ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে মিলেছে চার দিনের ছুটি। একসঙ্গে চার দিনের ছুটি ও দীর্ঘদিন পর ভোট দেওয়ার সুযোগ পেয়ে রাজধানী এবং আশপাশের এলাকা থেকে গ্রামের বাড়িতে ফিরছেন মানুষ। এর ফলে মঙ্গলবার ঢাকা–আরিচা, ঢাকা–টাঙ্গাইল, ঢাকা–ময়মনসিংহ ও ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়কে সৃষ্টি হয়েছে তীব্র যাত্রীচাপ। কোথাও দীর্ঘ অপেক্ষা, কোথাও যানজটের পাশাপাশি বিভিন্ন স্থানে গণপরিবহনে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগও উঠেছে।
শিল্পাঞ্চল সাভার, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরে বাসস্ট্যান্ড ও মহাসড়কগুলোতে দেখা গেছে যাত্রীদের ভোগান্তি। বাস সংকটের কারণে অনেকেই নিরুপায় হয়ে ট্রাক, মাইক্রোবাস কিংবা রেলপথে যাত্রার চেষ্টা করছেন। যাত্রীদের মতে, যেকোনো কষ্ট সহ্য করেও ভোট দেওয়ার সুযোগ হাতছাড়া করতে চান না তারা।
সাভারে বাস সংকট, বাড়তি ভাড়ার অভিযোগ
মঙ্গলবার সাভারের ঢাকা–আরিচা ও ঢাকা–টাঙ্গাইল মহাসড়কে দক্ষিণ ও উত্তরবঙ্গগামী দূরপাল্লার বাসে যাত্রীদের উপচে পড়া ভিড় দেখা গেছে। দক্ষিণ ও উত্তরবঙ্গের অন্তত ৩৬টি জেলার বাস সাভার হয়ে চলাচল করে।
সাভার বাসস্ট্যান্ডের পাকিজা পয়েন্টে গিয়ে দেখা যায়, ষাটোর্ধ্ব সুলতান মিয়া দুই কন্যাকে নিয়ে দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট উপজেলায় গ্রামের বাড়ি যাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন।

তিনি জানান, তার দুই মেয়ে সাভারের একটি গার্মেন্ট কারখানায় কর্মরত। ভোট দিতে গ্রামে যাওয়ার উদ্দেশ্যে তিনি নিজেই তাদের নিতে এসেছেন। তবে দুই ঘণ্টার বেশি সময় অপেক্ষার পরও বাস পাওয়া যায়নি। ব্যাগেজ বেশি হওয়ায় বাস কর্তৃপক্ষ যাত্রীপ্রতি অতিরিক্ত ২০০ টাকা দাবি করছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
একই স্থানে কথা হয় তানজিল ও তার স্ত্রী কুলসুম আক্তারের সঙ্গে। তারা সাভার বাসস্ট্যান্ডসংলগ্ন একটি ডাইং কারখানায় কর্মরত এবং রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার বাসিন্দা। তানজিল বলেন, বাস সংকটের কারণে এক ঘণ্টার বেশি সময় ধরে অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
রংপুরগামী একটি বাসের চালক আয়নাল হক জানান, নির্বাচন উপলক্ষে এমন যাত্রীচাপ হবে তা আগে থেকে অনেকেই অনুমান করতে পারেননি। সাভার ট্রাফিক পুলিশের সদস্যরা যানজট নিরসনে কাজ করলেও সাভার বাসস্ট্যান্ড ও বাইপাইল ডিইউজেড এলাকায় থেমে থেমে যান চলাচল করছে।
নারায়ণগঞ্জে ট্রাক–মাইক্রোবাসে ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা
চার দিনের ছুটি পেয়ে নারায়ণগঞ্জের পোশাকশ্রমিকরাও ভোট দিতে নিজ নিজ এলাকায় ছুটছেন। মঙ্গলবার সকাল থেকেই নগরীর বিভিন্ন বাসস্ট্যান্ড ও মহাসড়কে মানুষের ভিড় লক্ষ্য করা যায়। উত্তরবঙ্গ ও দক্ষিণাঞ্চলগামী যাত্রীই বেশি, যাদের প্রায় সবাই পোশাক কারখানার শ্রমিক।
গোদনাইল এলাকায় একই কারখানায় কর্মরত সেফালি, মরিয়ম, জোবেদাসহ কয়েকটি পরিবার ছোট ট্রাকে গাদাগাদি করে জামালপুরের উদ্দেশে রওনা হয়েছেন। সেফালি বলেন, ‘আমরা সবাই গ্রামের ভোটার। অনেক বছর পর ভোট দেওয়ার সুযোগ পেয়েছি—এই সুযোগ হাতছাড়া করতে চাই না। ’
নগরীর চাষাঢ়া, তল্লা, খানপুর, পাঠানটুলি ও মণ্ডলপাড়া এলাকায় ছোট ট্রাক ও মাইক্রোবাসে করে একাধিক পরিবারকে গন্তব্যে যেতে দেখা গেছে। কেউ কেউ সন্ধ্যা বা রাতের বাসের অপেক্ষায়ও রয়েছেন।

এদিকে ঢাকা–চট্টগ্রাম ও ঢাকা–সিলেট মহাসড়কেও যাত্রীচাপ বেড়েছে। নারায়ণগঞ্জ পুলিশের তথ্যমতে, এই সুযোগে কিছু পরিবহন অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করছে।
বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম জানান, নারায়ণগঞ্জে ৮০০-এর বেশি রপ্তানিমুখী পোশাক কারখানা রয়েছে, যেখানে চার লাখেরও বেশি শ্রমিক কর্মরত। নির্বাচন উপলক্ষে মঙ্গলবার থেকে কারখানাগুলোতে ছুটি দেওয়া হয়েছে, যাতে শ্রমিকরা নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পারেন। ভোট শেষে শনিবার শ্রমিকরা কাজে যোগ দেবেন।
জেলা পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান মুন্সী বলেন, শ্রমিকদের নিরাপদ যাত্রা নিশ্চিত করতে মহাসড়কসহ গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন রয়েছে। এখন পর্যন্ত কোথাও অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি।
গাজীপুরে মহাসড়ক ও রেলপথে যাত্রীদের দীর্ঘ সারি
গাজীপুরের পোশাকশ্রমিকরাও ব্যাপকভাবে ঘরমুখো হয়েছেন। ফলে ঢাকা–টাঙ্গাইল ও ঢাকা–ময়মনসিংহ মহাসড়কে যানবাহনের চাপ সৃষ্টি হয়েছে। সোমবার রাত থেকে চন্দ্রা–সফিপুর ও বাড়ইপাড়া এলাকায় প্রায় ১০ কিলোমিটার দীর্ঘ যানজট দেখা দিলেও মঙ্গলবার পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হয়।

যানবাহন সংকট ও অতিরিক্ত ভাড়ার কারণে অনেক যাত্রী রেলপথে যাতায়াতের চেষ্টা করছেন। যাত্রীরা জানান, যেকোনো উপায়ে বাড়ি পৌঁছে ভোট দেওয়াই তাদের মূল লক্ষ্য।
ট্রাফিক পুলিশ জানায়, সরকারি কাজে বিপুলসংখ্যক যানবাহন রিকুইজিশন করায় এবং একসঙ্গে শিল্পকারখানার ছুটি হওয়ায় এই চাপ তৈরি হয়েছে। তবে মহাসড়ক সচল রাখা ও শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ তৎপর রয়েছে।


