‘কাঁচের জিনিসপত্র ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছিল, দেয়ালের ছবিগুলো খসে পড়ছিল। এমনকি ভবনের পিলার আর বিমগুলো থেকেও বিকট শব্দ আসছিল। একে অপরকে জড়িয়ে ধরে দৌড় দিলাম।’
এভাবেই ভেনেজুয়েলায় আঘাত হানা জোড়া শক্তিশালী ভূমিকম্পের বর্ণনা দিচ্ছিলেন কারাকাসের ৩৮ বছর বয়সী প্রকৌশলী হেসুস আলেহান্দ্রো পিনা। ভূমিকম্পের সময় তিনি একটি সাততলা ভবনের ওপরের তলায় ছিলেন।
আল জাজিরাকে বলেন, ‘একজন প্রকৌশলী হওয়ায় সহজে বুঝতে পারছিলাম তীব্র ঝাঁকুনিতে ভবনের ভেতরে আসলে কী ঘটছে। পিলার ও বিমের এই নড়াচড়া মূলত ভূমিকম্পের শক্তিকে শুষে নিতে সাহায্য করে। কিন্তু এই কম্পন যদি অতিরিক্ত সময় ধরে চলে, তবে তা সহ্যক্ষমতার চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছে যায়। আর ঠিক তখনই ভবন ধসে পড়ে।’

মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএসের তথ্য অনুযায়ী, স্থানীয় সময় বুধবার সন্ধ্যা ৬টা ৪ মিনিটে কারাকাস থেকে প্রায় ১৬৮ কিলোমিটার পশ্চিমে সান ফেলিপের কাছে ৭ দশমিক ২ মাত্রার প্রথম ভূমিকম্পটি আঘাত হানে। এর ঠিক ৩৯ সেকেন্ডের মাথায় কারাকাস থেকে পশ্চিমে ইউমারের কাছে ৭ দশমিক ৫ মাত্রার আরেকটি ভূমিকম্প আঘাত হানে। শক্তিশালী এই ভূমিকম্প দুটির উৎপত্তি ছিল যথাক্রমে মাটির ২২ ও ১০ কিলোমিটার গভীরে।
ভেনেজুয়েলার ইতিহাসে এই ভূমিকম্পটি ছিল ১৯০০ সালের ২৯ অক্টোবরের পর সবচেয়ে শক্তিশালী। ওই সময় দেশটির উপকূলবর্তী অঞ্চলে ৭ দশমিক ৭ মাত্রার একটি তীব্র ভূমিকম্প আঘাত হেনেছিল।

পরপর দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্পের আঘাতে কারাকাসে অনেক বহুতল ভবন ধসে পড়েছে এবং দেশজুড়ে এখন পর্যন্ত অন্তত ১৬৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। দেশটির অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ হতাহতের এই সংখ্যা নিশ্চিত করেছেন এবং রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া ভাষণে দেশে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছেন।
তবে ইউএসজিএস জানিয়েছে, এই জোড়া ভূমিকম্পের আঘাতে ভেনেজুয়েলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ও ১০ হাজার থেকে ১ লাখ মানুষের মৃত্যুর আশঙ্কা রয়েছে। এই দুর্যোগের প্রভাব সুদূরপ্রসারী হতে পারে।

ভূমিকম্পের সময় কারাকাসের একটি শপিং মলের শীর্ষ তলায় ছিলেন হেইডি রোমেরো (৪২) নামের এক দোকানি। কম্পন টের পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনি নিচে নামার জন্য নির্ধারিত জরুরি নির্গমন সিঁড়ির (ইমার্জেন্সি এক্সিট) দিকে যান।
নিচে নামার সময় আতঙ্কিত মানুষের চিৎকার ও হুড়োহুড়ি দেখে এএফপিকে তিনি বলেন, ‘এটি ছিল অবিশ্বাস্য। কম্পনটি কতক্ষণ স্থায়ী হয়েছিল তাও আমি জানি না। আমরা ইমার্জেন্সি এক্সিট দিয়ে কোনোমতে নিচে নেমে আসি।’

কম্পন থামার সঙ্গে সঙ্গে পিনা ও রোমেরোর মতো কারাকাসের হাজারো আতঙ্কিত বাসিন্দা ঘরবাড়ি ও ভবন ছেড়ে রাস্তায় নেমে আসেন। তারা মুখোমুখি হন চারপাশের ধ্বংসযজ্ঞ ও হাহাকারের এক ভয়াবহ দৃশ্যের।
৬৯ বছর বয়সী কারমেন গুয়েদেজ অবশ্য নিজের ঘরে ছিলেন। তার বাড়ি কারাকাসের পাহাড়ি অংশে, যেখানে অধিকাংশ পরিবার মধ্যবিত্ত। যখন ভূমিকম্প হয় তখন তিনি একটি কক্ষে শয্যাশায়ী বোনের পাশে বসে ছিলেন।

তিনি বলেন, ‘ঝাঁকুনি ক্রমাগত তীব্র হচ্ছিল। আমি দেখলাম জানালাগুলো কাঁপতে শুরু করেছে। এরপর সবকিছু দুলতে লাগল।’ তীব্র আতঙ্ক নিয়ে গুয়েদেজ ও তার বোন ঘরের মধ্যে গুটিসুটি মেরে বসে ছিলেন।
ভেনেজুয়েলার সরকারি কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ভূমিকম্পে ত্রুহিয়ো, কারাবোবো, মিরান্দা ও লা গুয়াইরা অঞ্চল সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

দেশটিতে অবস্থান করা এএফপির সাংবাদিকরা জানিয়েছেন, তীব্র কম্পনের পর বেশ কিছু আবাসিক ভবনে বড় ধরনের ফাটল দেখা দিয়েছে, দেয়ালে ধস নেমেছে এবং উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বাড়িঘর সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবি ও ভিডিওতেও কারাকাসে ব্যাপক ধ্বংসের চিহ্ন দেখা যাচ্ছে। বহু ভবন ধসে পড়েছে এবং সেখানে উদ্ধার কার্যক্রম চলছে। হাসপাতালগুলোতে আহত ব্যক্তিরা ভিড় করছেন।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে কারাকাসের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর বন্ধ রয়েছে এবং বিদ্যালয় ও রেলসেবাও বন্ধ রাখা হয়েছে। জোড়া ভূমিকম্পের পর সুনামি সতর্কতা জারি করা হলেও অল্প সময় পরই তা তুলে নেয় কর্তৃপক্ষ।


