কড়া নিরাপত্তাব্যবস্থা ভেদ করে ফ্রান্সের বিশ্বখ্যাত ল্যুভর মিউজিয়াম থেকে মহামূল্যবান গয়না চুরির ঘটনায় তোলপাড় পুরো বিশ্বে। চুরি কাণ্ডের পরদিন স্থানীয় সময় সোমবার জাদুঘরটি বন্ধ রাখে কর্তৃপক্ষ। এদিন জাদুঘর পরিদর্শনে আসা দর্শনার্থীদের মূল ফটক থেকেই ফিরিয়ে দেওয়া হয়।
সামাজিক মাধ্যমে এক বার্তায় ল্যুভর কর্তৃপক্ষ জানায়, যারা অগ্রিম টিকিট কেটেছিলেন, তাদের টাকা ফেরত দেওয়া হবে। ওই বার্তায় আরও জানানো হয়, ফ্রান্সে সাপ্তাহিক ছুটির দিন মঙ্গলবারও জাদুঘর বন্ধ থাকবে।
বার্তা সংস্থা এপি’র খবরে বলা হয়, স্থানীয় সময় রোববার, ল্যুভর মিউজিয়ামে স্মরণকালের সবচেয়ে বড় চুরির ঘটনা ঘটে। চোরেরা কৌশলে জাদুঘরে ঢুকে ফ্রান্সের সম্রাট নেপোলিয়ানের সময়ের বিভিন্ন গয়না চুরি করে পালিয়ে যায়।
জাদুঘর থেকে চুরি যাওয়া বস্তুগুলো হল- ১৯ শতাব্দীর রানী মেরি-অ্যামেলি ও হরটেন্সের ব্যবহৃত নীলা ডায়াডেম (দুষ্প্রাপ্য নীল হীরার গয়না), গলার হার এবং কানের দুল, সম্রাট নেপোলিয়ানের দ্বিতীয় স্ত্রী সম্রাজ্ঞী মেরি-লুইজের পান্নাখচিত গলার হার ও কানের দুল, সম্রাজ্ঞী ইউজেনির ডায়াডেম এবং ১৯ শতাব্দীর ফরাসি সম্রাটদের সময়কার বো টাইয়ের ব্রোচ।
এসময় সম্রাজ্ঞী ইউজেনির পান্না বসানো রাজমুকুটটি জাদুঘরের বাইরে পাওয়া গেছে। ধারণা করা হচ্ছে সেটিও চুরি করে পালানোর সময় চোরেরা জাদুঘরের বাইরে ফেলে গিয়েছিল। ওই মুকুটে এক হাজার ৩০০টিরও বেশি হীরা বসানো।

ল্যুভর কর্তৃপক্ষের প্রকাশিত সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, চোরেরা ঝুড়ির মতো লিফট (বাস্কেট লিফট) ব্যবহার করে জাদুঘরের সামনের দিকের জানালা ভেঙে ভিতরে প্রবেশ করে। এরপর তারা ডিসপ্লে কেস (প্রদর্শনী বাক্স) ভেঙে ওই গয়নাগুলো চুরি করেন।
কর্তৃপক্ষ জানায়, জাদুঘর দর্শনার্থীদের জন্য খুলে দেওয়ার ৩০ মিনিটের মধ্যে এ ঘটনা ঘটে। ওই গয়নাগুলো থেকে ২৫০ মিটার দূরেই ছিল বিশ্বখ্যাত ‘মোনালিসা’ চিত্রকর্ম। পুরো চুরির ঘটনাটি আট মিনিটেরও কম সময়ে শেষ হয়। চোরেরা চার মিনিটেরও কম সময় জাদুঘরের ভিতরে ছিলেন।
দেশটির সংস্কৃতি মন্ত্রী রাশিদা দাতি এই হাই প্রোফাইল চুরির ঘটনাকে একটি ‘পেশাদার অপারেশন’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, ‘পুরো ঘটনাটি কয়েক মিনিটের মধ্যে ঘটে গেছে। কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই তারা পালিয়ে গেছে।’

এই মন্ত্রী বলেন, ‘তারা সরাসরি ডিসপ্লে কেসগুলোতে গিয়ে হামলা করেছে। তারা আগে থেকেই ঠিক করে এসেছিল, তাদের ঠিক কী চাই। খুবই দক্ষতার সঙ্গে চুরির কাজ করেছে তারা।’
তিনি জানান, চুরির মূল লক্ষ্য ছিল ‘গিল্ডেড অ্যাপোলো গ্যালারি’। সেখানেই রাজা, বাদশাহ, সম্রাটদের ক্রাউন ডায়মন্ড (রাজমুকুট-হীরা) রাখা থাকে। ডিসপ্লে কাঁচ ভাঙ্গার সঙ্গে সঙ্গেই অ্যালার্ম বেজে ওঠে এবং নিরাপত্তাকর্মীরা তৎক্ষণাৎ ছুটে আসেন। তবে এর মধ্যেই চুরি শেষ করে জড়িতরা পালিয়ে যায়।
‘আমরা মোটরসাইকেল পেয়েছি, যেগুলোর নাম্বার প্লেট আছে। আমি নিরাপত্তা রক্ষীদের প্রশংসা করতে চাই, তারা চোরদের বাস্কেট লিফট পুড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টাটি ব্যর্থ করে দেন। এখান থেকে আমরা গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ উদ্ধার করতে পেরেছি’, বলেন দাতি।
জাদুঘরে নিরাপত্তা ব্যর্থতার কথা স্বীকার করেছেন ফরাসি বিচারমন্ত্রী জেরাল্ড দারমানিনও। তিনি বলেন, ‘একজন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে আমি জানি, সব জায়গাকে সম্পূর্ণভাবে সুরক্ষিত রাখা সম্ভব নয়। তবে গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় কঠোর নিরাপত্তার ব্যবস্থা করাও আমাদের দায়িত্ব। সত্যি বলতে- এখানে (ল্যুভর) আমরা ব্যর্থ হয়েছি।’
ইতিহাসের ভয়াবহতম চুরির ঘটনায় ফ্রেঞ্চ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরেন্ট নুনেজ ফ্রান্স জুড়ে সব জাদুঘর ও সাংস্কৃতিক স্থানগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা অবিলম্বে পুনর্মূল্যায়নের নির্দেশ দিয়েছেন।


