ব্র্যাকের পচনশীল ‘পলিথিন’ ঘুরাবে কী পরিবেশের চিত্র?

ব্র্যাকের পচনশীল ‘পলিথিন’ ঘুরাবে কী পরিবেশের চিত্র?
ব্র্যাক গ্রিনপ্যাক। ছবি: সংগৃহীত
Advertisement
Advertisement

দুই দশকের বেশি সময় আগে পলিথিন নিষিদ্ধ হলেও দেশে এর ব্যবহার কমেনি। বরং প্লাস্টিক ও পলিথিন দূষণ দিন দিন বাড়ছে। এমন বাস্তবতায় ভুট্টার স্টার্চ ও ক্যালসিয়াম কার্বোনেট দিয়ে তৈরি পরিবেশবান্ধব পচনশীল ব্যাগ বাজারে এনে নতুন সম্ভাবনার কথা জানাচ্ছে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাক।

‘ব্র্যাক গ্রিনপ্যাক’ নামে এই ব্যাগ দেখতে প্রচলিত পলিথিনের মতোই স্বচ্ছ ও মজবুত। তবে উপযুক্ত পরিবেশে মাটি, পানি ও অক্সিজেনের সংস্পর্শে এলে এটি ছয় থেকে সাত মাসের মধ্যে পচে মাটির সঙ্গে মিশে যায় বলে দাবি করেছে প্রতিষ্ঠানটি।

এরই মধ্যে এই ব্যাগের বাণিজ্যিকভাবে সরবরাহ শুরু হয়েছে। গাজীপুরের টঙ্গীতে অবস্থিত ‘ব্র্যাক গ্রিনপ্যাক’ কারখানায় গত নভেম্বর থেকে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হয়।

বর্তমানে কারখানাটির মাসিক উৎপাদন সক্ষমতা ৩০ টন। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, চাহিদা বাড়লে তা ৪০ থেকে ৪৫ টনে উন্নীত করা সম্ভব। বর্তমানে প্রায় ১৫ টনের কার্যাদেশ রয়েছে।

প্রচলিত প্লাস্টিক ও পলিথিন পচে মাটির সঙ্গে মিশে যেতে সময় নেয় ৫০০ বছর পর্যন্ত। কর্মকর্তারা জানান, এই কারখানায় উৎপাদিত ব্যাগটি উপযুক্ত পরিবেশ, অর্থাৎ মাটি, পানি ও অক্সিজেনের সংস্পর্শে এলে ৬ থেকে ৭ মাসের মধ্যেই মাটিতে মিশে যায় বলে পরীক্ষায় প্রমাণ পাওয়া গেছে।

ব্র্যাক এন্টারপ্রাইজেসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তামারা হাসান আবেদ টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘আমরা প্লাস্টিক দূষণ কমিয়ে একটি টেকসই ভবিষ্যৎ নির্মাণে অবদান রাখতে চাই।’

২০০২ সালে সরকার পলিথিন ব্যাগ উৎপাদন, বিপণন ও ব্যবহার নিষিদ্ধ করলেও বাস্তবে এর ব্যবহার বন্ধ হয়নি। বিশেষ করে রাজধানীর ড্রেনেজ ব্যবস্থায় পলিথিন জমে জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ব্র্যাক কর্মকর্তারা জানান, ২০২৫ সালে সংস্থাটির চেয়ারম্যান বিকল্প প্যাকেজিং নিয়ে কাজ করার নির্দেশ দেন। সেই লক্ষ্যে সিঙ্গাপুর ও থাইল্যান্ডে ব্যবহৃত প্রযুক্তি পর্যালোচনা শেষে তাইওয়ান থেকে আধুনিক যন্ত্রপাতি আমদানি করা হয়। এরপর পলিথিন শিল্পে কাজের পূর্ব অভিজ্ঞতা রয়েছে এমন কর্মীদের নিয়োগ দিয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়; কারণ উৎপাদনে শুধু তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে পার্থক্য ছাড়া বাকি প্রক্রিয়া প্রায় একই।

বি-টু-বি বিজনেস মডেল

ব্র্যাক প্রিন্টিং প্যাকের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার মো. মাহাবুবুল হাসান জানান, বাংলাদেশে পচনশীল গ্রিন প্যাকেজিংয়ের বাজার এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে। এক টাকার প্রচলিত পলিথিনের পরিবর্তে ভোক্তা পর্যায়ে সাধারণ মানুষ এখনো দুই বা তিন টাকা খরচ করে বিকল্প প্যাকেজিং কিনতে চান না। এ কারণে সরাসরি বাজারে ছাড়ার বদলে আপাতত করপোরেট খাত, সুপারশপ এবং লাইফস্টাইল ব্র্যান্ডগুলোকে লক্ষ্য করে বিজনেস-টু-বিজনেস মডেল অনুসরণ করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, সরকার পলিথিন নিষিদ্ধ করার পর সুপারশপগুলো মাছ ও মাংসের মতো ভেজা পণ্য মোড়ানোর ক্ষেত্রে বড় ধরনের সমস্যায় পড়েছিল। অনেকে কাগজের ব্যাগের ভেতরে আবার একটি পলিথিন ব্যাগ ব্যবহার করছিল, যা নিষেধাজ্ঞার মূল উদ্দেশ্যকেই ব্যর্থ করে দিচ্ছিল। এই অবস্থায় সুপারশপ ‘স্বপ্ন’ তাদের মিট কর্নারে গ্রিনপ্যাকের পচনশীল প্যাকেজিং ব্যবহার শুরু করে। পরে চট্টগ্রামভিত্তিক ওয়েল ফুড তাদের নিজস্ব আউটলেট ও ইন-হাউস ক্যাটারিংয়ে এটি ব্যবহার শুরু করে।

বর্তমানে মীনাবাজার, ডেইলি শপিং, আমানা বিগ বাজার, প্রিন্স বাজার এবং আপন ফ্যামিলি মার্টের সঙ্গে ব্র্যাক কাজ করছে। বাটার মতো দেশের শীর্ষস্থানীয় ফুটওয়্যার ব্র্যান্ডগুলোর সঙ্গেও সরবরাহের আলোচনা চলছে।

আরও পড়ুন

অপেক্ষমান কার্যাদেশের মধ্যে সবচেয়ে বড় অর্ডারটি রয়েছে বেকারি চেইন টেস্টি ট্রিটের। এর পরেই রয়েছে স্বপ্নের কার্যাদেশ।

এছাড়া ডেইলি শপিং, আপন ফ্যামিলি মার্ট, মীনাবাজার, মধুমতি এজেন্সি, ব্র্যাক নার্সারি, ব্র্যাক সেন্টার ইন এবং বিসিডিএমের কার্যাদেশও অপেক্ষমাণ রয়েছে।

এরই মধ্যে প্রিন্স বাজার, টেস্টি ট্রিট, মিঠাই এবং ডেইলি শপিং ও ব্র্যাক হেলথকেয়ারের জন্য উৎপাদন শেষ করা হয়েছে।

তবে এই ব্যাগের দাম প্রকাশ করতে চাইছে না ব্র্যাক।

সুপার শপ প্রিন্স বাজার লিমিটেডের ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ হাবিবুল্লাহ টাইমসকে বলেন, সরকার প্লাস্টিক ও পলিথিনের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে সতর্ক করার পর তারা বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেন।

তিনি বলেন, ‘নির্দিষ্ট সময় পর এই ব্যাগ স্বয়ংক্রিয়ভাবে মাটিতে মিশে যায় বা বিলীন হয়ে যায় বলে এটি পরিবেশবান্ধব হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।’

ব্যাগের উপকরণ কী কী

গ্রিনপ্যাকের মূল কাঁচামাল কর্ন স্টার্চ এবং ক্যালসিয়াম কার্বোনেট, যা চীন ও ভিয়েতনাম থেকে আমদানি করা হয়। এতে কোনো গাছ কাটার প্রয়োজন পড়ে না।

প্যাকেজিংয়ের প্রিন্টিংয়ে ব্যবহৃত হচ্ছে ‘এনটি এন কে’ কালি। সাধারণ কালির দাম যেখানে প্রতি কেজি ৪০০ টাকা, সেখানে এই বিশেষ কালির দাম ৭০০ টাকা কেজি। এটি সম্পূর্ণ ফুড-গ্রেড ও বিষমুক্ত। ফলে প্যাকেজিং ব্যাগে কাঁচা মাছ বা মাংস সরাসরি সংস্পর্শে এলেও কোনো স্বাস্থ্যঝুঁকি থাকে না।

গ্রিনপ্যাকের উৎপাদিত পচনশীল ব্যাগের কাঁচামাল ও পচনশীলতার সক্ষমতা আন্তর্জাতিক ও দেশীয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পরীক্ষায় স্বীকৃতি পেয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, ব্যাগ তৈরিতে ব্যবহৃত কাঁচামাল আন্তর্জাতিকভাবে অস্ট্রিয়ার TÜV, অস্ট্রেলিয়ান সার্টিফিকেশন এবং OK Compost সনদপ্রাপ্ত।

এ ছাড়া বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদের পরীক্ষায় ব্যাগটি ছয় মাসে সম্পূর্ণ পচনশীল হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষায় একই সময়ে ব্যাগটির ৮১ শতাংশ ক্ষয়প্রাপ্ত হওয়ার তথ্য জানিয়েছেন তারা।

দাম ও ওজনের অর্থনৈতিক সমীকরণ

অনেক বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান কেবল প্রতি ইউনিটের দামের হিসাব করে পচনশীল প্যাকেজিংকে ব্যয়বহুল মনে করে। তবে মাহাবুবুল হাসান ওজনের দিক থেকে এক গাণিতিক সমীকরণ তুলে ধরেন।

তিনি জানান, প্রচলিত কাগজের ব্যাগের ওজন যেখানে ২০ থেকে ৩০ গ্রাম পর্যন্ত হয়, সেখানে ব্র্যাকের এই পচনশীল ব্যাগের ওজন ৫ থেকে ১০ গ্রাম। ফলের দোকান বা সুপারশপে পণ্যের ওজনের সঙ্গে কাগজের ব্যাগের বাড়তি ওজন যুক্ত হলে ক্রেতাকে অপ্রয়োজনীয় বাড়তি দাম পরিশোধ করতে হয়। কিন্তু হালকা ও নমনীয় হওয়ার কারণে ব্র্যাকের বায়োডিগ্রেডেবল প্যাকেজিংয়ে ভোক্তাকে এই বাড়তি ওজনের মাশুল গুনতে হয় না। এমনকি কর্নস্টার্চ দিয়ে তৈরি এই ব্যাগ প্রচলিত প্লাস্টিকের চেয়েও বেশি ওজন বহনে সক্ষম।

সরকারের পদক্ষেপ চান পরিবেশবিদ

পরিবেশবিদ আতিক রহমান টাইমসকে বলেন, কর্নস্টার্চ ও ক্যালসিয়াম কার্বোনেট দিয়ে তৈরি এই ব্যাগ প্রযুক্তিগতভাবে কার্যকর প্রমাণিত হলে এটি পরিবেশ সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। পণ্যটি যদি সত্যিই রাসায়নিকভাবে মাটিতে মিশে যেতে পারে, তাহলে তা সম্ভাবনাময়।

এ বিষয়ে সরকারিভাবে পরীক্ষার তাগিদ দিয়ে তিনি বলেন, ‘অন্তত এটি একটি নতুন পথের সূচনা করেছে। তবে এটি কতটা কার্যকর, সেটি সময় ও পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হতে হবে। কোনো প্রযুক্তি জনসাধারণের ব্যবহারে আনার আগে সেটিকে ‘বিয়ন্ড রিজনেবল ডাউট’ অর্থাৎ যুক্তিসঙ্গত সব সন্দেহের ঊর্ধ্বে প্রমাণিত হতে হবে। শুধু উৎপাদন ব্যয় নয়, দীর্ঘমেয়াদে এটি কার্যকর থাকে কি না, সেটিও পরীক্ষা করা জরুরি।’

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad