গত বছর জুড়েই বিশ্ববাজারে নিত্যপণ্যের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। কিন্তু দেশের বাজারে তার কোনো প্রভাব দেখা যায়নি। উল্টো যেসব পণ্যের দাম কমার কথা, সেগুলোই এখন বিক্রি হচ্ছে আগের চেয়ে বেশি দামে। নতুন করে সবজি, মাছ ও মাংসের দাম আরও বেড়ে যাওয়ায় ভোক্তার পকেটে তৈরি হয়েছে বাড়তি চাপ।
বিশ্বব্যাংক এবং খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের আগস্ট পর্যন্ত আন্তর্জাতিক বাজারে ধানের দাম ৩০-৩৫ শতাংশ কমেছে। কিন্তু এই সময়ে বাংলাদেশে ধানের দাম প্রায় ১২ শতাংশ বেড়েছে।
একই সময়ে গম ও ভোজ্যতেলের দামও কিছুটা বেড়েছে। বিশ্ববাজারে গমের দাম গড়ে ৫ দশমিক ৩ শতাংশ কমলেও বাংলাদেশে ময়দার দাম বেড়েছে ১৩ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ।
তার ওপর স্থানীয় বাজারে সবজি, মাছ ও মাংসের দাম বেড়ে যাওয়ায় খাদ্য মূল্যস্ফীতির হার গিয়ে পৌঁছেছে ৮ শতাংশে। দক্ষিণ এশিয়ায় যা সর্বোচ্চ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের বাজারে পণ্যের দাম বাড়ানোর জন্য ব্যবসায়ীরা প্রায়ই আন্তর্জাতিক বাজারের দামের পরিবর্তনের অজুহাত দেন। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে যখন দাম কমে, তখন আর তারা দাম কমাতে আগ্রহী হন না। বরং সিন্ডিকেট গঠন করে বাজারে কৃত্রিম ঘাটতিও তৈরি করা হয়। যার বোঝা গিয়ে পড়ে ভোক্তাদের ওপর।
মঙ্গলবার সচিবালয়ে সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদের সভার পর অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদও স্বীকার করেছেন যে, ব্যবসায়ীদের কারণে নিত্যপণ্যের দাম কাঙ্ক্ষিত স্তরে নামছে না।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মুস্তাফিজুর রহমান টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘দুর্বল বাজার ব্যবস্থাপনার কারণে ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন পর্যায়ে কৃত্রিম ঘাটতি তৈরি করেন, আমদানি থেকে খুচরা পর্যায় পর্যন্তই তারা দাম নিয়ন্ত্রণ করেন।’
তিনি আরও বলেন, খাদ্যের চাহিদা, সরবরাহ ও মজুদ নিয়ে পরিষ্কার তথ্যের অভাবও রয়েছে। ভিন্ন ভিন্ন প্রতিষ্ঠান ভিন্ন ভিন্ন তথ্য দেয়, তাতে কার্যকর পরিকল্পনা করা কঠিন হয়ে পড়ে। এই অনিশ্চয়তার কারণে আমদানিতে বিলম্ব হওয়ায় বাজারে পণ্যের অভাব দেখা দেয়।
ডলার ও জ্বালানি তেলের দাম কমার প্রভাব কম
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে ২০২২ সালে বিশ্ববাজারে পণ্যমূল্য হঠাৎ বেড়ে যায়। ওই যুদ্ধের ব্যাপক প্রভাব পড়ে নিত্যপণ্য আমদানিনির্ভর বাংলাদেশের ওপর। টাকার বিপরীতে ডলারের দাম বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে যায়, ফলে দেশের অর্থনীতিতে দেখা দেয় অস্থিরতা। ২০২৩ সালে বিশ্ববাজারে পণ্যের দাম কিছুটা স্থিতিশীল হতে শুরু করলেও দেশের বাজারে তা সমন্বয় করতে বেগ পোহাতে হয়।
২০২২ সালের এপ্রিলে ডলারের বিনিময় হার ছিল প্রায় ৮৫ টাকা, যা ২০২৪ সালের আগস্টে বেড়ে দাঁড়ায় ১১৮ টাকার বেশিতে। ২০২৫ সালে এসে ডলার কিছুটা স্থিতিশীল হয়, মূল্য দাঁড়ায় ১১৯ থেকে ১২২ টাকার মধ্যে। গত আগস্টে ডলারের মূল্য আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৪ শতাংশ বেশি ছিল। তবে ডলারের এই স্বল্প মূল্যবৃদ্ধি সত্ত্বেও, বাংলাদেশে নিত্যপণ্যের দামে কোনো উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা যায়নি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিত্যপণ্যের দামের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হলো জ্বালানি তেলের দাম। তাদের মতে, সম্প্রতি বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমলেও, দেশের বাজারে তার কোনো প্রভাব দেখা যাচ্ছে না।
বিশ্বব্যাংকের মাসিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২২ সালে বিশ্ববাজারে প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত তেলের গড় মূল্য ছিল ৯৭ দশমিক ১০ ডলার। ওই সময়ে বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের দাম প্রায় ৫২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছিল। ২০২৫ সালের আগস্টে বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমে দাঁড়ায় ৬৬ দশমিক ৭০ ডলারে। তারপরও বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের তথ্য বলছে, এই সময়ের মধ্যে দেশে জ্বালানি তেলের দামে তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য হ্রাস দেখা যায়নি।
ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) নতুন সভাপতি ও সাবেক সচিব এএইচএম সাফিকুজ্জামান টাইমস অব বাংলাদেশকে জানান, জ্বালানি নিয়ন্ত্রণ কমিশন সব সময়ই ক্ষতির দোহাই দিয়ে মূল্যবৃদ্ধিতে সমর্থন জোগায়। তার মতে, সরকারের অভ্যন্তরীণ সমন্বয়ের অভাবেই ভোক্তাদের স্বার্থরক্ষা সম্ভব হচ্ছে না।

বেশি দাম চালের
বিশ্বব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২৫ সালের আগস্টে থাইল্যান্ডের সাদা চালের রপ্তানি মূল্য ৫ শতাংশ কমে টনপ্রতি নেমে আসে ৩৭৮ দশমিক ৮০ ডলারে। ২০২৪ সালের আগস্টে যেখানে দাম ছিল ৫৩৫ দশমিক ৩০ ডলার। এতে করে এক বছরে দাম কমে আসে ২৯ দশমিক ২৩ শতাংশ। এফএওর তথ্য বলছে, এই সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে চালের দাম কমেছে ৩৫ দশমিক ৩ শতাংশ।
যদিও দেশের চিত্রটা ভিন্ন। ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্য বলছে, ২০২৪ সালের আগস্টে মোটা চালের দাম ছিল প্রতি কেজি ৫২-৫৫ টাকা, মাঝারি মানের চাল ছিল ৫৫-৬০ টাকা এবং চিকন চাল বিক্রি হয়েছে ৬৪-৮০ টাকায়। ২০২৫ সালের আগস্টে এসে মোটা চালের দাম বেড়ে দাঁড়ায় ৫৫-৬০ টাকায়, মাঝারি চাল ৬০-৭৫ টাকা এবং চিকন চাল ৭৫-৮৫ টাকা। এর ফলে এক বছরে চালের গড় মূল্য বেড়ে যায় প্রায় ১২ শতাংশ।
বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান তৃতীয় বৃহত্তম চাল উৎপাদনকারী দেশ হিসেবে। তারপরও, দেশটি প্রতিবছর চাল আমদানি করে, মূলত ভারত থেকে। এছাড়া, মিয়ানমার, পাকিস্তান ও ভিয়েতনাম থেকেও সরকারিভাবে চাল আমদানি করা হয়। চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশ ভারত থেকে ৮ লাখ টন চাল আমদানি করেছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ গত বুধবার জানায়, সরকার এ বছর ১৭ লাখ টন বোরো চাল ও ধান সংগ্রহ করেছে।
মঙ্গলবার সচিবালয়ে এক বৈঠক শেষে অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘চালের দাম নিয়ন্ত্রণে সরকার আতপ চাল আমদানির অনুমোদন দিয়েছে। বাজারে সরবরাহে যেন ঘাটতি না হয়, তা নিশ্চিত করতে থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনাম থেকে চাল আমদানি করা হবে।’
তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় প্রশ্ন
বিশ্বব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২৪ সালের আগস্টে প্রতি টন সয়াবিন তেলের দাম ছিল ১ হাজার ৩১ ডলার। ২০২৫ সালের আগস্টে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ২৪৫ ডলারে। এই মূল্যবৃদ্ধিকে কাজে লাগিয়ে ব্যবসায়ীরা সরকারকে ভোজ্যতেলের দাম প্রতি লিটার ১০ টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব দেন।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামের পরিবর্তনের প্রভাব দেশীয় বাজারে পৌঁছাতে সাধারণত দুই থেকে তিন মাস সময় লাগে। আমদানি করা তেল প্রথমে দেশে আসে, এরপর তা পরিশোধিত হয়, পরে তা বাজারে আসে। গত জুনে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি টন তেলের দাম ছিল ১ হাজার ১৭৮ ডলার, সে অনুযায়ী দেশে তেলের দাম বাড়ানোর যৌক্তিকতা নেই।
এই মুহূর্তে তেলের দাম বাড়ানো যৌক্তিক কি না, এমন প্রশ্নে বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের ট্রেড পলিসি ডিভিশনের উপপ্রধান মো. মাহমুদুল হাসান বলেন, ‘সে বিষয়ে মন্তব্য করা সম্ভব নয়। বিষয়টি নিয়ে পর্যালোচনা চলছে। তবে যদি দাম ১০ টাকা বাড়ানোর যৌক্তিকতা থাকত, তাহলে সরকার তা অনুমোদন দিত।’
সিপিডির মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘ভারতসহ অনেক দেশেই স্থায়ী কৃষি মূল্য কমিশন রয়েছে, যা বাজারে স্থিতিশীলতা রক্ষায় নিয়মিত নজরদারি করে। বাংলাদেশেরও এমন একটি কাঠামো থাকা প্রয়োজন।’
নতুন ফসল বাজারে এলে চালের দাম আরও কমবে বলে আশা প্রকাশ করেন বাণিজ্যসচিব মাহবুবুর রহমান। টাইমস অব বাংলাদেশকে তিনি বলেন, ‘এরই মধ্যে চালের দাম কেজিপ্রতি ১–২ টাকা কমেছে এবং সরবরাহ বাড়লে দাম আরও কমবে।’
আগামী রমজানের আগে নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে আসবে বলে প্রত্যাশা তার, কারণ সরকার ২৪ ঘণ্টাই বাজারে নজর রাখছে।


