মানিকগঞ্জে বাউলশিল্পী আবুল সরকারের গ্রেপ্তার ও তার ভক্ত-অনুরাগীদের ওপর হামলার ঘটনায় তীব্র প্রতিবাদ ও নিন্দা জানিয়েছেন দেশের ৬২ নাগরিক।
গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে তারা বলেন, ‘খবরে দেখেছি, তারা শান্তিপূর্ণ মানববন্ধনে দাঁড়াতে গিয়েছিল, তাদের ওপর একদল গণপিটুনি ও নৃশংস হামলা চালিয়েছে, রক্তাক্ত করেছে। স্থানীয় পুলিশ হামলাকারীদের হাত থেকে ভক্ত-অনুরাগীদের রক্ষা করতেও ব্যর্থ হয়েছে।’
এই হামলাকে সবার নাগরিক নিরাপত্তার ওপর হামলা অ্যাখ্যা দিয়ে তারা বলেছেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকার দাযিত্ব নেওয়ার পরে “ধর্ম অবমাননার” অভিযোগ তুলে অনেকক্ষেত্রেই আইন নিজের হাতে আইন তুলে নিচ্ছে ‘তৌহিদী জনতা’ নামে একদল গোষ্ঠী। তারই ধারাবাহিকতায় এই হামলা কেবল কিছু বাউল ও তাদের সমর্থকদের ওপর আক্রমণ নয়, এটি আমাদের সবার নাগরিক নিরাপত্তার ওপর আঘাত।’
এই হামলাকে ‘মব’ বলে দায় এড়ানোর সুযোগ নেই উল্লেখ করে বিবৃতিতে তারা আরও বলেছেন, ‘মানিকগঞ্জের হামলাকারীদের অনেকের ছবি, নাম ও রাজনৈতিক পরিচয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। ফলে হামলাকারীদের অচেনা “মব” বলে দায় এড়ানোর কোনো সুযোগ নেই। এই চিহ্নিত গোষ্ঠীকে ছেড়ে দিলে সরকার ব্যর্থতার পরিচয় দেবে।’
বিবৃতিদাতাদের মতে, ‘ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার এসেছে এমন এক সময়ে, যখন বহু বছর ধরে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বারবার আঘাতের মুখে পড়েছে। সরকার গঠনের সময় বলা হয়েছিল, নাগরিকের বাকস্বাধীনতা রক্ষা করা হবে, নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। কিন্তু বাউলদের ওপর হামলা, তাদের বিরুদ্ধে উসকানিমূলক মিছিল, কোর্টে তাদের জবাই করতে চাওয়া, আর আটক থাকা আবুল সরকারের মুক্তি না পাওয়া—এসব দেখে বোঝা যায়, সরকার সেই প্রতিশ্রুতি ও বিবৃতির ধারাবাহিকভাবে ব্যর্থ হয়েছে।’
লিখিত বিবৃতিতে ৫ দফা দাবিও তুলে ধরেছেন তারা। সেসব হলো:
১.মানিকগঞ্জসহ সারা দেশে বাউলশিল্পী ও তাদের আয়োজনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। ২. মানিকগঞ্জে হামলার ঘটনায় নিরপেক্ষ তদন্ত করে দায়ীদের বিচারের মুখোমুখি করতে হবে। সেখানে পুলিশের দায়িত্বে থাকা এসআইকেও তদন্তের আওতায় আনতে হবে। ৩. ধর্মীয় অনুভূতির নামে উসকানি ও হামলা চালানো যে কোনো বেআইনি সংগঠনের বিরুদ্ধে সমান ও ন্যায়সঙ্গত পদক্ষেপ নিতে হবে। ৪. ‘ধর্ম অবমাননার’ অভিযোগে আটক বাউলশিল্পী আবুল সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ যথাযথভাবে তদন্ত করতে হবে। বিদ্যমান আইন অনুযায়ী তদন্ত করে তাকে মুক্তি দিতে হবে এবং এমন মামলার অপব্যবহার বন্ধ করতে হবে। ৫. অন্তর্বর্তী সরকারকে জানাতে হবে, এই দেশের বাউল, শিল্পী, লেখক, একাডেমিক, সাংবাদিকসহ সব নাগরিকের কথা বলার, গান গাওয়ার ও শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার তারা রক্ষা করবে, এবং তার প্রমাণ হিসেবে বাস্তব পদক্ষেপ দেখাতে হবে।
বিবৃতিতে স্বাক্ষরকারীরা হলেন, অর্থনীতিবিদ জিয়া হাসান, দ্য বাংলাদেশ ডায়ালগের নির্বাহী পরিচালক রুবায়াত মান্নান রাফি, শিক্ষক ও নাট্যকর্মী সামিনা লুৎফা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আসিফ মোহাম্মদ শাহান, স্থপতি মারজিয়া মিথিলা, শিক্ষক–গবেষক ও অধিকারকর্মী আহমেদ আবিদ, অ্যাক্টিভিস্ট এমডি রাশেদ, লেখক সুবাইল বিন আলম, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী সারা হোসেন, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক সাদিক মাহবুব ইসলাম, শিক্ষক ও লেখক ফাহমিদুল হক, অর্থনীতিবিদ ইসলামুল হক, গবেষক মীর হুজাইফা আল মামদূহ, গণমাধ্যমকর্মী ও উন্নয়নকর্মী তাজওয়ার মাহমিদ।
জর্জিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির ডক্টরাল ফেলো আসিফ বিন আলী, ব্রেইনের নির্বাহী সদস্য আসিফ ইকবাল, ডিয়াস্পোরা অ্যালায়েন্স ফর ডেমোক্রেসির শামারুহ মির্জা, অর্থনৈতিক গবেষক ও আন্দোলনকর্মী হুমায়ুন কবীর, সাংবাদিক ও সংস্কৃতি কর্মী মৌমিতা জান্নাত, লেখক ও আন্দোলনকর্মী অনুপম শায়কত শান্ত, কৌশিক আহমেদ, সাংবাদিক ও আন্দোলনকর্মী রঞ্জন কুমার দে, লেখক ও সংগঠক নাহিদ হাসান, সাংবাদিকতার শিক্ষক আল রাজী, শিক্ষক মানস চৌধুরী, উন্নয়নকর্মী কামরুজ্জামান রিপন, লেখক, কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও শিক্ষক এমডি আদনান আরিফ সালিম, লেখক ও সাংবাদিক হাসনাত শোয়েব।
গবেষক ও শিল্পী জাকারিয়া সুরেশ্বরী, শিল্পী শহীদুল ইসলাম শিশির,গবেষক ও নাট্যকর্মী আশিক ইসতিয়াক, অস্ট্রেলিয়ার সিডলি পলিসি অ্যান্ড অ্যানালাসিস সেন্টারের গবেষক ও লেখক ড. মোবাশ্বার হাসান, উপন্যাসিক ও লেখক আশিফ এন্তাজ রবি, স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতা সাজিব তানভীর, নৃবিজ্ঞান গবেষক পুন্নি কবীর, টাইমস অব বাংলাদেশের সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার তাকী মোহাম্মদ জুবায়ের, আন্দোলনকর্মী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মুরশীদ সেলিন, কবি ও অধিকারকর্মী ফেরদৌস আরা রুমী, ভিজ্যুয়াল আর্টিস্ট ইশরাত জাহান প্রীতিলতা।
লেখক ও সাংবাদিক সাবিদিন ইব্রাহিম, কবি ও সাংবাদিক রহমান মুফিজ, গবেষক রাইসুল ইসলাম আকাশ, পলিসি রিসার্চ অ্যানালিস্ট হাসনাত কালাম সুহান, শিক্ষক, গবেষক ও অনুবাদক টিনা নন্দী, নৃবিজ্ঞানী ও চলচ্চিত্র নির্মাতা রাফসান আহমেদ, আইনজীবী মাসুদ রানা, লেখক ও অ্যাক্টিভিস্ট রাহাত মুস্তাফিজ, সত্যনিউজের নির্বাহী সম্পাদক (অনারারি) এবং ইনডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটির গ্লোবাল স্টাডিজ অ্যান্ড গভর্নেন্সের সিনিয়র লেকচারার মো. ওহিদুজ্জামান।
গণিতবিদ ও অ্যাক্টিভিস্ট নাফিসা রায়হানা, অস্ট্রেলিয়ার সিডনির সরকারি আমলা ও রাজনৈতিক কর্মী সৈয়দ সামনান, স্থপতি ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক আমিনুল ইসলাম ইমন, সাংবাদিক ও খণ্ডকালীন শিক্ষক আলমগীর স্বপন, প্রবাসী চিকিৎসক ও গবেষক শাহেদ ইকবাল, শিল্পী ফারজানা ওয়াহিদ, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক ও রাজনীতিক ফিরোজ আহমেদ, সাংবাদিক ও ফ্যাক্ট-চেকার কদরুদ্দিন শিশির, সেন্ট্রাল ফ্লোরিডা বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাপক সাইফুল খন্দকার, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের অ্যাডভোকেট ব্যারিস্টার সালাহউদ্দিন ভূঁইয়া, অর্থনীতিবিদ গালিব ইবনে আনোয়ারুল আজিম, সাংবাদিক মুক্তাদির রশীদ, পিএইচডি গবেষক এমডি ইমরান হোসেন ভূঁইয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া বিষয়ক গবেষক আলতাফ পারভেজ।


