মরক্কোর বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে ১-১ গোলে ড্র করার পর তীব্র সমালোচনার মুখে হাইতির বিপক্ষে ঠিক কেমন ফুটবল খেলল ব্রাজিল, এখন তা নিয়ে চলছে বিশ্লেষণ। হাইতির সঙ্গে জিতলেও ব্রাজিলের খেলায় কি মন ভরলো? আন্তর্জাতিক ফুটবলবোদ্ধারা এনিয়ে কী বলছেন?
ক্রীড়া বিশ্লেষকদের বিশ্লেষণে ব্রাজিলের রণকৌশল, মাঠের শারীরিক ভাষা এবং শক্তির জায়গাগুলোর পাশাপাশি দুর্বলতাও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সবচেয়ে দুর্বল দিক হিসেবে ধরা পড়েছে মানসিকতা, যেখানে দু’এক গোলে এগিয়ে গেলেই তাদের গোলক্ষুধা মরে যায়।
ম্যাচের শুরুতে ব্রাজিলের শারীরিক ভাষায় এক ধরণের মরিয়া ভাব এবং তীব্র চাপ স্পষ্ট ছিল। প্রথম ম্যাচের জড়তা এবং সমালোচকেদের জবাব দিতে কার্লো আনচেলত্তির শিষ্যরা শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক মনোভাব নিয়ে মাঠে নামে। ফক্স স্পোর্টস এবং টাইমস অব ইন্ডিয়ার ম্যাচ বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ব্রাজিলের এই শারীরিক ভাষা ছিল অত্যন্ত ইতিবাচক ও আক্রমণাত্মক। প্রথম ম্যাচের মতো মন্থর পাসিংয়ের বদলে তারা ম্যাচের প্রথম মিনিট থেকেই গতিময় ফুটবল খেলার চেষ্টা করে। বিশেষ করে বাম প্রান্তে ভিনিসিউস জুনিয়র এবং ফুলব্যাক ডগলাস সান্তোসের রসায়ন হাইতির রক্ষণভাগকে শুরুতেই এলোমেলো করে দেয়। হাইতি ডিফেন্ডার কার্লেন্স আর্কুস ম্যাচের মাত্র ৪ মিনিটেই ভিনিসিউসকে ফাউল করে হলুদ কার্ড দেখতে বাধ্য হন, যা প্রমাণ করে ব্রাজিলের আক্রমণের তীব্রতা ম্যাচের শুরুতে কতটা বেশি ছিল।
গোল করার দক্ষতার ক্ষেত্রে এই ম্যাচে ব্রাজিলের দৃশ্যমান উন্নতি লক্ষ্য করা গেছে। প্রথম ম্যাচে যেখানে ফিনিশিংয়ের অভাবে পয়েন্ট হারাতে হয়েছিল, সেখানে এই ম্যাচে ব্রাজিল প্রথমার্ধেই দেখিয়েছে চরম কার্যকারিতা। আনচেলত্তি এই ম্যাচে স্ট্রাইকার পজিশনে ইগোর থিয়াগোর জায়গায় ম্যাথিউস কুনিয়াকে নামিয়ে জুয়া খেলেছিলেন, যা শতভাগ সফল হয়। ২৩তম মিনিটে ভিনিসিউসের শট গোলরক্ষক ফিরিয়ে দিলে রিবাউন্ড থেকে কুনিয়ার গোলটি ছিল তার নিখুঁত পজিশনিংয়ের ফসল। আবার ৩৬তম মিনিটে ক্যাসেমিরোর ট্যাকল থেকে বল পেয়ে ভিনিসিউসের পাস ধরে অফ-ব্যালেন্স থাকা অবস্থায় কুনিয়ার বাম পায়ের শটে দ্বিতীয় গোলটি ছিল বিশ্বমানের ফিনিশিং। প্রথমার্ধের অতিরিক্ত সময়ে লুকাস পাকেতার রক্ষণচেরা পাস ধরে ভিনিসিউসের তৃতীয় গোলটি প্রমাণ করে, নেইমারের অনুপস্থিতিতেও ব্রাজিলের আক্রমণভাগের গোল করার ক্ষুধা এবং ডি-বক্সের ভেতর সুযোগ কাজে লাগানোর দক্ষতা আগের ম্যাচের চেয়ে বেড়েছে।
তবে ম্যাচের সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয় ছিল প্রথমার্ধেই তিন গোলে এগিয়ে যাওয়ার পর ব্রাজিলের মানসিকতা। আল জাজিরা এবং ফক্স স্পোর্টসের ট্যাকটিক্যাল অ্যানালাইসিস অনুযায়ী, তিন গোলে এগিয়ে যাওয়ার পর ব্রাজিলের খেলায় এক ধরণের ‘গা-ছাড়াভাব’ বা ‘দ্বিতীয় গিয়ারে’ ধীর গতিতে ম্যাচ শেষ করার মানসিকতা স্পষ্ট ধরা পড়েছে। প্রথমার্ধের সেই বিধ্বংসী গোল করার ক্ষুধা দ্বিতীয়ার্ধে অনেকটাই ম্লান হয়ে যায়। আনচেলত্তি দ্বিতীয়ার্ধে গ্যাব্রিয়েল মার্টিনেলি এবং এন্ড্রিকের মতো তরুণদের মাঠে নামালেও দলের সার্বিক খেলায় সেই চনমনে ভাবটি ছিল না। পাসিংয়ের গতি কমে যায় এবং রক্ষণভাগে এক ধরণের আত্মতুষ্টি লক্ষ্য করা যায়।
ম্যাচের শেষভাগে ব্রাজিলের এই ঢিলেঢালা ভাবটির সুযোগ নিয়ে হাইতি বেশ কয়েকটি বিপজ্জনক আক্রমণ তৈরি করে। হাইতির বদলি খেলোয়াড় ডোমিনিক সাইমন এবং উইলসন ইসিডোর ব্রাজিলের রক্ষণভাগ ভেঙে একেবারে গোলমুখে চলে এসেছিলেন। লিভারপুল গোলরক্ষক অ্যালিসন বেকার যদি গোললাইনে দাঁড়িয়ে দুটি দুর্দান্ত ‘পয়েন্ট-ব্ল্যাঙ্ক’ সেভ না করতেন, তবে হাইতি অনায়াসেই গোল ব্যবধান কমাতে পারত।
বিশ্লেষকদের মতে, দুর্বল প্রতিপক্ষের বিপক্ষে এই জয়ে ব্রাজিলের নকআউট পর্বের পথ সুগম হলেও, দ্বিতীয়ার্ধের এই মনোযোগ হারিয়ে ফেলা এবং গা-ছাড়া ভাব পরের ম্যাচগুলোতে ব্রাজিলের জন্য বড় বিপদের কারণ হতে পারে। একই সাথে রাফিনহার হ্যামস্ট্রিং ইনজুরি এবং উইংয়ে ফুলব্যাকদের আক্রমণাত্মক সহায়তার অভাব ব্রাজিলের সামগ্রিক কৌশলের একটি বড় সীমাবদ্ধতা হিসেবেই রয়ে গেছে।


