বাংলাদেশে অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়েছে, কিন্তু মানুষের জীবনমান ও স্থানীয় সেবার ক্ষেত্রে উন্নতি হয়নি বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সদস্য বদিউল আলম মজুমদার।
তার মতে, দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে বিকেন্দ্রীকরণ ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।
ঢাকার পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটে (পিআরআই) বৃহস্পতিবার আয়োজিত ‘ক্যান বাংলাদেশ ডেভেলপ উইথআউট ডিসেন্ট্রালাইজিং? সাম লেসনস ফ্রম ইস্ট এশিয়া অ্যান্ড থটস অন দ্য লোকাল গভর্নমেন্ট রিফর্ম অ্যান্ড আদার কমিশনস রিপোর্ট’ শীর্ষক সেমিনারে এই মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘উন্নয়ন মানে কেবল সেতু, এক্সপ্রেসওয়ে বা বিদ্যুৎকেন্দ্র নয়, প্রকৃত উন্নয়ন মানে মানুষের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষার উন্নতি।’
বদিউল আলম মজুমদার আরও বলেন, ‘জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় সরকার নির্বাচন উপেক্ষিত হয়েছে। সংবিধানের ৫৯ ও ৬০ অনুচ্ছেদে স্থানীয় সরকারের দায়িত্ব, ক্ষমতা ও দায়বদ্ধতা স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে। কিন্তু বাস্তবে স্থানীয় সরকার প্রশাসনের অধীনে পরিচালিত হচ্ছে, জনগণের কাছে নয়।’
তিনি ইতিবাচক পরিবর্তনের জন্য রাজনৈতিক সংস্কারের অপরিহার্যতার কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘যদি রাজনীতি জনসেবার পরিবর্তে ব্যবসা হিসেবে পরিচালিত হয়, তাহলে সৎ ও যোগ্য ব্যক্তিরা রাজনীতিতে প্রবেশে অনীহা প্রকাশ করবে, আর পরিবর্তন কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকবে।’
পলিসি এক্সচেঞ্জ অব বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী মাসরুর রিয়াজ বলেন, ‘গত এক বছরে, বাংলাদেশ তিনটি স্তরের অগ্রাধিকার নিয়ে এগিয়েছে: অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি স্থিতিশীল করা, শাসন ব্যবস্থা পুনঃস্থাপন এবং নির্বাচিত গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থায় স্থানান্তর। এই তিনটির সঙ্গে নগরায়ন ব্যবস্থাপনা ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত এবং বিকেন্দ্রীকরণ এর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’
তিনি জানান, ‘বাংলাদেশে ১৯৭০ সালের পর দারিদ্র্য হ্রাস ১৮ শতাংশ হওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হলেও, সম্প্রতি আবার প্রায় ২৭ শতাংশে পৌঁছেছে। শুধু দারিদ্র্য বৃদ্ধি পাচ্ছে না, বরং অঞ্চলভিত্তিক বৈষম্যও রয়েছে। চট্টগ্রামে ১৫ শতাংশ আর বরিশালে ২৬ শতাংশ। গ্রামীণ এলাকায় ৩১ শতাংশ, শহরে ১৯ শতাংশ।’
মাসরুর রিয়াজ বাংলাদেশের বর্তমান আঞ্চলিক বৈষম্যের দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, ‘দেশের মোট অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের ৪৪ শতাংশ ঢাকায় এবং চট্টগ্রামে ঘনভাবে কেন্দ্রীভূত, বাকি ছয় বিভাগ মিলিয়ে মাত্র ৫৫ শতাংশ। এই একমুখী কেন্দ্রীকরণ ঢাকার উপর চাপ সৃষ্টি করছে, যা প্রতিবছর ৮ মিলিয়ন কর্মঘণ্টার ক্ষতি এবং প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক ক্ষতি করছে।’
চাকরি সৃষ্টি বাংলাদেশের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবৃদ্ধির সহায়ক ছিল, তবে সাম্প্রতিক তথ্যগুলো ধীরগতির প্রবৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয় বলে মন্তব্য করেন তিনি। তিনি জানান, ‘১৯৭০ সালের শেষ থেকে ২০১৫ পর্যন্ত চাকরি সৃষ্টি দ্রুত ছিল, কিন্তু ২০১৫ থেকে তার হার দ্রুত পড়ে গেছে, ৩ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে ১ দশমিক ৮ শতাংশ। ২০২৩ সালে, বাংলাদেশ গত দুই দশকে সর্বনিম্ন নতুন চাকরি সৃষ্টি করেছে শুধু ৫ মিলিয়ন, যা পূর্ববর্তী দুই দশকের গড় বার্ষিক সৃষ্টির ১ দশমিক ১২ মিলিয়নের তুলনায় কম। আরও উদ্বেগজনক, নারীদের শ্রমবাজারে অংশগ্রহণও হ্রাস পাচ্ছে এবং গ্রামীণ কর্মসংস্থান স্থবির। গ্রামীণ এলাকায় বেকারত্ব উচ্চ, এবং শহুরে এলাকায় যুব বেকারত্ব একটি গুরুতর সমস্যা।’
তিনি শহরের ঘনত্ব এবং নগর পরিকল্পনার গুরুত্ব উল্লেখ করে বলেন, ‘২০৫০ সালের মধ্যে ৫৬ শতাংশ জনসংখ্যা শহরে বসবাস করবে। ঢাকায় ঘনত্ব থাকলে ট্রাফিক জ্যামের কারণে বছরে প্রায় ৮ মিলিয়ন ঘণ্টা কাজের সময় অপচয় হয়, যা জিডিপির প্রায় ৬ শতাংশ ক্ষতি করে। ছোট শহর এবং পৌরসভাগুলির সক্ষমতা বৃদ্ধি না করলে, নগর স্থানান্তর এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ঝুঁকিতে পড়বে।’
জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কে মাসরুর রিয়াজ সতর্ক করে বলেন, ‘আগামী ২০-২৫ বছরে প্রায় ১৩ মিলিয়ন জলবায়ু শরণার্থী আসবে, যারা মূলত উপকূলীয় এলাকা থেকে শহুরে বা আধা শহুরে এলাকায় স্থানান্তরিত হবে। তাদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার জন্য কেন্দ্রীয় পরিকল্পনা ও কার্যকর স্থানীয় সরকার অপরিহার্য।’
সেমিনারে পিআরআইয়ের পরিচালক আহমদ আহসান বলেন, ‘বাংলাদেশের অর্থনীতি ও মানব উন্নয়নে অগ্রগতি থাকলেও স্থানীয় সরকারের দুর্বলতা ও জবাবদিহির অভাবে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পানি, স্যানিটেশন ও মৌলিক অবকাঠামোতে মানুষ উপযুক্ত সেবা পাচ্ছে না। টেকসই উন্নয়ন এবং কার্যকর শহর ও নগর গড়ে তুলতে জবাবদিহিমূলক স্থানীয় সরকার অপরিহার্য।’
আহসান পূর্ব এশিয়ার দ্রুত উন্নয়নের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, ‘বিকেন্দ্রীকরণের কাঠামো তৈরি, জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে পারফরম্যান্স সূচক ব্যবহার এবং স্থানীয় সরকারের মূল স্তরগুলো নির্ধারণ করা সফলতার চাবিকাঠি।’


