ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আমেজ কাটতে না কাটতেই কক্সবাজারের পরিবেশগতভাবে সংকটাপন্ন বাঁকখালী নদীর তীর আবারও দখলের কবলে পড়েছে। শহরের কস্তুরাঘাট এলাকায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে উচ্ছেদ করা জমিতে রাতারাতি অর্ধশতাধিক ঘর তুলে নতুন করে দখল প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সুযোগ নিয়ে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যের নাম ও দলীয় ব্যানার ব্যবহার করে এই অপতৎপরতা চালানো হচ্ছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ ও আইনগত ব্যবস্থা নিতে ১৫টি সরকারি দপ্তরে জরুরি চিঠি পাঠিয়েছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ অনুযায়ী, গত ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের ভোটগ্রহণের রাত থেকেই দখলদাররা সক্রিয় হয়ে ওঠে। গত চার দিনে কস্তুরাঘাট ও নতুন খুরুশকুল সেতুর পশ্চিম পাশে বাঁশ, টিন ও ত্রিপল ব্যবহার করে অন্তত ৫০টি অস্থায়ী ঘর নির্মাণ করা হয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, কক্সবাজার-১ (সদর-রামু-ঈদগাঁও) আসনের বিএনপি দলীয় নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য লুৎফুর রহমান কাজলের ব্যানার টাঙিয়ে এই দখলবাজি চলছে। মূলত আগের উচ্ছেদ হওয়া দখলদাররাই এখন বিএনপির নাম ভাঙিয়ে নদী তীরের সরকারি জমি পুনরায় নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা করছে।
বিআইডব্লিউটিএ সূত্রে জানা গেছে, গত বছর ১ থেকে ৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত জেলা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তায় বড় ধরনের অভিযান চালিয়ে বাঁকখালী নদীর তীরভূমির ৬৩ একর জায়গা উদ্ধার করা হয়েছিল। সে সময় ৪৯৬টি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়। এরপর সীমানা নির্ধারণের সময় সরকারি কাজে বাধা দেওয়ায় বিআইডব্লিউটিএ ও পুলিশের পক্ষ থেকে চারটি মামলায় ৪০ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা ১৬০০ জনকে আসামি করা হয়। এখন সেই একই জমিতে পুনরায় দখলের মহোৎসব শুরু হওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে কর্তৃপক্ষ।
কক্সবাজার (কস্তুরাঘাট) নদী বন্দরের পোর্ট অফিসার মো. আব্দুল ওয়াকিল জানান, আগে যাদের উচ্ছেদ করা হয়েছিল, তারাই নতুন করে এই দখল প্রক্রিয়ায় জড়িত। গত শনিবার এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানিয়ে জেলা প্রশাসন, পুলিশ সুপার ও নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়সহ ১৫টি গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে চিঠি পাঠানো হয়েছে।
চিঠিতে বলা হয়, নির্বাচনের আগের রাত থেকে কস্তুরাঘাট থেকে খুরুশকুল সেতু পর্যন্ত এলাকায় অবৈধ নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে, যা দ্রুত বন্ধ করা জরুরি।
এদিকে বিএনপির নাম ব্যবহার করে নদী দখলের খবর ছড়িয়ে পড়লে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা কস্তুরাঘাট এলাকায় অভিযানে নামেন। কক্সবাজার শহর ছাত্রদলের সাবেক যুগ্ম সম্পাদক শাফায়াত মুন্না সাংবাদিকদের বলেন, নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য লুৎফুর রহমান কাজলের নির্দেশে তারা ঘটনাস্থলে গিয়ে বেশ কিছু অবৈধ দোকানের কাঠামো ভেঙে দিয়েছেন।
তিনি দাবি করেন, দখলদাররা নিজেদের রক্ষার কৌশল হিসেবে বিএনপির ব্যানার ও ফেস্টুন ব্যবহার করছে, যার সঙ্গে দলের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। ছাত্রদলের এই তৎপরতার পর দখলদাররা বর্তমানে এলাকা ছেড়ে আত্মগোপনে রয়েছেন।
নদী দখলের বিষয়ে কড়া হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য লুৎফুর রহমান কাজল। তিনি গণমাধ্যমকে জানান, নদী দখলের মতো অনৈতিক কাজের সঙ্গে বিএনপির কোনো সম্পর্ক নেই। যারা দলের নাম ভাঙিয়ে নদীর তীর দখল করছে, তাদের অবিলম্বে পুলিশে ধরিয়ে দেওয়ার জন্য তিনি স্থানীয় প্রশাসন ও জনগণের প্রতি আহ্বান জানান।
উল্লেখ্য, বিআইডব্লিউটিএর চিঠি নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব, জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যানের একান্ত সচিব, চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার, কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারসহ সংশ্লিষ্ট ১৫টি দপ্তরের শীর্ষ কর্মকর্তাদের কাছে পাঠানো হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে উদ্ধার হওয়া বিশাল এই সরকারি জমি পুনরায় সম্পূর্ণ বেদখল হওয়ার আশঙ্কা করছেন পরিবেশবাদীরা।


