কয়েক মাস আগেও সংসারের স্বপ্ন বুনছিলেন প্রবাস ফেরত যুবক মাসুম বিল্লাহ (২৪)। কিন্তু জমিজমা বিরোধের জেরে নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন তিনি।
ঘটনার এক মাস পার হলেও অধিকাংশ আসামি গ্রেপ্তার হয়নি। নিহতের স্বজনরা বিচার পাওয়া নিয়ে শঙ্কায় ভুগছেন। উল্টো প্রাণনাশের হুমকিতে চরম নিরাপত্তাহীনতায় দিন কাটছে তাদের। গত ১৬ জুন নওগাঁ সদর থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন মাসুমের মা রুমি আক্তার।
নওগাঁ সদর উপজেলার শ্রীধরপুর গ্রামে গত ৬ বছরে জমি বিরোধে একে একে তিনজনকে হত্যা করা হয়েছে। মরদেহ উদ্ধারের ঘটনাস্থল অন্য জেলায় হওয়ায় সঠিক বিচার থেকে বঞ্চিত ভুক্তভোগী দুই পরিবার। আসামিদের বিচার না হওয়ায় তারা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। গত ২৬ মে মাসুম বিল্লাহকে হত্যা করা হয়।
রুমি আক্তার জানান, ২৬ মে বিকেলে জয়পুরহাটের তিলকপুর বাজারে যান মাসুম। রাতে বন্ধুর বাড়ি থেকে মোটরসাইকেলে ফেরার পথে খিরাহাটি রেলগেট এলাকায় তার ওপর হামলা হয়। ওত পেতে থাকা দুর্বৃত্তরা ধারালো অস্ত্র দিয়ে তার বুকে ও পিঠে আঘাত করে। নওগাঁ সদর হাসপাতালে নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়।
মাসুমের মরদেহ উদ্ধার হয় জয়পুরহাট জেলার আক্কেলপুর থানার সীমানায়। রুমি আক্তার বাদী হয়ে আক্কেলপুর থানায় ৮ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা আরও ২২ জনকে আসামি করে হত্যা মামলা করেন।
ভুক্তভোগীদের দাবি, এটি বিচ্ছিন্ন হত্যাকাণ্ড নয়। একই বিরোধে আরেকটি পরিবারের আরও দুই সদস্য নিহত হয়েছেন। প্রথম খুনের বিচার না হওয়ায় আসামিরা বেপরোয়া। স্বজন হারানোর বেদনা নিয়ে প্রহর গুনছেন রুমি আক্তার ও বিথি আক্তার।
মামলার আসামিরা হলেন নওগাঁর শ্রীধরপুর গ্রামের শিবলু (৩২), গোলাম মোস্তফা (৬৪), হানিফ (২২), আক্কেলপুরের নওজোর গ্রামের উজ্জ্বল মিয়া (৩৫), নওগাঁর ধোপাইকুড়ি গ্রামের ইয়াখিন আলী নান্নু (৫৫), শ্রীধরপুরের শাহাদৎ মণ্ডল (৫৫), আলম (৩৮) ও অলি হোসেন (২২)। আসামি ইয়াছিন আলী নান্নু তিলকপুর ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক। তিনি বিথি আক্তারের ভাই তপন মণ্ডল হত্যারও এক নম্বর আসামি।
রুমি আক্তার বলেন, ‘ছেলেকে হত্যার এক মাস হলো। আসামিরা প্রকাশ্যে ঘুরলেও পুলিশ ধরছে না। আমি সন্তানের হত্যার বিচার চাই।’
তার অভিযোগ, জমি নিয়ে ১২ বছর ধরে বিরোধ চলছিল। এর জেরেই মাসুমকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। বিএনপি নেতা নান্নুর মদদেই এসব হয়েছে। হত্যাকারীরা মেসেঞ্জারে ও প্রকাশ্যে হুমকি দিচ্ছে। সদর এলাকায় আসামিদের অবস্থান জানালেও পুলিশ ধরছে না। তথ্য আসামিদের কাছে পৌঁছে যাওয়ায় তারা দ্রুত স্থান পরিবর্তন করছে।
আরেক ভুক্তভোগী বিথি আক্তারের বাবা ফজলুর রহমান জমি বিরোধে ২০২০ সালে নিহত হন। ওই মামলার বাদী ও তার ভাই রতন মণ্ডলকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট হত্যা করা হয়। সর্বশেষ নিহত হন প্রতিবেশী মাসুম বিল্লাহ।
বিথি বলেন, ‘বাবা ও ভাইয়ের হত্যার বিচার পাইনি। এখন ভাতিজাকেও হারালাম। আমিই তাদের পরবর্তী টার্গেট। আসামি নান্নুর মদদেই সব হচ্ছে। আমার কিছু হলে নান্নুর জন্যই হবে।
তার অভিযোগ, আসামিদের অবস্থান জানালেও পুলিশ সময়ক্ষেপণ করছে, তথ্য ফাঁস হচ্ছে। আপোসের জন্যও বলা হচ্ছে। মামলার অন্যতম আসামি ইয়াছিন আলী নান্নু মামলাটিকে ‘মিথ্যা’ দাবি করে মিছিল করিয়েছেন।
সব অভিযোগ অস্বীকার করে ইয়াছিন আলী নান্নু মুঠোফোনে বলেন, ‘আমি চক্রান্তের শিকার। সব হত্যার বিচার চাই। জামিনে এসে মাসুম হত্যার সুষ্ঠু বিচারের দাবি জানিয়েছি। আমাকে নিয়ে রাজনীতি শুরু হয়েছে। আগামীতে চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন করব বলে আওয়ামী লীগ ও আমার দলের কিছু লোক সুনাম নষ্ট করছে।’ দুই হত্যা মামলায় আসামি হওয়ার প্রশ্নে চক্রান্তের কথা বলেন তিনি। বিথি আক্তারকে হুমকির বিষয়টি অস্বীকার করে তার দাবি, বিথি ডাকাতি ও মাদকের সঙ্গে জড়িত, তার নামে মামলা রয়েছে।
সদর মডেল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) খোরশেদ আলম বলেন, অভিযোগটি তদন্ত করা হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হুমকির প্রমাণ দিতে বলা হয়েছে। প্রমাণ পেলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই গনেশ চন্দ্র রায় বলেন, ‘বাদীপক্ষের দেওয়া তথ্য যাচাই করে আসামিদের গ্রেপ্তারে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। ইতিমধ্যে এক আসামিকে ধরা হয়েছে।’
আক্কেলপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহীন রেজা বলেন, নিহত ও আসামিরা নওগাঁর বাসিন্দা। জমি বিরোধের জেরেই ঘটনাটি ঘটেছে। ঘটনার রাতেই এক আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আসামি ইয়াছিন আলী নান্নু আদালত থেকে জামিনে আছেন। বাকিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।


