বাদল রহমান একাধারে ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা, চলচ্চিত্র নির্মাতা, চলচ্চিত্র আন্দোলনকর্মী। ১৯৪৯ সালের ৪ জুন জন্মগ্রহণকারী এ গুণি মৃত্যুবরণ করেন ২০১০ সালের ১১ জুন। তার অনবদ্য সৃষ্টি ‘এমিলের গোয়েন্দা বাহিনী’।
১৯৮০ সালের ২৯ আগস্ট মুক্তি পেয়েছিল ‘এমিলের গোয়েন্দা বাহিনী’। এ ছবির আগে বাংলাদেশে যে একদমই শিশুদের জন্য ছবি হয়নি তা নয়। তবে বলা হয়, এ ছবির হাত দিয়ে শিশুতোষ ছবির ধারা শুরু হয় বাংলাদেশে। আর এ ছবির পিছনের কারিগর বাদল রহমান।
জার্মান লেখক এরিখ কাস্টনারের বিখ্যাত উপন্যাস ‘এমিল আন্ড দি ডিটেকটিভ’ — ১৯২৯ সালে প্রকাশিত, পৃথিবীজুড়ে শিশুদের মনে জায়গা করে নেওয়া এক অ্যাডভেঞ্চার। সে উপন্যাস অবলম্বনে বাদল রহমান ছবি নির্মাণ করেন।
১৯৭৩ এ তিনি ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউট অফ ইন্ডিয়া থেকে চলচ্চিত্র সম্পাদনায় ডিপ্লোমা করেন। ১৯৭৪ সালে তিনি সৈয়দ সালাহউদ্দিন জাকি র সাথে তার প্রথম চলচ্চিত্র ‘প্রত্যাশার সূর্য’ তৈরি করেন। ‘এমিলের গোয়েন্দা বাহিনী’ পরিচালনার পর তিনি বাংলাদেশ শিশু একাডেমী অর্থায়নে কাঠাল বুড়ির বাগান এবং ছানা ও মুক্তিযুদ্ধ চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছিলেন।
ভারতে চলচ্চিত্র নিয়ে পড়াশোনার সময় তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন ‘সূর্য দীঘল বাড়ী’ নির্মাণ করবেন। সে অনুযায়ী চিত্রনাট্যও প্রস্তুত করেছিলেন। এমনকি আবু ইসহাকের কাছ থেকে কপিরাইট নেওয়াও ছিল। কিন্তু মসিহউদ্দিন শাকের ও শেখ নিয়ামত আলী ছবিটি নির্মাণের উদ্যোগ নিলে তিনি সরে আসেন। তখন শুরু করেন ‘এমিলের গোয়েন্দা বাহিনী’।
বেলায়াত হোসেন মামুনের লেখা ‘মুখোমুখি বাদল রহমান’ বইয়ে তিনি বলেছেন, সরকার যখন প্রথমবারের মত চলচ্চিত্রে অনুদান দেওয়ার ঘোষণা দিল। তখন তাকে বিখ্যাত নাট্যকার আল মনসুর একবার এয়ারপোর্টে তাকে বিদায় জানাতে গিয়ে ‘এমিলের গোয়েন্দা বাহিনী’ উপন্যাস পড়তে দিয়েছিলেন। কারণ হিসেবে বলেছিলেন, বাদল রহমান যেহেতু বাচ্চাদের অনুষ্ঠান বেশি পছন্দ করেন।

বাদল রহমান ভারতের পুনেতে বসে উপন্যাসের চিত্রনাট্য করে ফেললেন। অনুদানের জন্য জমা দিলেন, পেলেনও। কিন্তু তখনও তার মাথায় ‘সূর্য দীঘল বাড়ী’ নির্মাণের চিন্তা। লোকেশন, শিল্পী নির্বাচনও শেষ। কিন্তু মন্ত্রণালয় থেকে তাড়া আসলো ‘এমিলের গোয়েন্দা বাহিনী’-র চিত্রনাট্য জমা দেওয়ার। ৭ দিন সময়। তাড়াহুড়ো করে জমা দিলেন।
বেলায়াত হোসেন মামুনের সঙ্গে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি জানালেন, শুটিংয়ে তার খুব একটা সমস্যা হয়নি। তবে তিনি চেয়েছিলেন ছবিটি সাদাকালো বানাবেন। তবে এফডিসির তৎকালীন পরিচালক অপারেশন (টেকনিক্যাল) খালেদ সালাহউদ্দিন তাকে রঙিন শুটিং করার উৎসাহ দেন। তিনি আবার বাংলাদেশের প্রথম রঙিন ছবি ‘সঙ্গম’-এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
তখন ৩৫ মি.মি.-তে শুটিং হত। ছবির নেগেটিভ কিছু হংকংয়ে, কিছু বোম্বের ল্যাবে প্রসেস করেছিলেন। কিন্তু যখন সব কাজ শেষ হলো তখন দেখা গেল সাউন্ডট্র্যাকটি খুব বাজে এসেছে। এর কারণ হিসেবে বাদল রহমান বলেছেন, রঙিন ছবি শুটিং করার সময় কতগুলো নিয়ম মানতে হয়, তা করার মত ব্যবস্থা আমাদের দেশে ছিল না। আমাদের মেশিন ছিল সাদাকালোর। সেখানে একটা সিলভার টোন দিতে হয় কালারের। সেটা দেওয়ার কোন ব্যবস্থায় ছিল না আমাদের। ফলে সাউন্ডট্র্যাকে ঘ্যার ঘ্যার শব্দ এসেছে। সবকিছু মিলিয়ে, তিনি আর ছবিটি কোনো আন্তর্জাতিক উৎসবে পাঠাননি।
‘এমিল আন্ড দি ডিটেকটিভ’ অবলম্বনে বাদল রহমান যখন সিনেমা বানান তখন সেটি ছিল সারা দুনিয়ায় উপন্যাসটি অবলম্বনে তৃতীয় ছবি। বাংলা ভাষায় ছাড়াও এটি জার্মান, বৃটিশ ও সুইডিশ ভাষায় নির্মিত হয়েছিল।


