জুলাই-আগস্ট আন্দোলনে নিহতদের স্বজনদের দাবি প্রিয়জনের কবর যেন তাদের বুঝিয়ে দেওয়া হয়। স্বজনদের দাবি, কোনো দিন ছুঁতে না পারার আক্ষেপ তারা কমাতে চান তাদের কবর স্পর্শ করে। এমন হৃদয়বিদারক অনুরোধে ভার হয়ে ওঠে রায়েরবাজার বদ্ধভূমির বাতাস।
‘আমার সাদা পাঞ্জাবি পরে আব্বু ১৯ জুলাই সকালে শেষবারের মতো বাসা থেকে বের হয়। এরপর সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টায় আব্বুর সঙ্গে আমার ফোনে শেষবারের মতো কথা হয়। আর কোনো দিন আব্বুর গলার স্বর শুনতে পাব না। অশ্রুভেজা হয়ে বলছিলেন জুলাই আন্দোলনে নিহত রফিকুল ইসলামের ছেলে রাইয়ান ইসলাম।
রাইয়ান টাইমস অব বাংলাদেশকে জানান, গতবছরের ১০ আগস্ট ঢাকা মেডিকেলের কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের মর্গে গিয়ে জানতে পারি অনেক বেওয়ারিশ মরদেহ আঞ্জুমানে মফিদুল ইসলাম দাফন করেছে। আমি তাদের অফিসে গিয়ে আব্বুর ছবি দেখে শনাক্ত করি। তখন তারা আমাকে জানায়, আব্বুকে রায়েরবাজারে দাফন করা হয়েছে।
মরদেহ শনাক্তকরণ প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি টাইমসকে বলেন, ‘যখন প্রথমবার রায়ের বাজারে আসি, তখন কবরগুলোকে ক্রিকেট পিচের মতো সমান করে ফেলেছিল। মরদেহ শনাক্ত হলে বলতে পারব আমার আব্বু এখানে ঘুমিয়ে আছে, সপ্তাহে একটা দিন আব্বুর কাছে এসে বসতে পারব।’
১৯ জুলাই বাড্ডায় ফার্নিচারের দোকান কর্মচারী পারভেজ ব্যাপারী (২৩) নিহত হন। অথচ ছেলের কবর ঠিক কোনটা তা ১৬ মাস পার হলেও জানেন না পারভেজের বাবা সবুজ ব্যাপারী।
তিনি টাইমসকে জানান, শুনেছি, আমার ছেলেকে রায়েরবাজারে দাফন করা হয়েছে। কিন্তু কোনটা আমার ছেলের কবর, তা জানি না। আমি প্রতি শুক্রবার এসে ছেলের কবর জিয়ারত করি। কিন্তু জানি না আমার ছেলে কোথায় ঘুমিয়ে আছে। কতক্ষণ তাকিয়ে বাড়ি চলে যাই।
মরদেহ শনাক্ত করার ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলে সবুজ ব্যাপারী বলেন, ‘ছেলেটাকে তো আর ফিরে পাব না। তার কবরটা যদি একটু স্পর্শ করতে পারতাম, তাহলে নিজের মনকে স্বান্তনা দেওয়া পারব এটা আমার পোলার কবর।’
একইভাবে ১৮ জুলাই নিখোঁজ হন রফিকুল ইসলাম। রফিকুলের বড় বোন টাইমসকে জানান, ২৪ জুলাই থেকে তারা এখানে আসলেও জানেন না তার ভাইয়ের কবর কোনটা। দিশেহারা হয়ে ভাইয়ের কবরটাকে খুঁজি যাতে ওর পাশে একটু দাঁড়িয়ে থাকতে পারি।’
জুলাই আন্দোলনে নিহতদের বেওয়ারিশ মরদেহ শনাক্ত করার জন্য রায়েরবাজার বুদ্ধিজীবী কবরস্থান থেকে ১১৪টি মরদেহ উত্তোলনের কাজ শুরু করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।
আদালতের নির্দেশে রোববার এ কার্যক্রম শুরু করে সিআইডি প্রধান ও অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক মো. ছিবগাত উল্লাহ, আন্তর্জাতিক ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ লুইস ফনডিব্রাইডারসহ সিআইডির ফরেনসিক টিম ও বিশেষায়িত ইউনিট।
স্বজনদের বিশ্বাস, দীর্ঘ ১৬ থেকে ১৭ মাস পরে হলেও ‘বেওয়ারিশ মরদেহ’ থেকে নিজের ওয়ারিশসূত্রে পাওয়া পরিচয় পাবেন তাদের নিহত প্রিয়জনেরা।


