নেপালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধ ও দুর্নীতির অভিযোগে শুরু হওয়া বিক্ষোভ আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। টানা দ্বিতীয় দিনের মতো চলা বিক্ষোভে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শের বাহাদুর দেউবা এবং তার স্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরজু রানা দেউবার ওপর হামলা চালিয়েছে বিক্ষোভকারীরা।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এক ভিডিওতে দেখা গেছে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেউবার মুখ থেকে রক্ত ঝরছে। সেনা সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে দেউবা দম্পতিকে উদ্ধার করে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির খবরে বলা হয়, কাঠমান্ডুর বুদানিলকান্থায় দেউবার বাসভবনে প্রবেশ করে বিক্ষোভকারীরা। এ সময় ভাঙচুর চালিয়ে বাড়ি লণ্ডভণ্ড করে বিক্ষোভকারীরা।
ক্ষুব্ধ তরুণরা রাজপথে স্লোগান দেয় ‘কেপি চোর, দেশ ছেড়ে যাও’, এবং ‘করাপশন বন্ধ করো, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বন্ধ নয়’।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, কাঠমান্ডু এখন ‘যুদ্ধক্ষেত্রের’ মতো। ছোট ছোট দলে বিভক্ত তরুণ-তরুণীরা রাস্তায় নেমে পুলিশের সঙ্গে সরাসরি সংঘর্ষে লিপ্ত হচ্ছে।
এর আগে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী ঝালনাথ খানালের স্ত্রী রাজ্যলক্ষ্মী চিত্রকরকে জীবন্ত পুড়িয়ে হত্যার অভিযোগ ওঠে। একই সঙ্গে বিভিন্ন মন্ত্রী ও রাজনৈতিক নেতাদের বাড়ি, সরকারি ভবন, এমনকি পুলিশ স্টেশনও আগুনে পোড়ানো হয়।
দুই দিনের সংঘর্ষে অন্তত ২২ জন নিহত ও ৩০০ জনের বেশি আহত হয়েছে বলে কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছে। সহিংস পরিস্থিতির মধ্যে পদত্যাগ করেছেন নেপালের প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা অলি এবং রাষ্ট্রপতি রামচন্দ্র পৌদেল। এর আগে নৈতিক দায় স্বীকার করে সরে দাঁড়ান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রমেশ লেখক।
বিক্ষোভকারীদের হামলা থেকে রেহাই পাননি অর্থমন্ত্রী বিষ্ণু প্রসাদ পাওডেলও। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা গেছে, বিক্ষোভকারীরা তাকে রাস্তায় ফেলে ঘুষি ও লাথি মেরে গুরুতরভাবে আহত করছে।
‘জেনারেশন জেড প্রোটেস্ট’ (জেন-জি) নামে পরিচিত এই আন্দোলনের সূত্রপাত হয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত থেকে।
দেশটির সরকারের দাবি, ফেসবুক, ইউটিউব ও এক্সসহ ২৬টি প্ল্যাটফর্ম নেপালে নিবন্ধন ছাড়াই কার্যক্রম চালাচ্ছে। যদিও নিষেধাজ্ঞা পরে তুলে নেওয়া হয়, কিন্তু তরুণদের আন্দোলন থামেনি। বরং বিক্ষোভকারীরা সংসদ ভবন, মন্ত্রীদের বাড়ি-ঘর এবং কাঠমান্ডু বিমানবন্দর পর্যন্ত অচল করে তোলে। সেনা হেলিকপ্টারে কয়েকজন মন্ত্রীকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়।
বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, সরকার শুধু মতপ্রকাশের স্বাধীনতা দমন করছে না, রাষ্ট্রীয় দুর্নীতির প্রতিরোধেও কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে না। তাদের দাবি, রাজনীতিবিদদের সন্তানরা বিলাসবহুল জীবনযাপন করছে, অথচ সাধারণ তরুণেরা চাকরির অভাবে হতাশ হয়ে পড়ছে।
বিক্ষোভকারীদের আলোচনায় বসার আহ্বান নেপালের সেনাপ্রধানের
নেপালের চলমান রাজনৈতিক সংকট নিরসনে বিক্ষোভকারীদের আলোচনায় বসার আহ্বান জানিয়েছেন দেশটির সেনাপ্রধান জেনারেল অশোক রাজ সিগদেল। মঙ্গলবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত এক ভিডিও বার্তায় তিনি বলেন, সেনাবাহিনী জাতীয় ঐক্য ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
জেনারেল সিগদেল বলেন, ‘চলমান বিক্ষোভে প্রাণহানি ও সম্পদের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।’
তিনি বিক্ষোভকারীদের সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা, জাতীয় ঐক্য নিশ্চিত করা এবং অতিরিক্ত প্রাণহানি ও সম্পদের ক্ষতি এড়ানো আমাদের সবার দায়িত্ব।’
বর্তমান পরিস্থিতিকে তিনি ‘অস্বস্তিকর’ হিসেবে উল্লেখ করে দ্রুত উত্তেজনা প্রশমনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। এ সময় সহিংসতায় নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান তিনি।


