উপমহাদেশের কিংবদন্তি শিল্পী সুরসম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দীন খাঁর ১৬৩তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে ‘ধ্রুপদী সংগীতসন্ধ্যা’ আয়োজন করেছিল বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী লালবাগ কেল্লায় আয়োজনটি শুরু হওয়ার কথা ছিল বুধবার সন্ধ্যা ৭টায়। কিন্তু বিকাল থেকেই কেল্লার গেটে জড়ো হয় কিছু জনতা।
কেল্লার ভেতরে ‘নাচ-গান’ হবে শুনে আপত্তি জানায় তারা। পরে কথা বলে তাদের ফেরত পাঠানোর পর নির্বিঘ্নে শেষ হয় পুরো অনুষ্ঠান।
শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক রেজাউদ্দিন স্টালিন অবশ্য পুরো ঘটনাকে ব্যাখ্যা করেছেন ‘ভুল বোঝাবুঝি’ হিসেবেই। বৃহস্পতিবার দুপুরে টাইমস অব বাংলাদেশকে তিনি বলেন, ‘তারা মনে করেছিল ওখানে উচ্চ শব্দে গান-বাজনা হবে, মানে ব্যান্ড সংগীত আরকি। আমরা তাদের বলেছি, ওখানে সম্মানিত অতিথিরা আসবেন ওস্তাদ আলাউদ্দীন খাঁর জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে।’
বুধবার সন্ধ্যার ঘটনা বিষয়ে তিনি বলেন, ‘তারা ভেবেছিল পাশে মসজিদ আছে, ওই সময়ে গান-বাজনা হবে। আমরা তাদেরকে নিশ্চিত করেছি, নামাজের সময় কোনো কিছু হবে না। আমরা নামাজ ও আজানের জন্য এক ঘণ্টা অনুষ্ঠান বন্ধও রেখেছিলাম। পরে তারা বুঝতে পেরে চলে গিয়েছিল।’
গণমাধ্যমকে দেওয়া বক্তব্যে একই তথ্য জানিয়েছেন পুলিশের লালবাগ বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মল্লিক আহসান উদ্দিন সামী। তিনি বলেন, ‘পুরো ঘটনাটি ছিল ভুল বোঝাবুঝি। বিষয়টি ব্যাখ্যা করে বলার পর তারা ওই স্থান ত্যাগ করেন।’

ভিডিও বার্তার মাধ্যমে বিশেষ এই অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি বলেন, ‘ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতকে বিশ্বের দরবারে পৌঁছে দিয়েছেন। এ ধরনের উদ্যোগ আমাদের সাংস্কৃতিক চেতনা আরও সমৃদ্ধ করবে।’
বুধবারের ওই আয়োজনের উদ্বোধনী পর্বে উপস্থিত ছিলেন সংস্কৃতি উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান এবং পরিবেশ বিষয়ক উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। শুভেচ্ছা বক্তব্যে ফারুকী বলেন, ‘ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ শুধু এক সংগীতগুরু নন, তিনি এক সাংস্কৃতিক দর্শন—যা প্রজন্মের পর প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করে।’
অন্যদিকে আদিলুর রহমান খান ও রিজওয়ানা হাসান তাদের বক্তব্যে ফিলিস্তিনের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেন। এ সময় দর্শক সারিতে ধ্বনিত হয় ‘ফ্রি, ফ্রি প্যালেস্টাইন’ স্লোগান। অনুষ্ঠানের বিশেষ আকর্ষণ ছিল ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর প্রপৌত্র উস্তাদ সিরাজ আলী খানের সরোদ পরিবেশনা। আয়োজনে বিশেষ সম্মাননাও দেওয়া হয় তাকে। অনুষ্ঠানে আরও পরিবেশিত হয় গুরুস্মৃতির আবেশে ভরা রাগ ভীমপলশ্রী ও রাগ কিরওয়ানির ধ্রুপদী সংগীত, এতে অংশ নেন বেঙ্গল পরম্পরা সংগীতালয়ের শিল্পীরা।

আলাউদ্দিন খাঁর জন্মবার্ষিকীতে লালবাগ কেল্লা প্রাঙ্গন পরিণত হয় সুর, আলো আর ঐতিহ্যের এক অনন্য মিলনমেলায়। মঞ্চের দুই পাশে স্থাপন করা হয় বিশাল ডিজিটাল পর্দা, যেখানে দর্শকরা উপভোগ করেন প্রামাণ্যচিত্র ও সরাসরি পরিবেশনা।
অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন অভিনেতা আফজাল হোসেন ও মারিয়া ফারিহ্ উপমা। রাত সোয়া ১১টা পর্যন্ত চলে এই সাংস্কৃতিক উৎসব, যেখানে সংগীতের সুরে প্রতিধ্বনিত হয় এক শতাব্দী পেরিয়ে আসা এক সাধকের অনন্ত উত্তরাধিকার।


