‘বাংলাদেশের নাগরিক’ দাবি করে ভারতীয়দের সঙ্গেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সরকার ‘পুশ ইন’ করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এমনকি মুসলিম পরিচয় ও বাংলাভাষী হওয়ায় ‘অমানবিকভাবে’ অন্তঃসত্ত্বা নারী ও শিশুসহ ভারতীয় নাগরিকদের সীমান্ত পথে এপারে ‘পুশ ইন’ করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সম্প্রতি চার মাসের অন্তঃসত্ত্বা ভারতীয় নাগরিক সোনালী খাতুনসহ আরও পাঁচজনকে জোর করে বাংলাদেশে পাঠায় ভারত। পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলার ধীতর গ্রামের বাসিন্দা সোনালী খাতুন দীর্ঘদিন ধরে দিল্লিতে স্বামীর সঙ্গে ইটভাটায় কাজ করছিলেন। তাদের আধার কার্ড, রেশন কার্ড, জমির কাগজসহ সব বৈধ নাগরিকত্বের নথি থাকা সত্ত্বেও ভারতীয় পুলিশ গত ২০ জুন তাদের ‘অবৈধ বাংলাদেশি’ দাবি করে আটক করে। এরপর কোনো যাচাই-বাছাই ছাড়াই সোনালী ও তার স্বামীকে হরিয়ানা থেকে আসাম এবং পরে সেখান থেকে কুড়িগ্রাম সীমান্তে নিয়ে ভারতের সীমান্ত রক্ষী বাহিনী বর্ডার সিকিউরি ফোর্স (বিএসএফ) সদস্যরা এদেশে ‘পুশ ইন’ করে।
অন্তঃসত্ত্বা সোনালী গর্ভের শিশুকে নিয়েই বন-জঙ্গল পেরিয়ে নদী সাঁতরে বাংলাদেশে প্রবেশ করেন। চিকিৎসা, পুষ্টি ও বিশ্রাম না পেয়ে তার শারীরিক অবস্থা দ্রুত খারাপ হলে ওই দম্পতি চাঁপাইনবাবগঞ্জে একটি গ্রামে বাসা ভাড়া নিতে বাধ্য হন। পড়ে সেখানে তাদের ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’ হিসেবে আটক করে চাঁপাইনবাবগঞ্জ পুলিশ।
তবে সোনালীর ছোট মেয়ে আফরিন ভারতে তার দাদীর কাছে রয়ে গেছে। এ বিষয়ে সোনালীর পরিবার ইতোমধ্যেই কলকাতা আদালতে মামলা করেছে এবং সেই অভিযোগপত্রের কপি বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের কাছেও পাঠানো হয়েছে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের পুলিশ সুপার রেজাউল করিম জানান, বর্ডার গার্ড অব বাংলাদেশ (বিজিবি)-এর মাধ্যমে সোনালী ও তার পরিবারকে ভারতে ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। বিএসএফের সঙ্গে এ নিয়ে পতাকা বৈঠকও হয়েছে। এ প্রক্রিয়া ব্যর্থ হলে চাঁপাইনবাবগঞ্জ কারাগারে বন্দি সোনালীর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সোনালীর মতো আরও শতাধিক পরিবারকে বাংলাদেশে ঠেলে দিয়েছে বিএসএফ। গত ১৪ জুন সাত বছর বয়সী শিশু ফাতেমা খাতুন ও তার পরিবারকে পঞ্চগড় সদর সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানো হয়। ফাতেমার বাবা আজিজুল আলী মণ্ডল (৩১), মা আজমিরা খাতুন (২৫) ও ভাই ইয়ানুর আলী মণ্ডল (৪) রাজনীবাজার সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করলে তারা বিজিবি’র হাতে ধরা পড়েন। এরপর থেকেই তারা বিজিবি’র হেফাজতে আছেন।
একইভাবে ৭২ বছর বয়সী বৃদ্ধা মিসমা খাতুনকেও জোরপূর্বক বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন তার ছেলে আবদুল সোবহান। তিনি জানান, জমি নিয়ে বিরোধের জেরে মিথ্যা অভিযোগে তাদের ‘বাংলাদেশি’ বলে ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে। তবে তাদের ভারতীয় নাগরিকত্বের সবধরনের নথিসহ ভোটার তালিকায় নাম রয়েছে। পতাকা বৈঠকে কয়েকজন ভারতীয়কে ফেরত নিলেও মিসমা খাতুনের কোনো খোঁজ পাননি বলে জানান আবদুল সোবহান।

এমন শত শত ভারতীয় পরিচয়ধারী (আধার ও ভোটার কার্ডে নিশ্চিত) ব্যক্তিদের কোনো আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই বাংলাদেশে ‘পুশ ইনের’ ঘটনা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোরও শিরোনাম হয়েছে। দিল্লি সরকারের এমন ‘অমানবিক আচরণের’ কঠোর নিন্দা জানিয়েছে মানবাধিকার সংস্থাগুলো।
যুক্তরাষ্ট্রের হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) সম্প্রতি এক প্রতিবেদনে দাবি করেছে, শত শত বাংলাভাষী মুসলিমকে ভারত জোরপূর্বক বাংলাদেশে পাঠিয়েছে। এতে আরও বলা হয়, ভারতীয় নাগরিকদের ‘পুশ ইন’ করা দেশটির অভ্যন্তরীণ আইন ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল বলেন, ‘গর্ভবতী নারী, শিশু, বৃদ্ধ কিংবা অসুস্থদের অবৈধ ও ঝুঁকিপূর্ণ পথে সীমান্তে ঠেলে দেওয়া শুধু অমানবিকই নয়, বেআইনিও বটে।’
বিজিবির তথ্য অনুযায়ী, গত ৭ মে থেকে ১৫ জুন পর্যন্ত নারী, শিশুসহ মোট এক হাজার ৮৮৭ জনকে বাংলাদেশ সীমান্তে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। তাদের মধ্যে শতাধিক রোহিঙ্গা শরণার্থীও রয়েছেন। এ নিয়ে এ বছর ভারত থেকে বাংলাদেশে ‘পুশ ইনের’ সংখ্যা দুই হাজার ছাড়িয়েছে।
বিজিবি জানায়, এসব ঘটনায় বিএসএফের কাছে একাধিকবার আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ জানানোর পাশাপাশি তারা সীমান্তে টহল ও গোয়েন্দা নজরদারি বাড়িয়েছে।


