পর্যটনে অপার সম্ভাবনার উত্তরাঞ্চল

পর্যটনে অপার সম্ভাবনার উত্তরাঞ্চল
চাঁপাইনবাগঞ্জে আম বাগান। ছবি: সংগৃহীত
Advertisement
Advertisement

দীর্ঘদিন ধরে কেবল কৃষি, ঐতিহ্য আর সংস্কৃতির জনপদ হিসেবে পরিচিত দেশের উত্তরাঞ্চল। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এ অঞ্চলে এক নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে পর্যটন শিল্প। অপরূপ  প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন, নদীভিত্তিক জীবনধারা, গ্রামীণ সংস্কৃতি, সবুজ চায়ের বাগান, পাহাড়ি পরিবেশ এবং ঐতিহাসিক স্থাপনাকে কেন্দ্র করে উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা এখন দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আকর্ষণের প্রধান কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হচ্ছে।

তবে এই বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও পর্যাপ্ত দূরদর্শী পরিকল্পনা, আধুনিক অবকাঠামো, উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং কার্যকর প্রচারের অভাবে সম্ভাবনাময় এই খাতটি এখনো তার কাঙ্ক্ষিত সাফল্যের শিখরে পৌঁছাতে পারেনি।

পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহার। ছবি: আব্দুল মমিন

বিশেষজ্ঞ ও পর্যটন সংশ্লিষ্টদের মতে, দেশের উত্তরাঞ্চলে পরিকল্পিতভাবে পর্যটন শিল্প গড়ে তোলা সম্ভব হলে আগামী পাঁচ থেকে সাত বছরের মধ্যে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে কয়েক লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের এক বিশাল সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। বিশেষ করে হোটেল-মোটেল, রিসোর্ট, পরিবহন, রেস্তোরাঁ, স্থানীয় হস্তশিল্প, গাইড সেবা, নৌভ্রমণ, কৃষিভিত্তিক পর্যটন ও সাংস্কৃতিক আয়োজনকে ঘিরে বিপুল সংখ্যক মানুষের জন্য তৈরি হবে নতুন কর্মক্ষেত্র। শুধু রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ, নাটোর, বগুড়া, দিনাজপুর, রংপুর ও কুড়িগ্রামসহ বিভিন্ন জেলার ঐতিহাসিক ও প্রাকৃতিক পর্যটন কেন্দ্রগুলোকে যদি আধুনিক সুযোগ-সুবিধার আওতায় আনা যায়, তবে বছরে কয়েক হাজার কোটি টাকার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সৃষ্টি হবে।

সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, পর্যটন খাতকে কেন্দ্র করে আবাসন, খাদ্য, পরিবহন ও স্থানীয় পণ্যের বাজার সম্প্রসারণের মাধ্যমে এই অঞ্চলে বছরে প্রায় ৮ থেকে ১০ হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য হওয়া সম্ভব।

উত্তরাঞ্চলের বৈচিত্র্যময় পর্যটন স্পটগুলোর দিকে তাকালে এর সমৃদ্ধির প্রমাণ মেলে। রাজশাহীর পদ্মাপাড় এখন অন্যতম প্রধান আকর্ষণ, যেখানে প্রতিদিন বিকালে হাজারো মানুষের সমাগম ঘটে। এর পাশাপাশি রাজশাহীর বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর, বাঘা মসজিদ, পুঠিয়া রাজবাড়ি এবং দিগন্তজোড়া আমবাগান পর্যটকদের দারুণভাবে আকৃষ্ট করছে।

অন্যদিকে নওগাঁর পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার আন্তর্জাতিকভাবে সমাদৃত একটি প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। দিনাজপুরের কান্তজিউ মন্দির ও রামসাগর, বগুড়ার মহাস্থানগড়, পঞ্চগড়ের সমতলের চা-বাগান এবং তেঁতুলিয়ার আকাশ পরিষ্কার থাকলে কাঞ্চনজঙ্ঘার অপরূপ দর্শন পর্যটকদের কাছে সবসময়ই বিশেষ আকর্ষণ তৈরি করে রেখেছে।

পঞ্চগড়ে সমতলের চা বাগান। ছবি: সংগৃহীত

এতসব আকর্ষণ থাকা সত্ত্বেও উত্তরাঞ্চলের পর্যটন বিকাশে মূল অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে দুর্বল যোগাযোগ ব্যবস্থা, মানসম্মত আবাসনের অভাব এবং পর্যাপ্ত বিনোদন সুবিধার ঘাটতি। অনেক দর্শনীয় স্থানে যাতায়াতের রাস্তা এখনো বেশ ঝুঁকিপূর্ণ ও অপরিকল্পিত। কোনো কোনো এলাকায় পর্যাপ্ত গণপরিবহন না থাকায় দূর-দূরান্ত থেকে আসা পর্যটকদের চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয়।

আরও পড়ুন

জাতীয় পর্যায়ে ঢাকা বা কক্সবাজারের মতো উত্তরাঞ্চলের পর্যটনকেন্দ্রগুলো নিয়ে জোরালো কোনো প্রচার চালানো হয় না। ফলে দেশের বহু মানুষ এখনো এই অঞ্চলের অসাধারণ পর্যটন স্পটগুলো সম্পর্কে অন্ধকারেই রয়ে গেছেন। বর্তমানে কিছু এলাকায় পর্যটকের চাপ বাড়লেও সেখানে পর্যাপ্ত পাবলিক টয়লেট, বিশ্রামাগার, গাড়ি পার্কিং ব্যবস্থা এবং নিরাপত্তার অভাব থাকায় অনেক দর্শনার্থীকেই নেতিবাচক অভিজ্ঞতা নিয়ে ফিরতে হচ্ছে।

আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো উত্তরাঞ্চলের পর্যটনের মৌসুমি নির্ভরতা। সাধারণত শীত মৌসুমে পঞ্চগড়, দিনাজপুর ও ঠাকুরগাঁও এলাকায় পর্যটকের ঢল নামলেও বছরের অন্য সময় এই প্রবাহ প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে আসে। একইভাবে গ্রীষ্মকালে আম মৌসুমে রাজশাহীতে পর্যটকের আগমন বাড়লেও তা স্থায়ী রূপ পায় না।

রাজশাহী শহর। ছবি: সংগৃহীত

এই শিল্পকে টেকসই করতে হলে অঞ্চলভিত্তিক বিশেষ পর্যটন প্যাকেজ বা থিমভিত্তিক পর্যটন চালুর পরামর্শ দিচ্ছেন বিশ্লেষকরা। যেমন রাজশাহীতে ‘ম্যাংগো ট্যুরিজম’, পঞ্চগড়ে ‘টি ট্যুরিজম’, নওগাঁয় ‘হেরিটেজ ট্যুরিজম’ এবং পদ্মা ও যমুনা নদীকে কেন্দ্র করে ‘রিভার ট্যুরিজম’ চালু করা গেলে পর্যটকদের সারা বছরই ধরে রাখা সম্ভব। এর পাশাপাশি গ্রামবাংলার জীবনধারা, লোকসংগীত, ঐতিহ্যবাহী খাবার ও কৃষিকে কেন্দ্র করে ‘কমিউনিটি বেইজড ট্যুরিজম’ চালু করা গেলে স্থানীয় জনগণ ও নারী ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা সরাসরি লাভবান হবেন।

বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন সূত্রে জানা গেছে, সরকার ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পর্যটন উন্নয়নে কিছু প্রকল্প হাতে নিয়েছে। এর মধ্যে উত্তরাঞ্চলে পর্যটনবান্ধব অবকাঠামো উন্নয়ন, সড়ক সংস্কার ও নতুন বিনোদন কেন্দ্র গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে সেখানে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে নানা ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

এ বিষয়ে আম বিশেষজ্ঞ, নদী ও পরিবেশ গবেষক এবং হেরিটেজ রাজশাহীর সভাপতি মাহবুব সিদ্দিকী বলেন, উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোতে পর্যটনের যে বড় ধরনের সম্ভাবনা রয়েছে, তাকে কাজে লাগাতে পারলে স্থানীয় অর্থনীতি যেমন শক্তিশালী হবে, তেমনি বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।

তিনি আরও বলেন, পর্যটন খাতকে শতভাগ আধুনিকায়ন করা সম্ভব হলে আগামী ৫ থেকে ১০ বছরে এই অঞ্চলে প্রায় ৮ থেকে ১০ হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য করা অবাস্তব কিছু নয়।

দিনাজপুরে কান্তজিউ মন্দির। ছবি: সংগৃহীত

রাজশাহী চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সভাপতি মাসুদুর রহমান রিংকু এ অঞ্চলের পর্যটন সম্ভাবনাকে অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তরের তাগিদ দিয়ে বলেন, পরিকল্পিত উদ্যোগ ও আধুনিক অবকাঠামো উন্নয়নের কোনো বিকল্প নেই। তিনি বিশেষভাবে রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলায় সুলতানগঞ্জ করিডর চালু এবং পদ্মা নদী ড্রেজিংয়ের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

তার মতে, যোগাযোগ ও নৌপথের আধুনিকায়ন ছাড়া এ অঞ্চলের পর্যটন শিল্পের প্রকৃত বিকাশ সম্ভব নয়। একই সঙ্গে তিনি সরকারি পর্যটন মোটেল ও সংশ্লিষ্ট অবকাঠামোকে যুগোপযোগী করার আহ্বান জানান।

প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, গৌরবময় ইতিহাস আর সমৃদ্ধ সংস্কৃতির মেলবন্ধনে উত্তরাঞ্চল আজ সম্ভাবনার এক উজ্জ্বল দীপ্তি ছড়াচ্ছে। এখন শুধু প্রয়োজন সঠিক দূরদর্শী পরিকল্পনা, আন্তর্জাতিক মানের জোরদার প্রচার এবং একটি নিরাপদ ও আধুনিক পরিবেশ নিশ্চিত করা। যথাযথ রাষ্ট্রীয় ও বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে উত্তরাঞ্চল অচিরেই হয়ে উঠতে পারে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান ও লাভজনক পর্যটন স্বর্গরাজ্য।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad