মঙ্গল গ্রহের রুক্ষ লালচে ভূপৃষ্ঠজুড়ে একদিন ছুটে বেড়াবে বাংলাদেশি গবেষকদের তৈরি রোবট–এমন সাহসী স্বপ্নই দেখছেন তরুণ গবেষকরা। উদ্ভাবনী শক্তি দিয়ে প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার গণ্ডি ভেঙে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিচ্ছেন তারা।
সাগরের গভীর তলদেশ থেকে পাহাড়ের দুর্গম চূড়া, তথ্য সংগ্রহের কাজ থেকে শুরু করে দুর্যোগকালীন উদ্ধার কার্য পরিচালনা–এমনকি গ্রহ-গ্রহান্তরে প্রাণের অস্তিত্ব অনুসন্ধানের মতো জটিল গবেষণার উপযোগী অত্যাধুনিক প্রযুক্তির উদ্ভাবনে কাজ করছেন একদল বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্বয়ংক্রিয় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ও রোবোটিক প্রযুক্তির সমন্বয়ে তারা তৈরি করছেন ভবিষ্যতের গবেষণা সহায়ক স্মার্ট ‘রোভার’।
বুদ্ধিমত্তা সম্পন্ন ‘রোবট’ তৈরির প্রতিযোগিতায় বিগত চার বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে বিশ্বের মধ্যে অন্যতম শীর্ষ স্থান ধরে রেখেছেন ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি (ইউআইইউ)-এর তরুণ-তরুণীরা। এই মাসেই পঞ্চম বারের মতো বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করতে আবারও যুক্তরাষ্ট্রে যাচ্ছেন তারা।

পরবর্তী প্রজন্মের রোবট তৈরির মাধ্যমে মঙ্গল গ্রহে গবেষণা পরিচালনার লক্ষ্যে সারা বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের নিয়ে ইউনিভার্সিটি রোভার চ্যালেঞ্জ (ইউআরসি) প্রতিযোগিতার আয়োজন করে মার্স সোসাইটি নামক যুক্তরাষ্ট্রের একটি সংস্থা, যার সঙ্গে দেশটির জাতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।
এই প্রতিযোগিতায় ইউআইইউ-এর তরুণ গবেষকদের হাত ধরে ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত টানা চারবার এশিয়ার মধ্যে শীর্ষ স্থান ধরে রেখেছে বাংলাদেশ। এমনকি গতবার সারা বিশ্বের মধ্যে ষষ্ঠ স্থান অর্জন করেছে ইউআইইউ।
এবার আরও ভালো কিছু করার স্বপ্ন দেখছেন গবেষক দলের অন্যতম সদস্য মো. আবিদ হোসেন। তিনি টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘গত চার বছরের ধারাবাহিক কাজের ফসল এবারের উন্নত সংস্করণের রোভারটি। সর্বশেষ একবছর ধরে ৬৮ জন গবেষক মিলে এই রোভারটি তৈরি করেছে। এর নাম দেওয়া হয়েছে ‘ওরিয়ন’।
এই রোভারটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে নিজে নিজে চলাফেরা করার পাশাপাশি পারিপার্শ্বিক পরিবেশ সম্পর্কে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ এবং বিশ্লেষণ করতে পারে বলেও জানান আবিদ হোসেন।
মঙ্গল গ্রহে প্রাণের সন্ধান করার ক্ষেত্রে মানুষকে সহায়তা করার উপযোগী করে এবারের রোভারটি তৈরি করা হয়েছে বলেও জানান তিনি। ‘স্বাধীনভাবে চিন্তা করার মাধ্যমে এই রোভার মঙ্গলের রুক্ষ লালচে মাটিতে প্রাণের অনুসন্ধান করতে পারবে,’ যোগ করেন আবিদ।

সোমবার ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির গবেষণাগার ঘুরে নিমগ্ন চিত্তে কাজ করতে দেখা যায় একদল তরুণ-তরুণীকে। তাদেরই একজন ত্রিপল-ই বিভাগের শিক্ষার্থী মুশফিকুর রহমান। তাদের তৈরি মার্স রোভার ‘ওরিয়ন’ কীভাবে কাজ করে তার কিছু নমুনা দেখান তিনি। এমনকি ‘ওরিয়ন’ এর সঙ্গে থাকা ক্যামেরার মাধ্যমে দূর থেকে কীভাবে এর গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা যায়- সেটারও কিছু ‘ডেমো’ দেখান তিনি।
মুশফিকুর রহমান জানান, শুধু রোভারের দৃশ্যমান অংশটি তৈরি করতেই ৩০ হাজার ডলারের মতো খরচ হয়েছে। পুরো প্রতিযোগিতা শেষ করতে বাংলাদেশি মুদ্রায় দেড় কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে।
মার্স রোভার তৈরির উদ্ভাবনী প্রতিযোগিতায় ভবিষ্যতে বিশ্বের মধ্যে শীর্ষস্থান অর্জনের স্বপ্ন দেখেন এই গবেষকরা। সেই লক্ষ্য অর্জিত হলে হয়তো তাদের পরিকল্পনা ও উদ্ভাবনী প্রযুক্তির সাহায্যেই একদিন মঙ্গল গ্রহে প্রাণের অনুসন্ধান চালাবে কোনো মহাকাশ গবেষণা সংস্থা।
তখন এই গবেষকদের মধ্যে অনেকে হয়ত কাজেরও সুযোগ পাবেন সেখানে। লক্ষ্যে অবিচল তরুণ-তরুণীদের হাত ধরেই হয়তো অনন্ত নক্ষত্রলোকে অচিরেই উড়বে বাংলাদেশের গর্বিত লাল সবুজের পতাকা।

শিক্ষার্থীদের এই সাফল্যের পেছনে তাদের আত্মনিবেদন ও কঠোর শৃঙ্খলার কথা উল্লেখ করেছেন ইউআইইউ উপাচার্য মো. আবুল কাশেম মিয়া।
তিনি টাইমসকে বলেন, প্রথম সেমিস্টার থেকেই আগ্রহী শিক্ষার্থীদের উদ্ভাবনী গবেষণায় যুক্ত হওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। এরপর নিয়মিত প্রশিক্ষণ, দিক নির্দেশনা এবং আর্থিক সংস্থানের ব্যবস্থা করা হয়।’
উপাচার্য আরও জানান, ‘মার্স রোভার’ ছাড়াও গভীর জলাশয়ের তলদেশে গিয়ে গবেষণা পরিচালনার উপযোগী নতুন প্রজন্মের রোভার তৈরি, যে কোনো দুর্যোগে উদ্ধারকার্য চালাতে মানুষকে সহায়তা করার জন্য বৃদ্ধিমত্তাসম্পন্ন ‘রেসকিউ রোভার’, সার্ভে পরিচালনা বা বিস্তর এলাকা পর্যবেক্ষণ করার জন্য ‘অটোনমাস ড্রাইভিং এবং কন্ট্রোল সিস্টেম সম্পন্ন’ অত্যাধুনিক ড্রোন নিয়েও গবেষণা করছেন ইউআইইউ গবেষকরা।
নিজেদের প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি বিভিন্ন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের নিয়েও ইউআইইউ বিজ্ঞানভিত্তিক কর্মশালা আয়োজন করছে বলেও জানান তিনি। তার মতে, নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের সামর্থ্য অফুরান। তারা দেশ ও জাতিকে অনেক কিছু দিতে পারে-শুধু ঠিকমতো দেখভাল করা প্রয়োজন।


