপাতিত করা হয়েছে। তবে ছিটকে পড়া ধ্বংসাবশেষে একজন আহত হয়েছেন।
জর্ডানেও একই সময়ে বিমান হামলার সাইরেন বাজানো হয়। দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা জানিয়েছে, ইরান থেকে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত হওয়ার পর আটটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা হয়েছে। এতে কোনো হতাহত বা ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি।
পরে ইরানের ইসলামিক রেভ্যুলশনারি গার্ড করপস দাবি করে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের সেনাদের ব্যবহৃত জর্ডানের আজরাক সামরিক ঘাঁটি এবং মধ্যপ্রাচ্যে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের একটি সামরিক নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রে ১০টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সামরিক ঘাঁটি রয়েছে কাতারে। দেশটি ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে বিভিন্ন সময়ে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করেছে। হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার নিন্দা জানিয়ে তারা দুই পক্ষকে কূটনৈতিক সমাধানে ফেরার আহ্বান জানিয়েছে।
তুরস্ক ও ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরাও আলাদা ফোনালাপে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচিকে সংঘাত থামানোর প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।
যুদ্ধে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালনকারী পাকিস্তানের সেনাপ্রধানের সঙ্গে ফোনালাপে আরাগচি দাবি করেন, ইরানকে হামলা করতে যুক্তরাষ্ট্র উস্কে দিচ্ছে। তিনি এই ‘উসকানিমূলক নীতির’ নিন্দাও জানান।

এদিকে চলতি সপ্তাহের শুরুতে হরমুজ প্রণালিতে কাতার ও সৌদি আরবগামী তেলবাহী জাহাজে হামলার ঘটনায় দুই পক্ষের যুদ্ধবিরতি কার্যত ভেঙে পড়ে। এরপর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তুরস্কে ন্যাটো সম্মেলনে যোগ দিয়ে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতিকে ‘শেষ’ বলে ঘোষণা করেন।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের আরেক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ইরানের সঙ্গে সমাধানে পৌঁছানোর প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে এবং কারিগরি আলোচনা চলছে। যুদ্ধ শেষ করতে না পারায় ট্রাম্প হতাশ বলেও জানান তিনি।
বিশ্লেষকদের মতে, চলতি বছরের শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন রয়েছে। তা ছাড়া উচ্চ জ্বালানি মূল্য ও ভোটারদের অসন্তোষ ক্ষমতাসীন রিপাবলিকান দলের জন্য চাপ তৈরি করছে। এই মুহূর্তে ইরান যুদ্ধ ট্রাম্পের ‘গলার কাঁটা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলেও জানান তারা।
ইরানের ইসলামিক রেভ্যুলশনারি গার্ড করপসের (আইআরজিসি) নৌবাহিনী জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের হামলা এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল পুনরায় চালু করা হয়েছিল। তবে মার্কিন বাহিনীর হস্তক্ষেপের কারণে ওই জলপথের কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
আইআরজিসির দাবি, গত দুই সপ্তাহে ইরানের তত্ত্বাবধানে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের সংখ্যা যুদ্ধের আগের তুলনায় প্রায় ৫০ শতাংশে ফিরে এসেছে। তবে এ ক্ষেত্রে তেহরানের নির্ধারিত পথ ব্যবহারকারী জাহাজগুলোকেই কেবল অনুমতি দেওয়া হচ্ছে।
আইআরজিসি সতর্ক করে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র আর কোনো হামলা চালালে ইরান তার ‘ধ্বংসাত্মক জবাব’ দেবে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি খোলা রাখতেই তারা ইরানে হামলা চালিয়েছে।
তাদের অভিযোগ, পারস্য উপসাগরে ইরানি বাহিনী তিনটি তেলবাহী জাহাজে হামলা চালিয়েছে।
মার্কিন সামরিক বাহিনী বৃহস্পতিবার জানিয়েছে, মে মাসের শুরু থেকে তারা হরমুজ প্রণালি দিয়ে ৮০০টির বেশি বাণিজ্যিক জাহাজ এবং ৩৮ কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল পরিবহনে সহায়তা করেছে। তাদের দাবি, ইরান এই জলপথ নিয়ন্ত্রণের অধিকার রাখে না।
দুই দেশের পাল্টাপাল্টি হামলায় নতুন করে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার উদ্বেগ দেখা দেয়। এতে তেলের দাম বেড়ে গেলেও বৃহস্পতিবার তা আবার কমে আসে।
যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় সামরিক কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, বুধবার তাদের বাহিনী ইরানের প্রায় ৯০টি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। এসব লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে ছিল আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, উপকূলীয় নজরদারি স্থাপনা এবং ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সংরক্ষণাগার।
ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছেন, ‘গতকাল ইরানের জাহাজে হামলার প্রতিশোধ হিসেবে এই হামলা চালানো হয়েছে। আবার এমন হলে এর চেয়েও ভয়াবহ জবাব দেওয়া হবে।’
এর পরিপ্রেক্ষিতে ইরানের প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে লিখেছেন, ‘হরমুজ প্রণালি যুক্তরাষ্ট্রের হুমকিতে নয়, কেবল ইরানের ব্যবস্থাপনার অধীনেই পুনরায় চালু হবে।’
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, গত ৮ ও ৯ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় দেশটির পাঁচটি প্রদেশে ১৪ জন নিহত এবং ৭৮ জন আহত হয়েছে। দেশটির ফার্স বার্তা সংস্থা জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের একটি হামলায় রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে বাণিজ্যে ব্যবহৃত একটি রেলসেতুও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
বুশেহরে রাশিয়ার নির্মিত একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে। স্থানীয় এক কর্মকর্তা রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের একটি ক্ষেপণাস্ত্র ওই স্থাপনার সীমানা এলাকায় আঘাত হেনেছে। এর আগে ৮ এপ্রিলের যুদ্ধবিরতির আগেও ওই এলাকার আশপাশে কয়েক দফা হামলা হয়েছিল।


