সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক লিমিটেডের (এসআইবিএল) খেলাপি ঋণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮০ শতাংশে, আর নগদ ঋণ আদায় নেমে এসেছে শূন্যে–কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিযুক্ত প্রশাসকের অধীনে ব্যাংকটির আর্থিক অবস্থার এই অবনতি মার্জার প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
শনিবার সাপ্তাহিক ছুটির দিনে ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে এই সর্বশেষ হিসাব চূড়ান্ত করেন প্রশাসক মো. সালাহ উদ্দীন, টাইমসের হাতে থাকা নথিতে এমন তথ্য পাওয়া গেছে।
সংকটাপন্ন ব্যাংকটিকে স্থিতিশীল করে মার্জারের উপযোগী করে তোলার লক্ষ্যেই বাংলাদেশ ব্যাংক এই প্রশাসক নিয়োগ দিয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, সম্পদের মান ও আদায়–দুই ক্ষেত্রেই পরিস্থিতি ধারাবাহিকভাবে খারাপ হয়েছে।
২০২৫ সালের ৫ নভেম্বর প্রশাসক নিয়োগের সময় এসআইবিএলের খেলাপি ছিল প্রায় ৭৫ শতাংশ। তার মাত্র দুই মাস আগে, সেপ্টেম্বরে, এই হার ছিল ৬২ শতাংশের সামান্য বেশি। এরপর থেকে খেলাপি আরও বেড়েছে, আর আদায় কার্যত ভেঙে পড়েছে– এ বছরের মার্চ মাসে এক টাকাও নগদ আদায় হয়নি।
উপাত্ত বলছে, এই অবনতি কেবল আগের দুর্বল ঋণের উত্তরাধিকার নয়, বরং পুনরুদ্ধার নীতি প্রয়োগে একটি গুরুতর বিচ্যুতির ইঙ্গিত দিচ্ছে।
অভ্যন্তরীণ নথি বিশ্লেষণ ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা এবং গ্রাহকদের সঙ্গে কথা বলে টাইমস জানতে পেরেছে, খেলাপি কমাতে যে নীতি সহায়তা ব্যবস্থার কথা বাংলাদেশ ব্যাংক ঘোষণা করেছিল, তা কার্যত প্রয়োগ করা হয়নি। ফলে পুনঃতফসিল ও এককালীন এক্সিটের মাধ্যমে নগদ প্রবাহ বাড়ানোর সুযোগও হারিয়েছে ব্যাংকটি।
২০২৫ সালের ৭ অক্টোবর বাংলাদেশ ব্যাংক একটি সার্কুলার জারি করে অনিচ্ছাকৃত খেলাপি হয়ে পড়া বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলোকে সহায়তা দিতে নির্দেশ দেয়।
ওই নীতিতে বলা হয়, ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্টে ঋণ পুনঃতফসিল করা যাবে–আবেদনের সময় ১ শতাংশ এবং বাকি ১ শতাংশ ছয় মাসের মধ্যে জমা দিয়ে এক বছর গ্রেস পিরিয়ডসহ সর্বোচ্চ ১০ বছর মেয়াদে পরিশোধের সুযোগ থাকবে। এই নির্দেশনা এসআইবিএলসহ সব ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পাঠানো হয়।
কিন্তু এসআইবিএলের ক্ষেত্রে এই নীতির বাস্তবায়ন হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। বরং পুনঃতফসিল বা এককালীন নিষ্পত্তির আবেদন করা গ্রাহকদের অনেককে পুরো ঋণ শোধ অথবা অন্য ব্যাংকে স্থানান্তরের শর্ত দেওয়া হয়েছে।
আদায়ের চিত্র এই পরিস্থিতিকে স্পষ্ট করে। ২০২৫ সালের নভেম্বরের প্রথম চার দিনে, প্রশাসক দায়িত্ব নেওয়ার আগে, খেলাপি ঋণ থেকে প্রায় ৪১০ কোটি টাকা আদায় হয়েছিল। কিন্তু দায়িত্ব নেওয়ার পর একই মাসের বাকি ২৬ দিনে আদায় নেমে আসে মাত্র ৩৭ কোটিতে। এরপর জানুয়ারিতে ১০৩ কোটি এবং ফেব্রুয়ারিতে প্রায় ১৭৬ কোটি টাকা আদায় হলেও মার্চে তা শূন্যে নেমে আসে।
এই পতন ঘটেছে এমন সময়ে, যখন নীতি সহায়তার মাধ্যমে অন্তত কিছু ঋণ নিয়মিত করে নগদ প্রবাহ বাড়ানোর সুযোগ ছিল।
টাইমসের হাতে থাকা জয় ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের একটি চিঠি দেখায়, বাস্তবে এই নীতিগত ফাঁক কীভাবে কাজ করেছে। প্রতিষ্ঠানটি তাদের ঋণের ৫ শতাংশ হিসেবে দেড় কোটি টাকা জমা দিয়ে এককালীন এক্সিটের আবেদন করে।
চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, তাদের ব্যবসা ২০১৬ সালে সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায় এবং ২০১৮ সালে তাদের সম্মতি ছাড়াই ঋণ পুনঃতফসিল করা হয়, যার ফলে মূলধন ১১ দশমিক ৮২ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ১৫ দশমিক ৮০ কোটিতে দাঁড়ায়।
তারা আরও দাবি করে, ব্যাংকের সঙ্গে একাধিক বৈঠকে মূলধন পরিশোধের মাধ্যমে নিষ্পত্তির বিষয়ে সম্মতি হয়েছিল এবং সেটি ছিল ‘একটি নিস্পত্তিকৃত বিষয়’। কিন্তু চার মাস পর তাদের আবেদন বাতিল করা হয়, ফলে তাদের রপ্তানিমুখী ব্যবসা বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বসুন্ধরা, ওরিয়ন ও রূপায়ণসহ একাধিক বড় শিল্পগোষ্ঠী একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছে। তাদের অভিযোগ, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিমালা অনুযায়ী সুবিধা পাওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে তা দেওয়া হয়নি।
এক শীর্ষ শিল্পগোষ্ঠীর একজন কর্মকর্তা টাইমসকে বলেন, ‘আমরা যদি পুরো টাকা দিতে পারতাম, তাহলে এই নীতি সহায়তার দরকার হতো না। এখন উল্টো আরও চাপের মধ্যে পড়ছি।’
টাইমসের হাতে থাকা নথি অনুযায়ী, নীতি সহায়তা কার্যকর না হওয়ায় অন্তত ১,৭৭৬ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ নিয়মিত করার সুযোগ হারিয়েছে এসআইবিএল। এর মধ্যে বসুন্ধরা গ্রুপের ১ হাজার ৫৩৬ কোটি, ওরিয়নের ১৫১ কোটি এবং রূপায়ণের ৮৯ কোটি টাকা ঋণ রয়েছে।
ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, এসব ঋণ পুনঃতফসিলের ফাইল প্রস্তুত করে প্রশাসকের কাছে পাঠানো হলেও তা অগ্রসর হয়নি।
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় সংকেত এসেছে নগদ প্রবাহ থেকে। যেখানে পুনঃতফসিল বা এককালীন নিষ্পত্তির মাধ্যমে খেলাপি কমানোর সুযোগ ছিল, সেখানে বাস্তবে আদায় শূন্যে নেমে যাওয়ায় ব্যাংকের তারল্য ও স্থিতিশীলতা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, ঋণ পুনঃতফসিলের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এখন ব্যাংকের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। তাঁর ভাষায়, ‘ব্যাংক চাইলে গ্রাহক সম্পর্কের ভিত্তিতে স্বল্প ডাউন পেমেন্টে পুনঃতফসিল সুবিধা দিতে পারবে।’
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে এসআইবিএলের প্রশাসক মো. সালাহ উদ্দীনকে একাধিকবার ফোন ও বার্তা পাঠানো হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
এসআইবিএলের এই পরিস্থিতি এখন একটি বৃহত্তর প্রশ্ন সামনে আনছে–বাংলাদেশের ব্যাংক পুনর্গঠন প্রক্রিয়া কি সত্যিই পুনরুদ্ধার নিশ্চিত করছে, নাকি ভুল প্রয়োগে সংকটকে আরও গভীর করছে।


