রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালের করিডোরে ঘেমে উঠেছেন রাজন বিশ্বাস। হাতে বাবার প্রেসক্রিপশন, চোখে উদ্বেগের ছাপ। পাশে নিঃশব্দে বসে আছেন বৃদ্ধ বাবা প্রশান্ত বিশ্বাস। রাজন বললেন, ‘কলকাতায় অপারেশনের তারিখ ছিল এপ্রিলের শুরুতে। সব প্রস্তুত ছিল, শুধু ভিসাটাই পাইনি। তারপর ঢাকার পাঁচটা জায়গায় ঘুরেও লাভ হয়নি। এখন এখানে চিকিৎসা করাতে খরচ প্রায় দ্বিগুণ।’
বগুড়া থেকে স্বামীকে নিয়ে আসা রোকেয়া বেগম তিন সপ্তাহ ধরে একটি তারিখের অপেক্ষায়। ‘ভারতে যেতে পারলে হয়তো এখন সার্জারির পরে বিশ্রামে থাকতেন,’ বললেন ক্লান্ত কণ্ঠে। নড়াইলের মিজানুর রহমানের হাতেও ভারতের অ্যাপোলো হাসপাতালের প্রেসক্রিপশন, কিন্তু মুখে দীর্ঘশ্বাস, ‘সব ঠিক ছিল, শুধু ভিসাটা জটিল হয়ে দাঁড়াল। ঢাকায় সিরিয়াল পাওয়াটাও এখন যুদ্ধ।’
শুধু বৃদ্ধ পিতা প্রশান্ত বা মিজান নয়, তাদের মতো হাজারো রোগী এখন ঢাকায় তো বটেই, দেশের নানা প্রান্তের হাসপাতালে একই ভোগান্তিতে পড়েছেন। ভারতীয় ভিসার কড়াকড়ির ফলে হৃদরোগ, ক্যানসার, কিডনি ও নিউরো রোগে আক্রান্ত হাজারো মানুষ বাধ্য হচ্ছেন দেশেই চিকিৎসা নিতে। হাসপাতালে উপচে পড়া ভিড়, দীর্ঘ লাইন, চিকিৎসার অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে তাদের।
এদিকে, স্বাস্থ্যখাতের চাপ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে পরিসংখ্যানে। জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের তথ্যমতে, গত তিন মাসে বহির্বিভাগে গড়ে প্রতিদিন এক হাজার ৮০০ জন রোগী এসেছেন, যা আগের তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ বেশি। এই সময়ের মধ্যে অপারেশনের জন্য অপেক্ষমান রোগীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে এক হাজার সাড়ে ছয়শ জনে, যেখানে সাধারণত এ সংখ্যা ছিল এক হাজার ২০০ জনের নিচে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ভারতীয় ভিসা প্রক্রিয়ায় পরিবর্তনের পর থেকে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। রাজধানীর বারিধারা ও মোহাম্মদপুরে ভারতীয় ভিসা সহযোগী প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা জানান, আগে যেখানে মাসে হাজার হাজার ভিসা ইস্যু হতো, এখন তা নেমে এসেছে গড়ে দুইশ’তে। ভিসা পেতে এখন দূতাবাসে আলাদা আবেদন জমা দিয়ে অপেক্ষা করতে হয় যাচাই-বাছাইয়ের জন্য। মেডিকেল ভিসার অনুমোদন হার কমে এসেছে ১০-১২ শতাংশে।
তবে বাংলাদেশিদের নিয়মিত ভারতীয় ভিসা দেওয়া হচ্ছে বলে দাবি করেছেন দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল। বৃহস্পতিবার সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে তিনি বলেন, ‘বিভিন্ন প্রয়োজনে আমরা প্রচুর ভিসা ইস্যু করছি—এর মধ্যে রয়েছে চিকিৎসা, জরুরি প্রয়োজনে যাতায়াত এবং শিক্ষার্থীদের ভিসা।’
তবে সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশিদের দেওয়া ভিসার সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান তার জানা নেই বলেও জানান তিনি।
দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা এমন অতিরিক্ত চাপ নিতে প্রস্তুত নয়। কার্ডিয়াক সার্জন সোসাইটি অব বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী, দেশে ৪২টি কার্ডিয়াক ইউনিট থাকলেও কার্ডিয়াক সার্জারির পূর্ণ সুবিধা আছে মাত্র ৩২টিতে। সরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট, ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও চট্টগ্রাম মেডিকেলেই অপারেশন হয়। খুলনা, রংপুর, সিলেটে এনজিওগ্রাম হয় ঠিকই, কিন্তু অপারেশন হয় না।
সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল মিলে ৮৭টি ক্যাথল্যাব থাকলেও আটটি ব্যবহারের অযোগ্য। জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে অকেজো হয়ে পড়ে আছে তিনটি মেশিন। এমনকি শিশু হাসপাতাল ও কয়েকটি বিভাগীয় মেডিকেল কলেজেও মেশিন থাকলেও নেই প্রশিক্ষিত জনবল।
সরকারিভাবে স্ট্যান্ট (রিং) বসানোর ব্যবস্থা আছে আটটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে, কিন্তু অতিরিক্ত চাপ সামাল দিতে পারছে না এই হাসপাতালগুলো। ঢাকার বাইরে আট বিভাগে বিশেষায়িত হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছিল ২০১৯ সালে, যা এখনও বাস্তবায়ন হয়নি। সময়সীমা বাড়িয়ে ২০২৫ পর্যন্ত করা হয়েছে, কিন্তু কাজ এগোয়নি প্রত্যাশা অনুযায়ী।
জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ডা. ওয়াদুদ চৌধুরী বলেন, ‘ঢাকার বাইরেও চিকিৎসার ব্যবস্থা আছে, তবে চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল। ফলে সবাই ঢাকায় ভিড় করছেন।’
তিনি জানান, এক হাজার ২৫০ শয্যার ইনস্টিটিউটে প্রতিদিন গড়ে দেড় হাজার থেকে এক হাজার ৮০০ রোগী ভর্তি হচ্ছেন।
বেসরকারি হাসপাতালগুলোতেও রোগীর চাপ বাড়ছে, সেই সঙ্গে রয়েছে বাড়তি খরচ। ইউনাইটেড, ল্যাবএইড, অ্যাপোলো, ইবনে সিনাসহ অনেক হাসপাতালে অপারেশনের রোগীর ডাক পড়েছে ক্রমানুসারে (সিরিয়াল) এক মাস পর।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. আহমদ পারভেজ জাবীন বলেছেন, ‘দেশের চিকিৎসা অবকাঠামো ঢাকাকেন্দ্রিক। এটা এখন পরিবর্তনের সময়। বিকেন্দ্রীকরণ না হলে সামনের দিনগুলো আরও সংকটময় হবে। দীর্ঘমেয়াদে বিদেশনির্ভরতা কমাতে স্বাস্থ্যখাতে বাজেট ও পরিকল্পনায় আমূল পরিবর্তন দরকার।’
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিক্রিয়ায় বলা হয়েছে, ‘ঢাকার বাইরে চিকিৎসা ব্যবস্থা জোরদারে আমরা অগ্রাধিকার দিচ্ছি।’
দৃশত, সবকিছুর পরেও হৃদরোগীর ভোগান্তির যেন শেষ নেই।


