ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে শেষ মুহূর্তে এসেও আসন সমঝোতা নিয়ে সংকট চলছে জামায়াত জোটে। বিশেষ করে চরমোনাই পীর সৈয়দ মোহাম্মদ রেজাউল করিমের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ কাঙ্খিত আসন না পাওয়ায় বেঁকে বসেছে। তাই শেষ পর্যন্ত জামায়াত জোটে ১০ দল নাকি ১১ থাকছে তা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে।
এদিকে আসন সমঝোতার জটিলতার কারণে ১১ দলের বুধবার বিকালের সংবাদ সম্মেলন স্থগিত করা হয়েছে। রাজধানীর ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে আয়োজন করা এই সংবাদ সম্মেলনে জোটের প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করার কথা ছিল।
জানা গেছে, জামায়েত ইসলামী ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের দুই পক্ষ থেকেই এই সংবাদ সম্মেলনের আগে সমঝোতার চেষ্টা চালানো হয়। দল দুটির একাধিক সূত্র বলছে, জামায়াত শেষ পর্যন্ত ইসলামী আন্দোলনকে ৪৫টি আসন দিতে রাজি হয়। কিন্তু ইসলামী আন্দোলনের সর্বশেষ চাওয়া ৬০টি আসন। এনিয়ে সমঝোতা না হওয়ায় সংবাদ সম্মেলন স্থগিত করা হয়।
যদিও এ সংকট কাটিয়ে উঠতে মঙ্গলবার রাতেও দফায় দফায় বৈঠক হয়েছে দলগুলোর মধ্যে। বুধবার সকালেও জোটের কয়েকজন শীর্ষ নেতা চরমোনাই পীর ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমির সৈয়দ রেজাউল করিমের সঙ্গে বৈঠকে বসেন।
এদিকে, জামায়াতে ইসলামী, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, নেজামে ইসলাম পার্টি, খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা) ও বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টিতে আসন ভাগাভাগি নিয়ে খুব একটা সমস্যা নেই। মামুনুল হকের বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের কিছুটা অসন্তোষ থাকলেও সেটি সংকটের পর্যায়ে নেই।
এছাড়া শেষ সময়ে এসে এ জোটে যুক্ত হওয়া কর্নেল (অব.) অলি আহমদের নেতৃত্বাধীন লেবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) ও জুলাই যোদ্ধাদের সমন্বয়ে গঠিত জাতীয় নাগরিপ পার্টি (এনসিপি) এবং আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) সঙ্গেও আসন সমঝোতা হয়ে গেছে।
জামায়াত ইসলামের সহকারি সেক্রেটারি জেনারেল ও দলটির মিডিয়া বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জুবায়ের টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘আসন সমঝোতার বিষয়ে বুধবার যৌথ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হচ্ছে। সেই সংবাদ সম্মেলন থেকেই আসন সমঝোতার চূড়ান্ত ঘোষণা আসবে। তার আগে জোটের শীর্ষ নেতারা বৈঠক করবেন বলেও জানান তিনি। এর আগে কে কত আসন পাচ্ছে কিছু বলা যাচ্ছে না।’
আসন্ন সংসদ নির্বাচনে আসন সমঝোতায় কয়েকমাস আগে গঠিত হয় ৮ দলের মোর্চা। মূলত পরের তিনটি দল যুক্ত হওয়ার পর আসন সমঝোতা নিয়ে বেশ জটিলতা সৃষ্টি হয় আট দলে।
বিশেষ করে জামায়াতের সঙ্গে ইসলামী আন্দোলনের টানাপোড়েন শুরু হয়। যা মেটাতে গত কয়েকদিনে দুই দলের শীর্ষ নেতারা দফায় দফায় বৈঠক করেছেন।
এসব বৈঠকে নানান আলোচনার পরও এখন পর্যন্ত ইসলামী আন্দোলনের অসন্তোষ রয়েছে চরম পর্যায়ে।
দলগুলোর বিশেষ সূত্র বলছে- গত কয়েকদিনের বৈঠকে ১১ দলের আসন সমঝোতা প্রায় শেষ পর্যায়ে।
জামায়াত-১৯০ আসন, ইসলামী আন্দোলন-৪৫ আসন, এনসিপি-২৮ আসন, মামুনুল হকের বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ১৫ টি, আহমদ আব্দুল কাদেরের নেতৃত্বাধীন খেলাফত মজলিস-৫, জাগপা-১ টি, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি-২, খেলাফত আন্দোলন-১, নেজামে ইসলাম পার্টি-১, এলডিপি-৫ টি এবং এবি পার্টিকে ৩ টি আসনে মনোনয়ন দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
এই হিসাবে দলগুলো ২৯৫ আসনে নিজেদের মধ্যে সমঝোতা করেছে। অবশিষ্ট ৫ আসনের মধ্যে অমুসলিম, বিশেষ সম্প্রদায়ের প্রার্থী এবং খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তযোদ্ধাদের জন্য রাখা হয়েছে। তারা বিশেষ কোন দলের অন্তর্গত নন। তবে, শেষ পর্যন্ত কোন কোন দলের ক্ষেত্রে দুই একটি আসন বাড়তে বা কমতে পারে।
জানা গেছে, জামায়াতসহ আট দল জুলাই সনদ বাস্তবায়নসহ ৫ দফা দাবিতে প্রায় তিনমাস যুগপৎ আন্দোলনে ছিল। তারা এখন জুলাই সনদ বাস্তবায়নে গণভোটে ‘হ্যা’ এর পক্ষে জোরালো ক্যাম্পেইন চালাচ্ছে। বিশেষ করে ইসলামী দলগুলোর ভোট যেন ‘একবাক্সে’ পাঠানো যায় তা নিশ্চিতে দলগুলো আগে থেকেই জোর দিয়ে এসেছে।
আটটি দলের মধ্যে ভোটের মাঠে প্রভাব ফেলার সক্ষমতা রয়েছে জামায়াত ইসলামী ও চরমোনাই পীরের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের। দল দুটির আসন সমঝোতার মাধ্যমে নির্বাচন করায় আগামী নির্বাচনের ফলাফলে প্রভাব পড়তে পারে।
তবে, শেষ সময়ে এনসিপিকে জোটে নেওয়ার বিশেষ উদ্দেশ্য রয়েছে জামায়াত ও সমমনাদের। জুলাই আন্দোলনের সম্মুখ সারির যোদ্ধাদের নেতৃত্বে গঠিত এনসিপি যুক্ত হলে ভোটের মাঠে প্রভাব ফেলার চেয়ে তরুণ্যে শক্তিকে কাজে লাগাতে চায় জামায়াত জোট। বিশেষ করে জুলাই সনদ বাস্তবায়নে গণভোটে হ্যা এর পক্ষে জোরালো ভূমিকা রাখতে পারবেন তারা।
এছাড়া বীর মুক্তিযোদ্ধা কর্নেল (অব.) অলি আহমদের এলডিপিকে কাছে নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের ইস্যুতে বেশি প্রাধান্য দিয়েছে দলগুলো।
গত ২৯ ডিসেম্বর মনোনয়ন জমা দেওয়ার শেষ সময়ে দলগুলো আসন সমঝোতায় ব্যর্থ হওয়ায় ভিন্ন ভিন্ন ভাবে মনোনয়ন জমা দেয় এসব দলের প্রার্থীরা।
আগামী ২০ জানুয়ারি প্রার্থীতা প্রত্যাহারের শেষ দিন। এসময়ের মধ্যে দলগুলোতে আসন সমঝোতা হলে আসন প্রতি একটি দলগুলোর একজন প্রার্থী থাকবেন। অন্যরা প্রত্যাহার করবেন।


