প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ঘোষণা করেছেন, দেশের উত্তরাঞ্চল ও দক্ষিণাঞ্চলের পানির সংকট নিরসনে পদ্মা ব্যারেজের মতো তিস্তা ব্যারেজও নির্মাণ করবে বর্তমান বিএনপি সরকার।
বুধবার বিকালে গাজীপুরের গাছা এলাকার সাতাইশ চৌরাস্তায় জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট প্রাঙ্গণে আয়োজিত এক সুধী সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এই ঘোষণা দেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আপনাদের সবার সামনে আজকে আমি পরিষ্কার একটি কথা বলে যাই, ইনশাআল্লাহ, বিএনপি সরকার পদ্মা ব্যারেজের কাজেও হাত দেবে।’
বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সমালোচনা করে তিনি বলেন, যারা বড় বড় ও গরম কথা বলে, তারা কোনো কাজ করেনি। অতীতে বিএনপিই তিস্তা নদী রক্ষা কর্মসূচি ও মাঠের কাজ সম্পন্ন করেছে এবং ভবিষ্যতেও বিএনপিই জনগণের জন্য কাজ করবে।

পদ্মা ব্যারেজ নির্মাণের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সীমান্তের ওপারে ব্যারেজ তৈরি করে পানি প্রত্যাহার করে নেওয়ায় শুষ্ক মৌসুমে আমাদের এখানে পানির প্রবাহ কমে যাচ্ছে এবং চারপাশ শুকিয়ে যাচ্ছে। ফারাক্কা বাঁধের কারণে পানির পরিমাণ কমে যাওয়ায় দক্ষিণাঞ্চলে সমুদ্রের নোনা পানি ঢুকছে, যার ফলে সুন্দরবনসহ ওই অঞ্চলের গাছপালা ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হচ্ছে।’
‘এই নদীর পানির সঠিক চাপ বজায় রাখতে এবং বর্ষা ও শুষ্ক উভয় মৌসুমে দেশের মানুষের পানির নিশ্চয়তা দিতে আমরা পদ্মা ব্যারেজের মাধ্যমে পানি ধরে রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যোগ করেন তিনি।
জলবায়ু পরিবর্তনে বিরূপ প্রভাব
সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী জলবায়ু ও আবহাওয়া পরিবর্তনের বৈশ্বিক ও দেশীয় চিত্র তুলে ধরেন। তিনি নিজের শৈশবের স্মৃতিচারণ করে বলেন, আগে ডিসেম্বর-জানুয়ারি মাসে তীব্র শীত থাকত এবং ২৬ মার্চের অনুষ্ঠানের মহড়ার সময়ও সোয়েটার পরতে হতো, যা এখন দেখা যায় না। এমনকি গ্রীষ্মকালে গরমের তীব্রতা আগের চেয়ে অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে।
আসার পথে বালির ওপর বড় নৌকা পড়ে থাকতে দেখে ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ২০-২৫ বছর আগেও এখানে নদী ছিল, যা এখন ভরাট হয়ে গেছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং জায়গা সংকুচিত হওয়ার কারণে প্রকৃতির ওপর বাড়তি চাপ পড়ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি মিয়ানমার থেকে আসা রোহিঙ্গাদের অস্থায়ী আবাসন তৈরি করতে গিয়ে কক্সবাজারে বিপুল পরিমাণ গাছ কাটার কথা স্মরণ করিয়ে দেন।
একইসঙ্গে কক্সবাজার থেকে উখিয়া পর্যন্ত নবনির্মিত মেরিন ড্রাইভ বা বিচ রোডের নকশার কারণে তিন হাজার গাছ কাটার সিদ্ধান্তের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, খবরটি দেখামাত্রই তিনি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীকে ফোন করে নকশা পরিবর্তন করে গাছগুলো রক্ষা করার নির্দেশ দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী সাফ জানিয়ে দেন, যেকোনো মূল্যে এই গাছ কাটা বন্ধ রাখতে হবে।
দুর্যোগ মোকাবিলায় সচেতনতার আহ্বান
প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ নিয়ন্ত্রণ বা বন্ধ করার ক্ষমতা মানুষের নেই। বাংলাদেশ একটি জনবহুল ও দুর্যোগপ্রবণ দেশ হওয়ায় ছোটখাটো দুর্যোগেও মানুষ, ফসল ও গবাদি পশুর ব্যাপক ক্ষতি হয়।
এই ক্ষতি কমাতে দুটি মূল লক্ষ্য নিয়ে জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট স্থাপন করা হচ্ছে—প্রথমত, জলবায়ুর পরিবর্তন নিয়ে গবেষণা ও তা মোকাবিলা করার উপায় খোঁজা এবং দ্বিতীয়ত, ভূমিকম্প বা জলোচ্ছ্বাসের মতো দুর্যোগে মানবসম্পদ ও জানমাল রক্ষা করা।
শুষ্ক মৌসুমে পানি সংরক্ষণের জন্য কৃষি ও মানুষের জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ‘খাল খনন কর্মসূচি’ চালিয়ে যাওয়ার ওপর তিনি জোর দেন।

দেশের সম্পদ রক্ষায় সবাইকে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আসুন, এখানে শপথ গ্রহণ করি—আমরা নিজেরা সচেতন হব, অন্যকে সচেতন করব এবং প্রকৃতিকে যত কম ডিস্টার্ব করা যায় সেই কাজটি করব।’
এর আগে প্রধানমন্ত্রী সাতাইশ মৌজার ৮ দশমিক ২০ একর জমিতে ৪৭ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন দেশের একমাত্র বিশেষায়িত ‘জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট’ ভবনের ১০ তলা বিশিষ্ট প্রশাসনিক ও একাডেমিক ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন।
ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন শেষে তিনি ইনস্টিটিউট প্রাঙ্গণের পুকুরে মাছের পোনা অবমুক্ত করেন এবং একটি স্মারক বৃক্ষ রোপণ করেন।
জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন প্রতিমন্ত্রী এম ইকবাল হোসেইন, সচিব সাইদুর রহমান খান এবং জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক রেজানুর রহমান।
অনুষ্ঠানে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় এবং জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীকে আলাদাভাবে স্মারক শুভেচ্ছা ও সম্মাননা প্রদান করা হয়।
সমাবেশে প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম শামসুল ইসলাম, সংসদ সদস্য মনজুরুল করিম রনি, গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক শওকত হোসেন সরকারসহ সরকারের ঊর্ধ্বতন সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।


