বেতন ও বাস্তবতার ব্যবধান: আয় ও জীবনযাত্রার সংকটে শ্রমজীবী মানুষ

বেতন ও বাস্তবতার ব্যবধান: আয় ও জীবনযাত্রার সংকটে শ্রমজীবী মানুষ
Advertisement
Advertisement

২৫ বছর বয়সী সৈয়দ সিয়ামের জন্য বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয় পড়ার সিদ্ধান্ত বাদ দিয়ে জাপানে পাড়ি জমানোর বিষয়টি বেশ ইতিবাচক হয়েছে। সিয়াম এখন জাপানে লেখাপড়ার পাশাপাশি দৈনন্দিন জিনিসপত্রের একটি দোকানে কাজ করেন। সেখানে সরকারি নিয়মে সপ্তাহে মাত্র ২৮ ঘণ্টা কাজ করেই তিনি সেমিস্টার ফি, ঘর ভাড়া এবং ব্যক্তিগত খরচ মেটাতে পারছেন। জাপানে কঠোরভাবে ন্যূনতম মজুরি কাঠামো অনুসরণ করায় নিজের খরচ চালিয়েও প্রতি মাসে দেশে পরিবারের কাছে ৩০ হাজার টাকা পাঠাতে পারছেন তিনি।

অন্যদিকে বাংলাদেশে ২৭ বছর বয়সী নাজমুস সাকিবের জীবনযাত্রা একেবারেই ভিন্ন। রংপুরের কারমাইকেল কলেজ থেকে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেও সাকিব একটি ব্যাটারি কোম্পানিতে সেলসম্যান হিসেবে মাত্র ২২ হাজার ৫০০ টাকা বেতন পান। এই সামান্য আয়ে সংসার চালানো তার জন্য অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই অফিসের কাজ শেষে জীবনযাত্রার উচ্চমূল্যের সঙ্গে তাল মেলাতে তিনি পার্টটাইম ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চালান। সাকিবের মতে, সব জিনিসের দাম এতটাই বেড়েছে যে তিনি বাড়তি আয়ের জন্য রিকশা চালাতে বাধ্য হচ্ছেন।

এই দুই তরুণের জীবনকাহিনী বাংলাদেশে বিদ্যমান মজুরি কাঠামোর ব্যর্থতাকে স্পষ্ট করে তোলে। উন্নত বিশ্ব এবং এশিয়ার অনেক দেশে ন্যূনতম মজুরি কাঠামো অনুসরণ করে জীবনযাত্রার মান নিশ্চিত করা হয়। এর মাধ্যমে সরকারও নিয়মিত রাজস্ব পেয়ে থাকে। কিন্তু বাংলাদেশের বেসরকারি খাতের আয় এখনো এক ধরনের বিশৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

বাংলাদেশে অধিকাংশ বেসরকারি পেশায় কোনো নির্দিষ্ট ন্যূনতম বেতন কাঠামো নেই। এমনকি মাস্টার্স পাস করেও অনেককে ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকা বেতনে কাজ করতে হয়। এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. শাহাদাত হোসেন সিদ্দিকী বলেন, সব পেশায় মজুরি কাঠামো সমানভাবে কার্যকর না হওয়ায় সমাজে বৈষম্য থেকেই যাচ্ছে।

সরকারি চাকরিতে নির্দিষ্ট বেতন কাঠামো থাকলেও তা দিয়ে একটি পরিবারের টিকে থাকা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বেসরকারি খাতে ব্যাংক কর্মকর্তাদের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক বেতন কাঠামো নির্ধারণ করে দিলেও অন্য সব খাত নিজেদের ইচ্ছা অনুযায়ী বেতন ঠিক করে।

সিয়াম জানান, জাপানে যাওয়ার আগে বাংলাদেশে তিনি সেলস রিপ্রেজেন্টেটিভ হিসেবে মাত্র ৮ হাজার টাকা বেতনে কাজ করতেন, যা তার যাতায়াত খরচেই শেষ হয়ে যেত।

অধ্যাপক শাহাদাত হোসেন মনে করেন, শিক্ষার সাথে কর্মসংস্থানের অভাব একটি বড় সমস্যা। তিনি বলেন, শিক্ষার সঙ্গে দক্ষতার ঘাটতি থাকায় শিক্ষিত মানুষ কম দামে শ্রম দিতে বাধ্য হচ্ছে। ফলে দেশ এগিয়ে যেতে পারছে না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক তাসলিমা ইয়াসমিন বলেন, বাংলাদেশের শ্রমিকদের বিশ্বে ‘খুব সস্তা শ্রম’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। অনেক খাতে এখনো ন্যূনতম মজুরি বোর্ড নেই। তাই দ্রুত সব খাতকে পর্যালোচনার আওতায় এনে যুগোপযোগী মজুরি কাঠামো তৈরি করা প্রয়োজন।

মজুরি বোর্ডের কার্যক্রম ও সীমাবদ্ধতা

আরও পড়ুন

বাংলাদেশে ন্যূনতম মজুরি বোর্ড পোশাক খাতের মজুরি নিয়মিত সংশোধন করলেও অনেক পেশায় এটি চরমভাবে অবহেলিত। মজুরি বোর্ডের ৪৪টি পেশার মজুরি নির্ধারণ করার কথা থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে তা বছরের পর বছর অপরিবর্তিত রয়েছে। যেমন টাইপ ফাউন্ড্রি এবং পেট্রোল পাম্প খাতের মজুরি সর্বশেষ সংশোধিত হয়েছিল ১৯৮৩ ও ১৯৮৭ সালে। বর্তমানে টাইপ ফাউন্ড্রি পেশাটি বিলুপ্ত হলেও পেট্রোল পাম্পের সংখ্যা ও শ্রমিকের সংখ্যা অনেক বেড়েছে। অথচ ১৯৮৭ সালের নিয়ম অনুযায়ী পাম্প শ্রমিকদের মাসিক ন্যূনতম মজুরি কাগজে-কলমে এখনো মাত্র ৭৯২ টাকা।

লোহা গলানো এবং ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপ খাতে ১৬ বছর ধরে মজুরি সংশোধন করা হয়নি। ২০১০ সালে নির্ধারিত এই খাতে শ্রমিকদের মজুরি ৪ হাজার ২৪০ টাকা এবং কর্মচারীদের মজুরি ৪ হাজার ৮০০ টাকা। একইভাবে তেল কল শ্রমিকদের মজুরিও ২০১০ সালের পর আর বাড়ানো হয়নি। এছাড়া লবণ ভাঙা, দিয়াশলাই শিল্প এবং বেসরকারি শিল্পের অদক্ষ শ্রমিকদের মজুরি কাঠামো গত ১০-১২ বছর ধরে স্থবির হয়ে আছে।

এই দীর্ঘসূত্রতার বিষয়ে জানতে চাইলে ন্যূনতম মজুরি বোর্ডের চেয়ারম্যান মামুনুর রশিদ জানান, এই বিষয়গুলো ফোনে আলোচনা করা সম্ভব নয়। অনেক ইস্যু থাকায় তিনি অফিসে সরাসরি দেখা করার কথা বলেন। বোর্ডের একজন কর্মকর্তা জানান, আইন অনুযায়ী প্রতি পাঁচ বছর পরপর মজুরি পর্যালোচনার নিয়ম রয়েছে।

আইন শিক্ষক তাসলিমা ইয়াসমিন মজুরি বোর্ডের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি বলেন, মজুরি নির্ধারণের ত্রিপক্ষীয় বোর্ডে মালিকদের দাপট বেশি থাকে। শ্রমিকদের কণ্ঠস্বর সেখানে দুর্বল।

সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক ফ্রন্টের আহসান হাবিব বুলবুল অভিযোগ করেন, শ্রমিকদের প্রতিনিধি হিসেবে প্রায়ই ক্ষমতাসীন দলের নেতারা কথা বলেন। ফলে শ্রমিকদের প্রকৃত অংশগ্রহণ থাকে না। অনেক প্রতিষ্ঠানে ইউনিয়ন করতে চাইলে শ্রমিকদের ছাঁটাই করা হয়।

এগিয়ে পোশাক খাত, পিছিয়ে অন্যরা

বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক শিল্পের মজুরি নিয়মিত আপডেট করা হয়। এই খাতে ৩০ লাখেরও বেশি শ্রমিক এবং ক্রেতাদের চাপ থাকায় তারা একটি শক্তিশালী চাপ সৃষ্টিকারী গোষ্ঠী হিসেবে কাজ করে।

অধ্যাপক শাহাদাত হোসেন বলেন, বাংলাদেশের ন্যূনতম মজুরি কাঠামো মূলত পোশাক খাতকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে, যার ফলে অন্য খাতে এর প্রভাব খুব কম।

ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও সামাজিক বিশ্লেষক আফসান চৌধুরী মনে করেন, পশ্চিমা বিশ্ব যখন শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে প্রশ্ন তোলে, তখন সরকার ও মালিকপক্ষ কেবল পোশাক খাতেই উদ্যোগ নেয়। অন্য খাতগুলো সেভাবে গুরুত্ব পায় না।

পোশাক খাতে গত ২০ বছরে পাঁচবার মজুরি ঘোষণা করা হয়েছে। সর্বশেষ ২০২৪ সালে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় শ্রমিকদের আন্দোলনের মুখে বার্ষিক বেতন বৃদ্ধির হার ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৯ শতাংশ করা হয়েছে। অথচ অন্য কোনো খাতে এই সুবিধা নেই।

কমছে প্রকৃত আয়

করোনা মহামারীর পর থেকে মূল্যস্ফীতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। গত ফেব্রুয়ারিতে সাধারণ মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ১৩ শতাংশ এবং খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ৩০ শতাংশ। এর বিপরীতে মজুরি বেড়েছে গড়ে মাত্র ৫ শতাংশ। অধ্যাপক শাহাদাত হোসেন বলেন, মূল্যস্ফীতি যদি ১০ শতাংশের কাছাকাছি হয় আর মজুরি বাড়ে ৬-৭ শতাংশ, তবে শ্রমিকরা প্রকৃত কোনো সুফল পায় না। এতে তাদের জীবনযাত্রার মান আরও নিচে নেমে যায়।

তিনি আরও বলেন, এই পরিস্থিতির কারণে দারিদ্র্য বিমোচনের গতি কমে যাচ্ছে। যারা আগে থেকেই গরিব ছিল, তারা এখন বহুমুখী বঞ্চনার শিকার হচ্ছে। বর্তমান আয় দিয়ে ন্যূনতম প্রয়োজন মেটানোই এখন দায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তবে ন্যূনতম মজুরি বোর্ডের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, তাদের লক্ষ্য কোনো শিল্প বন্ধ করা নয়। বরং মালিক ও শ্রমিক উভয় পক্ষের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা যাতে শিল্পটিও টিকে থাকে এবং শ্রমিকরাও বেঁচে থাকতে পারে।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad