ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল বিএনপি বর্তমান রাষ্ট্রপতির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে নতুন কাউকে এই পদে নিয়োগ দেওয়ার কোনো পরিকল্পনা নেই বলে ইঙ্গিত দিয়েছে। তবে দলের পক্ষ থেকে তাকে মেয়াদ পূর্ণ করার বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব দেখানো হলেও রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন নিজে আগামী ১২ মার্চ ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনের পর পদে থাকবেন কি না, সে বিষয়ে এখনও চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত নেননি।
‘টাইমস অব বাংলাদেশ’-এর সঙ্গে আলাপচারিতায় মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন বলেন, রাষ্ট্রপতি পদে তার থাকার বিষয়টি মূলত ক্ষমতাসীন দলের ওপর নির্ভর করছে। তিনি জানান, সরকারি দল তাঁকে রাখতে চাইলে তিনি থাকবেন কিনা এনিয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেননি।
রাষ্ট্রপতির এমন মন্তব্য তার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে ক্ষমতাসীন দলের অবস্থানের দিকেই ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সংসদের প্রথম অধিবেশনকে সামনে রেখে যখন রাজনৈতিক বিতর্ক তুঙ্গে, ঠিক তখনই রাষ্ট্রপতির পক্ষ থেকে এমন বক্তব্য এল। ১২ মার্চের এই অধিবেশন কেবল আলোচ্যসূচির জন্যই নয়, বরং রাষ্ট্রপতির পদের স্থায়িত্বের প্রশ্নেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের জ্যেষ্ঠ নেতাদের মতে, রাষ্ট্রীয় ও সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষা করা জরুরি। তাদের যুক্তি হচ্ছে, মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে রাষ্ট্রপতিকে সরিয়ে দেওয়ার মতো কোনো যৌক্তিক কারণ বর্তমানে নেই। তারা মনে করেন, সাংবিধানিক রীতিনীতির বাইরে গিয়ে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হলে এই স্পর্শকাতর সময়ে তা ভুল রাজনৈতিক বার্তা দিতে পারে।
তবে বিএনপির ভেতরে ভিন্ন মতও রয়েছে। কিছু নেতা মনে করেন, সংসদের উদ্বোধনী অধিবেশন শেষ হওয়ার পর রাষ্ট্রপতিকে স্বেচ্ছায় পদত্যাগের জন্য উৎসাহিত করা যেতে পারে। তাদের মতে, এমনটা করা হলে কোনো ধরনের সাংবিধানিক সংকট ছাড়াই বিএনপির কোনো জ্যেষ্ঠ নেতাকে ওই পদে বসানো সম্ভব হবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, রাষ্ট্রপতির ভাগ্য এখন আইনি বাধ্যবাধকতার চেয়ে বিএনপির উচ্চপর্যায়ের কৌশলগত সিদ্ধান্তের ওপর বেশি নির্ভর করছে।
সম্ভাব্য উত্তরসূরি নিয়ে গুঞ্জন
রাষ্ট্রপতির পদটি যদি কোনো কারণে শূন্য হয়, তবে উত্তরসূরি হিসেবে বিএনপির বেশ কয়েকজন হেভিওয়েট নেতার নাম আলোচনায় রয়েছে। এর মধ্যে দলটির স্থায়ী কমিটির জ্যেষ্ঠতম সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের নাম বিশেষভাবে শোনা যাচ্ছে। এছাড়া আলোচনায় আছেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান।
তবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বর্তমান রাষ্ট্রপতির মেয়াদ শেষ না হতেই এই আলোচনা শুরু হওয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। গণমাধ্যমের প্রশ্নে তিনি জানান, বিএনপিতে রাষ্ট্রপতি হওয়ার মতো যোগ্য অন্তত তিন-চারজন নেতা আছেন। তবে বর্তমান রাষ্ট্রপতির মেয়াদ শেষ হয়নি। এনিয়ে সকল সিদ্ধান্ত অবশ্যই সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে থেকে নেওয়া হবে।
আইনি জটিলতা ও রাজনৈতিক সংকেত
সংসদ আহ্বান এবং উদ্বোধনী ভাষণ দেওয়ার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করে উচ্চ আদালতে ইতিমধ্যে একটি রিট পিটিশন দায়ের করা হয়েছে। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা রাষ্ট্রপতির ভাষণের পর আলোচনায় অংশ নেওয়ার বিষয়ে অনীহা প্রকাশ করেছেন। এসব টানাপোড়েনের মধ্যেও বিএনপি জানিয়েছে, তারা সাংবিধানিক রীতিনীতি বজায় রাখতে বদ্ধপরিকর এবং সংসদীয় প্রথা অনুযায়ী কার্যক্রম পরিচালনা করবে। নিয়ম অনুযায়ী ১২ মার্চ রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন উদ্বোধনী ভাষণ দেবেন এবং নবনির্বাচিত স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারকে শপথ পাঠ করাবেন।
স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন
প্রথম অধিবেশনে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচনের বিষয়টিও বেশ গুরুত্ব পাচ্ছে। স্পিকার পদের জন্য ড. আব্দুল মঈন খান, প্রবীণ আইনজীবী জয়নুল আবদিন, সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ড. ওসমান ফারুক এবং মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী হাফিজ উদ্দিন আহমদের নাম শোনা যাচ্ছে। এর মধ্যে জয়নুল আবদিন প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলেও তার আইনি ও সাংবিধানিক দক্ষতার কারণে তিনি আলোচনায় এগিয়ে আছেন।
এদিকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ৩১ দফার প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সরকারি দল ডেপুটি স্পিকারের পদটি বিরোধী দলকে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ কথা নিশ্চিত করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, ডেপুটি স্পিকারের পদে জামায়াতের কাছে নামও চাওয়া হয়েছে।
জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকেও ডেপুটি স্পিকার পদ গ্রহণে সম্মতি আছে। এক্ষেত্রে পাবনা-১ আসনের নজিবুর রহমান মোমেন এবং সিরাজগঞ্জ-৪ আসনের রফিকুল ইসলাম খানের নাম তাদের বিবেচনায় রয়েছে।
একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্য
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, বিএনপি বর্তমানে একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করছে। একদিকে তারা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের স্থিতিশীলতা এবং সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার প্রতি শ্রদ্ধা দেখাতে চায়, অন্যদিকে রাজনৈতিক প্রয়োজনে নেতৃত্বের পরিবর্তনের পথও খোলা রাখতে চায়।
রাষ্ট্রপতি নিজেই যখন বলছেন সরকারি দল চাইলে তিনি থাকবেন কি না তা এখনও ভাবেননি, তখন এই পদটিকে ঘিরে এক ধরনের অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে। তাই ১২ মার্চের সংসদ অধিবেশন কেবল একটি আনুষ্ঠানিক আয়োজন নয়, বরং এটি দেশের নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থায় সাংবিধানিক আনুষ্ঠানিকতা ও ক্ষমতার বাস্তবতার মধ্যে সমন্বয় দেখার একটি বড় সুযোগ।


