রাজবাড়ীর গোয়ালন্দে নুরুল হক ওরফে নুরাল পাগলার দরবারে হামলায় ভক্ত রাসেল মোল্লার মৃত্যুর ঘটনায় মামলা করেছেন নিহতের বাবা আজাদ মোল্লা। এ মামলায় আসামি করা হয়েছে অজ্ঞাত চার হাজার জনকে।
গত শুক্রবার দুপুরে ওই হামলার পর রাতে প্রাণ হারান রাসেল মোল্লা (২৮)। এ ঘটনায় সোমবার রাতে গোয়ালন্দ ঘাট থানায় তার বাবা মামলা করেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।
মঙ্গলবার সকালে জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম এন্ড অপস) মো. শরীফ আল রাজীব জানান, হত্যার ঘটনায় অজ্ঞাতনামা সাড়ে তিন হাজার থেকে চার হাজার জনকে আসামি করে গোয়ালন্দ ঘাট থানায় হত্যা, অগ্নিসংযোগ, মরদেহ পোড়ানো, ক্ষতিসাধন, চুরি ও জখমের অভিযোগে মামলা করেছেন রাসেল মোল্লার বাবা। ওই মামলায় লতিফ ইমাম ও আসলাম শেখ নামে দুইজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বাকিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।
তিনি আরও জানান, পুলিশের ওপর হামলা ও গাড়ি ভাঙচুরের ঘটনায় যারা গ্রেপ্তার রয়েছে বা গ্রেপ্তার হবে তদন্তে তাদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলায় সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে সেটাতেও তাদের গ্রেপ্তার দেখানো হবে।
মৃত রাসেল মোল্লা গোয়ালন্দ উপজেলার দেবগ্রাম ইউনিয়নের জটু মিস্ত্রিপাড়ার আজাদ মোল্লার ছেলে। তিনি কাভার্ডভ্যান চালক ছিলেন। শুক্রবার সকালে নুরাল পাগলার দরবারে প্রবেশ করেন তার ভক্ত রাসেল।
জুমার নামাজের পর বিক্ষুব্ধ জনতা দরবারে ভাঙচুর চালালে রাসেলও হামলার শিকার হয়। সে সময় রাসেল গুরুতর আহত হন। পরে তাকে উদ্ধার করে গোয়ালন্দ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। সেখানে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার্ড করা হয়। শুক্রবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সেখানে রাসেলের মৃত্যু হয়।

মসজিদের ইমামসহ গ্রেপ্তার ১৮
নুরাল পাগলার দরবারে হামলা, পুলিশের গাড়ি ভাঙচুর, মাজার ভাঙা, মারামারিতে আহত, নিহত, সম্পদ লুটপাট, কবর থেকে লাশ উত্তোলন ও পুড়িয়ে ফেলার অপরাধে মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত ১৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে পাঠানো এক বার্তায় এ তথ্য জানানো হয়।
সেখানে বলা হয়, গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে রয়েছেন স্থানীয় মসজিদের ইমাম লতিফ হুজুর, যিনি ঘটনার পর থেকে পলাতক ছিলেন। মঙ্গলবার ভোরে তাকে মানিকগঞ্জের চর এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়।
গোয়ালন্দের স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, পৌরসভার পাঁচ নম্বর ওয়ার্ডের নুরুল হক ওরফে নুরাল পাগল বহু বছর আগে নিজ বাড়িতে গড়ে তোলেন দরবার শরীফ। আশির দশকের শেষের দিকে নিজেকে ‘ইমাম মাহদী’ দাবি করে আলোচনায় আসেন তিনি।
ওই সময়ে তার বিরুদ্ধে তীব্র জনরোষ তৈরি হয়। পরে ১৯৯৩ সালের ২৩ মার্চ জনরোষ এড়াতে তিনি মুচলেকা দিয়ে এলাকা ত্যাগ করেন। এর কিছুদিন পর তিনি আবার ফিরে এসে তার দরবার শরীফের কার্যক্রম পরিচালনা শুরু করেন।
গত ২৩ আগস্ট ভোরে বার্ধক্যজনিত অসুস্থতায় রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান নুরাল পাগল। পরে ওইদিনই সন্ধ্যায় এলাকাবাসীর অংশগ্রহণে তার প্রথম জানাজা নামাজ অনুষ্ঠিত হয় এবং পরে তার ভক্তানুরাগীদের অংশগ্রহণের দরবার শরীফের ভেতরে দ্বিতীয় জানাজা নামাজ শেষে রাত ১০ টার দিকে তাকে মাটি থেকে প্রায় ১২ ফুট উঁচু স্থানে বিশেষ কায়দায় দাফন করা হয়। পবিত্র কাবা শরীফের আদলে তার কবরের রং করা হয়। এরপর থেকেই বিষয়টি নিয়ে ফুঁসে ওঠেন বিক্ষুব্ধ জনতা। তাদের আন্দোলনের ফলে কবরের রং পরিবর্তন করা হয়।
এ বিষয় নিয়ে জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কয়েক দফায় বৈঠক হয় বিক্ষুব্ধ জনতা ও নুরাল পাগলার পরিবারের সদস্যদের। এরপরেও কবর নিচে নামাতে গড়িমসি করে নুরাল পাগলার পরিবারের সদস্যরা।
পরে এ বিষয়ে দুই দফা সংবাদ সম্মেলন করে কঠোর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দেন বিক্ষুব্ধ জনতা। কবর নিচে নামানো না হলে কবর ভেঙে ফেলার হুঁশিয়ারিও দেয়া হয়।
তারই ধারাবাহিকতায় শুক্রবার জুম্মার পর গোয়ালন্দ আনসার ক্লাব মাঠে বিক্ষোভ সমাবেশ করে বিক্ষুব্ধ জনতা। বিক্ষোভ থেকে হামলা চালানো হয় নুরাল পাগলার দরবারে। পাল্টা আক্রমণ করেন নুরাল পাগলার ভক্তরা। ইট-পাটকেল নিক্ষেপসহ তুমুল সংঘর্ষে দুই পক্ষের শতাধিক মানুষ আহত হন। এক পর্যায়ে নুরাল পাগলার দরবারে ঢুকে আগুন ধরিয়ে দেয় বিক্ষুব্ধ জনতা। পরে নুরাল পাগলার মরদেহ কবর থেকে তুলে গোয়ালন্দ পদ্মার মোড়ে ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের ওপর নিয়ে পুড়িয়ে দেয় বিক্ষুব্ধ জনতা।

এদিকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করলে হামলা চালানো হয় পুলিশের ওপর, ভাঙচুর করা হয় পুলিশের দুটি গাড়ি। এতে ৬ পুলিশ সদস্য আহত হন। হামলার ঘটনার সময় দুইপক্ষের শতাধিক মানুষ আহত হন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সেনাবাহিনী এলে তাদের ওপরেও বিক্ষুব্ধ জনতা চড়াও হওয়ার চেষ্টা করে বলে জানা গেছে।
সেদিনই রাতে পুলিশের সরকারি কাজে বাঁধা, হামলা ও গাড়ি ভাঙচুরের ঘটনায় গোয়ালন্দ ঘাট থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) সেলিম মোল্লা বাদী হয়ে তিন হাজার থেকে সাড়ে তিন হাজার অজ্ঞাত ব্যক্তিকে আসামি করে মামলা দায়ের করেন।


