‘ফ্যাসিস্ট’ ট্যাগ দিয়ে মারধরের লাইসেন্স পেয়েছে জামায়াত?

‘ফ্যাসিস্ট’ ট্যাগ দিয়ে মারধরের লাইসেন্স পেয়েছে জামায়াত?
মঙ্গলবার সকালে দায়িত্ব পালনের সময় জামায়াত কর্মীদের হামলার শিকার হন দৈনিক সকালের মাল্টিমিডিয়া রিপোর্টার মাহফুজুর রহমান শিশির। তাকে বাঁচাতে গিয়ে আরও কয়েকজন সাংবাদিক মারধরের মুখে পড়েন। ছবি: সংগৃহীত
Advertisement
Advertisement

রাজধানীর ধানমন্ডিতে আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীদের হাতে সাংবাদিক মারধরের ঘটনায় রাজনৈতিক অঙ্গন, সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে।

সংবাদকর্মীদের ‘ফ্যাসিবাদের দোসর’ আখ্যা দিয়ে মারধরের ঘটনায় জামায়াত নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে বিভিন্ন সংগঠন।

এসব সংগঠনের নেতারা বলছেন, জামায়াত কর্মীরা আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে অপরাধ করেছেন। এর বিচার না হলে স্বাধীন সাংবাদিকতা চরম হুমকির মুখে পড়বে। একই সঙ্গে অনেকে বলছেন, অতীতে আওয়ামী লীগের আমলে যেভাবে নানা ‘ট্যাগ’ দিয়ে মানুষকে হয়রানি করা হতো, জামায়াতও এখন সেই একই পথ অবলম্বন করছে।

মঙ্গলবার সকালে দৈনিক সকালের মাল্টিমিডিয়া রিপোর্টার মাহফুজুর রহমান শিশির জামায়াত কর্মীদের হামলার শিকার হন। তাকে বাঁচাতে গিয়ে আরও বেশ কয়েকজন সাংবাদিক মারধরের মুখে পড়েন।

‘ফ্যাসিস্ট’ ট্যাগ কি কাউকে মারার লাইসেন্স?

কোনো রাজনৈতিক পরিচয়ের অজুহাতে বা ‘ফ্যাসিস্ট’, ‘দোসর’ কিংবা ‘স্বৈরাচারের সহযোগী’ তকমা দিয়ে সাংবাদিক বা সাধারণ মানুষকে মারধর করা একটি গুরুতর আইনি অপরাধ।

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মামুন আল মোস্তফা বলেন, ‘আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকেও তার প্রতিপক্ষরা ফ্যাসিস্ট বলেছেন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রাজনীতিতে প্রতিপক্ষকে ফ্যাসিস্ট আখ্যা দেওয়ার চল রয়েছে। আমাদের দেশে আওয়ামী লীগের পতনের পর শব্দটির প্রচলন বেশি হয়েছে।’

অধ্যাপক মামুন আল মোস্তফা আরও বলেন, ‘প্রশ্ন হচ্ছে, এই ট্যাগ দিয়ে শুধু সাংবাদিক নয়, সাধারণ কোনো মানুষকে মারার সুযোগ আছে কি না? কোনো মানুষ যে আওয়ামী লীগ করে, তা কি মুখ দেখেই নির্ধারণ করা সম্ভব? বিষয়টিতে আইন কতটুকু সমর্থন করে, তা জানতে হবে।’

আরও পড়ুন

জামায়াতও কি আওয়ামী লীগের মতো একই পথে হাঁটছে–এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘জামায়াতের আগে এতো ক্ষমতা ছিল না। এখন তাদের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক এমপি রয়েছে। তারা অনেকটাই এখন ক্ষমতার অংশ, তাই এখন সেভাবেই তাদের আচরণ দেখতে হবে।’

জামায়াতের ‘দুঃখ’ প্রকাশ

এদিকে এ ঘটনায় তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে ঢাকা মহানগর (দক্ষিণ) জামায়াতে ইসলামী। বুধবারের মধ্যে কমিটিকে তদন্ত প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে আহত সাংবাদিকের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেছে দলটি।

জামায়াতের কেন্দ্রীয় ও মহানগর নেতারা এটিকে ‘অনাকাঙ্ক্ষিত’ বলে উল্লেখ করেছেন। দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, ‘এ বিষয়ে তদন্ত কমিটি গঠিত হয়েছে। আসলে কারা হামলা করেছে, তারা দলে অনুপ্রবেশকারী কি না, সব যাচাই-বাছাই করে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

জামায়াতে ইসলামীর আরেক সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং দলটির প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, ‘অনাকাঙ্ক্ষিত এ ঘটনায় আমরা দুঃখ প্রকাশ করেছি। একইসঙ্গে আমরা তদন্ত করে দেখছি কারা কারা জড়িত। প্রমাণ সাপেক্ষে জড়িতদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সহকারী সেক্রেটারি দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ঘটনায় জামায়াতের কেউ জড়িত কি না, তা যেমন দেখা হবে, তেমনিভাবে জনসমাগমের সুযোগ নিয়ে কেউ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে এসেছে কি না, তাও দেখা হবে।’

২০২৪ সালে আওয়ামী লীগের পতনের পর থেকে বিশেষ করে অন্তর্বর্তী সরকারের পুরো সময়ে জামায়াত-শিবির নেতাকর্মীরা নানান ট্যাগ দিয়ে ‘মবোক্রেসি’ বা মব জাস্টিস ঘটিয়ে ব্যাপক আলোচনায় আসে। নতুন সরকার গঠনের পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার প্রত্যাশা থাকলেও বাস্তবে তার উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে।

বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিবাদ

সাংবাদিকদের ওপর এই হামলার ঘটনায় বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে। মঙ্গলবার বিকেলে মাল্টিমিডিয়া রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন শাহবাগে মানববন্ধন করে জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছে।

ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়ে ইসলামী আন্দোলনের কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক শেখ ফজলুল করীম মারুফ বলেন, ‘সাংবাদিকদের পেটানো জামায়াতের স্বৈরাতান্ত্রিক মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ।’ তিনি এই হামলায় জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি শাস্তির দাবি জানান।

জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলও এক বিবৃতিতে এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে। সংগঠনটির সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব ও সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দিন নাছির এই ঘটনার কঠোর প্রতিবাদ জানিয়ে বলেন, এটি স্বাধীন সাংবাদিকতার নীতিমালার সম্পূর্ণ পরিপন্থী।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad