জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার গঠনের চার মাসের বেশি সময় পার হলেও ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলে দাবি করেছে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি।
সংগঠনটির প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, চুক্তি বাস্তবায়ন না হওয়ায় পার্বত্য চট্টগ্রামের সার্বিক মানবাধিকার পরিস্থিতি ক্রমেই অবনতির দিকে যাচ্ছে এবং পূর্ববর্তী সরকারগুলোর মতো বর্তমান সরকারও রাজনৈতিক ও শান্তিপূর্ণ সমাধানের পরিবর্তে ব্যাপক সামরিক উপস্থিতির নীতিই অনুসরণ করছে।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পর তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার গঠন করে। ১৭ ফেব্রুয়ারি শপথ নেওয়ার সময় রাঙ্গামাটি আসন থেকে নির্বাচিত দীপেন দেওয়ানকে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী করা হয়, যা পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে একই দিনে চট্টগ্রাম-৫ আসন থেকে নির্বাচিত বাঙালি সংসদ সদস্য মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিনকে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেওয়াকে চুক্তির মূল চেতনার পরিপন্থী বলে দাবি করেছে জনসংহতি সমিতি।প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়, পার্বত্য চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন মহল থেকে তাকে ওই মন্ত্রণালয় থেকে সরানোর দাবি উঠলেও সরকার কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।
প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়, পার্বত্য মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার ১০২ দিনের মাথায় নানা চাপের মুখে দীপেন দেওয়ানকে গত ১ জুন পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়। এরপর থেকে এখন পর্যন্ত কোনো জুম্ম প্রতিনিধিকে পার্বত্য মন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়নি।
বর্তমানে মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিনের মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় পরিচালনা করা হচ্ছে, যা পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির লঙ্ঘন বলেও অভিযোগ করেছে জনসংহতি সমিতি।
তাদের প্রকাশিত প্রতিবেদনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদের বক্তব্য নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। গত ১১ মার্চ একটি আলোচনা সভায় তিনি বলেছিলেন, ‘রাষ্ট্রীয় অখণ্ডতা রক্ষার ক্ষেত্রে পার্বত্য চট্টগ্রামে শতভাগ মানবাধিকার নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।’
এ ধরনের বক্তব্য পার্বত্য চট্টগ্রামে মানবাধিকার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে এবং চলমান মানবাধিকার লঙ্ঘনকে উৎসাহিত করতে পারে শঙ্কা জানায় সংগঠনটি।
দাবি করা হয়, সরকার পরিবর্তনের পরও নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে জুম্ম জনগোষ্ঠীর ওপর নিপীড়ন, মানবাধিকার লঙ্ঘন, সেনাসমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা, সেটেলার বাঙালি ও রোহিঙ্গা গোষ্ঠীর হামলা, ভূমি দখল, ধর্মান্তরকরণ এবং জুম্ম নারী ও শিশুদের ওপর সহিংসতার ঘটনা অব্যাহত রয়েছে।
তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত পার্বত্য চট্টগ্রামে মোট ৫৭টি মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় ১৫৪ জন জুম্ম মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হয়েছেন এবং ১০ জন নিহত হয়েছেন।
সেনাসমর্থিত বলে বর্ণিত বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ১২টি ঘটনার অভিযোগ করা হয়েছে। অভিযোগগুলোর মধ্যে অপহরণ, মুক্তিপণ আদায়, মারধর, হত্যা, গুলিতে আহত করা, তল্লাশি, হত্যার হুমকি, টাকা ও মোবাইল ফোন ছিনতাই এবং চাঁদা দাবির ঘটনা রয়েছে।
এছাড়া বান্দরবানের বিভিন্ন উপজেলায় বিশেষ করে ম্রো, ত্রিপুরা এবং কিছু চাকমা জনগোষ্ঠীর দরিদ্রতার সুযোগ নিয়ে ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরকরণের কার্যক্রম এখনো চলছে বলে প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে।


