বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় নাগরিকরা যেসব বিষয় নিয়ে উদ্বিগ্ন, তার অন্যতম হলো কর্মসংস্থান। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ভোটাররা রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে প্রতিশ্রুতির বাইরে গিয়ে স্পষ্ট ও বাস্তবভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা প্রত্যাশা করছেন।
সোমবার ঢাকায় ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনাল ও দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এক সংলাপে নীতিনির্ধারক, রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি, ব্যবসায়ী নেতা ও শ্রম বিশেষজ্ঞরা কর্মসংস্থানের চ্যালেঞ্জ ও নীতিগত করণীয় নিয়ে আলোচনা করেন।
ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনালের ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে পরিচালিত এক জনমত জরিপের তথ্য তুলে ধরে সেখানে বলা হয়, ৪০ দশমিক ৪ শতাংশ উত্তরদাতা এক বছর আগের তুলনায় নিজেদের অবস্থাকে ভালো মনে করেন না, যেখানে ২৭ দশমিক ৪ শতাংশ কম আয়ের সুযোগকে এবং ১৭ শতাংশ নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধিকে প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
জরিপে আরও দেখা যায়, ৩৭ দশমিক ২ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন রাজনৈতিক দলগুলো তরুণদের উদ্বেগকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে না, আর ১৩ দশমিক ৯ শতাংশ এ বিষয়ে অনিশ্চিত মত দিয়েছেন।
সংলাপের সূচনায় ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনালের বাংলাদেশে প্রধান প্রতিনিধি ক্যাথরিন সিসিল বলেন, দীর্ঘদিন ধরেই কর্মসংস্থান দেশের মানুষের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার, বিশেষ করে তরুণদের ক্ষেত্রে।
বেসরকারি খাতের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরে বিডিজবসের প্রতিষ্ঠাতা ফাহিম মাশরুর বলেন, বাংলাদেশের বেকারত্ব পরিস্থিতিকে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে দেখা প্রয়োজন, কারণ পার্শ্ববর্তী কয়েকটি দেশে বেকারত্বের হার আরও বেশি।
তবে তিনি এটাও জানান যে, দেশে শিক্ষিত বেকারত্বের হার ২০১০ সালে ৪ দশমিক ৯ শতাংশ থেকে ২০২২ সালে বেড়ে ১২ শতাংশে পৌঁছেছে, যদিও অশিক্ষিতদের মধ্যে বেকারত্ব কমেছে।
আকিজ-বশির গ্রুপের গ্রুপ মানবসম্পদ পরিচালক দিলরুবা এস খান বলেন, শ্রমবাজারে এক ধরনের অসামঞ্জস্য রয়েছে, যেখানে শিল্পখাত শ্রমিক সংকটের কথা বলছে অথচ চাকরিপ্রার্থীরা সুযোগের অভাবে ভুগছেন, যার পেছনে দক্ষ শ্রমিকের ঘাটতি এবং প্রশিক্ষণ কর্মসূচি ও শিল্পখাতের চাহিদার মধ্যে দুর্বল সমন্বয় দায়ী।
এই ব্যবধান দূর করতে তিনি উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা এবং বিদ্যালয় পর্যায় থেকেই পাঠ্যক্রম সংস্কারের ওপর গুরুত্ব দেন।
রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিটের কর্মসূচি পরিচালক মারিনা সুলতানা বলেন, প্রতিবছর ১১ থেকে ১২ লাখ তরুণ বিদেশে যান, যাদের অধিকাংশের বয়স ১৮ থেকে ২৬ বছরের মধ্যে। তবে দক্ষতার অমিল ও সীমিত কাজের সুযোগের কারণে গত বছরের প্রথম ছয় মাসে প্রায় ৪০ হাজার প্রবাসী শ্রমিক দেশে ফিরে এসেছেন।
তিনি নিয়োগ ব্যবস্থাপনা ও প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার দুর্বলতার কথা উল্লেখ করে বৈশ্বিক শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে বাজারভিত্তিক প্রশিক্ষণ এবং নিয়োগ সংস্থার ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণের আহ্বান জানান।
শিল্পখাতের পক্ষে কথা বলতে গিয়ে বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ব্যাংকিং ও শিল্পনীতির নানা সমস্যার কারণে ধীরে ধীরে কারখানা বন্ধ হতে বাধ্য হচ্ছে।
তিনি বলেন, গত দুই বছরে শিল্পখাত এমন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে, যা গত ৩৮ বছরে দেখা যায়নি, এবং কর্মসংস্থান রক্ষায় জরুরি সংস্কারের তাগিদ দেন।
রাজনৈতিক দলের অবস্থান তুলে ধরে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের নীতিগত টিমের সদস্য সাইয়েদ আবদুল্লাহ বলেন, ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে কেন্দ্রীয় বিষয়, যেখানে দক্ষতা উন্নয়ন, তথ্যপ্রযুক্তি খাত সম্প্রসারণ, প্রবাসী কর্মীদের জন্য স্বল্পসুদে ঋণ এবং মাধ্যমিক পর্যায় থেকেই ভাষা শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর জাতীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য হাফিজুর রহমান তরুণদের কর্মসংস্থানকে অগ্রাধিকার দিয়ে বৃহৎ পরিসরে দক্ষতাভিত্তিক প্রশিক্ষণ, যুব ঋণ কর্মসূচি, স্থানীয় ভাষা কেন্দ্র ও কর সংস্কারের প্রস্তাব দেন।
ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব মেধাভিত্তিক নিয়োগ, চাকরির নিরাপত্তা এবং কৃষি ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টির ওপর জোর দেন।
গণসংহতি আন্দোলনের রাজনৈতিক পরিষদের সদস্য তাসলিমা আক্তার বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ব্যাপক কর্মসংস্থান হারিয়ে গেছে, আর কারিগরের ব্যবস্থাপনা অংশীদার তানিয়া ওয়াহাব উদ্যোক্তাদের হয়রানি, চাঁদাবাজি ও নিরাপত্তাহীনতা কমানোর পাশাপাশি পর্যটন এলাকাসহ অঞ্চলভিত্তিক উন্নয়ন পরিকল্পনার আহ্বান জানান।
সংলাপটি পরিচালনা করেন দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের নির্বাহী সম্পাদক শাখাওয়াত লিটন এবং ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনালের উপপ্রধান প্রতিনিধি আমিনুল এহসান ধন্যবাদ জ্ঞাপনের মাধ্যমে আলোচনা শেষ করেন।


