ইতিহাসের এক ভিন্নরকম বাঁকে দাড়িয়ে বিএনপি। দীর্ঘ প্রায় ২০ বছর নানা রকম চড়াই উৎরাই পার হয়ে আবারও সরকার গঠনের স্বপ্ন দেখছে তারা। অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি নেতাদের চোখেমুখে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার আত্মবিশ্বাস।
বিশেষ করে বিএনপির দীর্ঘদিনের চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী প্রয়াত খালেদা জিয়ার জানাজায় মানুষের মহাসমুদ্র, আর দেশে ফেরার পর তারেক রহমানের জনসভাগুলোতে মানুষের স্রোত দেখে দলের নেতাদের মধ্যে এই আত্মবিশ্বাস আরও জোরদার হয়েছে।
খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর দলের চেয়ারম্যান হয়েছেন তারেক রহমান, ক্ষমতায় গেলে তিনিই হবেন দেশের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী। গণমাধ্যমে প্রকাশ হওয়া কয়েকটি সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের জরিপে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের পূর্বাভাস দেওয়া হলেও এসব জরিপকে খুব একটা আমলে নিচ্ছে না বিএনপি।
প্রার্থী সংখ্যা
এবারের নির্বাচনে দেশের তিনশ’ আসনের মধ্যে ২৯১টিতে নিজেদের প্রার্থী দিয়েছে বিএনপি। বাকি ৯টি আসনে মনোনয়ন পেয়েছেন বিএনপি’র জোটসঙ্গী দলের প্রার্থীরা। অবশ্য একজন প্রার্থীর মৃত্যুতে শেরপুর-৩ আসনের নির্বাচন স্থগিত হয়ে যাওয়ায় ১২ ফেব্রুয়ারি ভোট হচ্ছে ২৯৯টি আসনে। দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান নির্বাচন করছেন বগুড়া-৬ ও ঢাকা-১৭ আসনে। এর আগে তিনি কখনো নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেননি।
শীর্ষ নেতাদের মধ্যে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নির্বাচনী আসন ঠাকুরগাঁও-১। এ ছাড়া দলের নীতিনির্ধারক স্থায়ী কমিটির সদস্যদের মধ্যে নির্বাচন করছেন খোন্দকার মোশাররফ হোসেন, মির্জা আব্বাস, ড. আব্দুল মঈন খান, মেজর (অব.) হাফিজউদ্দিন আহমেদ, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, এজেডএম জাহিদ হোসেন ও সালাহউদ্দিন আহমদ।
স্থায়ী কমিটির সদস্যদের মধ্যে শুধু দিনাজপুর-৬ আসনে কঠিন লড়াইয়ের মুখে পড়তে পারেন এজেডএম জাহিদ হোসেন। অন্য সদস্যরা সহজেই জয় পাবেন বলে মাঠপর্যায় থেকে জানা গেছে।
দুর্দশা থেকে উত্থান
নানা রকম বিতর্ক আর সমালোচনা মাথায় নিয়ে ২০০৬ সালে স্বাভাবিক মেয়াদ শেষে ক্ষমতা ছেড়েছিল বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার। এরপর থেকেই দুর্দশায় বিএনপি। প্রথমে সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও পরে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তাদের ওপর নেমে এসেছে ভয়াবহ নির্যাতন-নিপীড়ন। এ সময় নির্যাতনে অসুস্থ হয়ে দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন দলের দ্বিতীয় প্রধান ব্যক্তি তারেক রহমান। আওয়ামী লীগ সরকার পতনের আগে তিনি আর দেশে ফিরতে পারেননি।
দুর্নীতির অভিযোগে দায়ের করা মামলায় আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নিম্ন আদালতে দণ্ড পেয়ে কারাগারে গেছেন দলের চেয়ারপারসন তিনবারের বারের প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। কারাগারেই অসুস্থ হয়ে বারবার হাসপাতালে গেছেন, তবু তাকে চিকিৎসার জন্য বিদেশে যেতে দেওয়া হয়নি। দলের অন্যান্য শীর্ষ নেতারাও ছিলেন কারাগারের নিয়মিত যাত্রী। বলা যায় গত প্রায় ১৮ বছর বিএনপির জন্য ছিল দুঃস্বপ্নের রাত।
অতীতের নির্বাচনে বিএনপি
বিএনপির এই দুর্দশার সময় দেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়েছে চারটি। এরমধ্যে সেনাসমর্থিত তত্বাবধায়ক সরকারের আমলে তারা পেয়েছিল মাত্র ৩০টি আসন। ২০১৪ আর ২০২৪ সালের নির্বাচন বর্জন করে বিএনপি। মাঝখানে ২০১৮ সালে নির্বাচনে অংশ নিলেও কুখ্যাত সেই রাতের ভোটে আসন পেয়েছিল মাত্র ৭টি। ক্ষমতাসীনরা সংসদ থেকে বিএনপিকে প্রায় নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছিল। অথচ ১৯৯৬ সালে আন্দোলনের মুখে দেড় মাসের মাথায় ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হয়েও পরের নির্বাচনে ১১৬টি আসন পেয়েছিল এই দল।
বাংলাদেশের ইতিহাসে তর্কাতীতভাবে সবচেয়ে অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হয়েছিল ১৯৯১ সালে। রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন আহমদের নেতৃত্বে অস্থায়ী সরকারের আমলে অনুষ্ঠিত সেই নির্বাচনে ৩০ দশমিক ৮১ শতাংশ ভোট আর ১৪০ আসন নিয়ে ক্ষমতায় গিয়েছিল বিএনপি। ১৯৯৬ সালের ১২ জুনের নির্বাচনেও এই দলের প্রাপ্ত ভোট ছিল ৩৩ দশমিক ৬১ শতাংশ, আসন ছিল ১১৬টি। অর্থাৎ আগের চেয়ে তাদের ভোট বেড়েছে।
এর পর থেকে জামায়াতের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচনে অংশ নিয়েছে বিএনপি। ফলে এককভাবে বিএনপির প্রাপ্ত ভোটের হিসাব করা যায়নি।
নির্বাচনের প্রতিপক্ষ
এবারের নির্বাচনে বিএনপির প্রধান প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ নেই। এখন তাদের প্রধান প্রতিপক্ষ এক সময়ের মিত্র জামায়াতে ইসলামী। এই দলটি ১৯৯১ সালে ভোট পেয়েছিল ১২ দশমিক ১৩ শতাংশ, আসন পেয়েছিল ১৮টি। পরের বার ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে তাদের ভোট কমে দাঁড়ায় ৮ দশমিক ৬১ শতাংশে, আসন পেয়েছিল মাত্র তিনটি। ২০০১ সাল থেকে বিএনপির সঙ্গে জোটবদ্ধ নির্বাচন করায় তাদের দলীয় ভোটের হিসাব করা যায়নি। ভোটের অঙ্কে বিএনপির প্রতিপক্ষ হিসেবে ছোট দল জামায়াতে ইসলামী।
‘অদৃশ্য শত্রু’
তবে ভোটের মাঠে বিএনপির প্রধান শত্রু হিসেবে ওঠে এসেছে দুর্নীতি-চাঁদাবাজি আর দখলবাজির অভিযোগ। অতীতে দুইবার সরকার পরিচালনার সময় দুর্নীতিবাজ-চাঁদাবাজ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন বিএনপির অনেক নেতা। আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর আবারও বিএনপির অনেক স্থানীয় নেতা নিজ নিজ এলাকায় চাঁদাবাজি-দখলবাজিতে জড়িয়ে পড়েন। এসব ঘটনায় জড়িতসহ দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে প্রায় সাড়ে সাত হাজার নেতাকর্মীকে বহিষ্কার করেছে বিএনপি। তবে এরপরও চাঁদাবাজি-দখলবাজির অভিযোগ থেকে মুক্ত হতে পারছে না দলটি।
‘ঘরের শত্রু বিভীষণ’
এবারের নির্বাচনে বিএনপির এই ‘অদৃশ্য শত্রু’র সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নিজ দলের ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী। সারা দেশের ৭৫টি আসনে অন্তত ৮০ জন স্থানীয় নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন। মাঠপর্যায় থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই বিদ্রোহীদের মধ্যে অন্তত ৩০ জন দলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে জয়ী হবেন। অন্যান্য আসনের মধ্যে অন্তত ২০টিতে দলীয় ও বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থীর ভোট ভাগাভাগিতে সুবিধা পাবেন জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী।
এতসব হিসাব-নিকাশের মাঝেই বিএনপির শীর্ষ নেতারা এবারের নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ আসনে নিজ দলের প্রার্থীরা জয় পাবে বলে আত্মবিশ্বাসী। সেই ফলাফল অর্জনে দলের কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটি কাজ করে যাচ্ছে দিন-রাত। জেলা-উপজেলা থেকে শুরু করে ইউনিয়ন পর্যন্ত দলের কমিটিগুলোকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ভোটের দিন ভোরে ফজরের নামাজ পড়েই ভোটকেন্দ্র পাহারায় থাকতে বলা হয়েছে।
বিএনপির নেতারা তাদের বক্তৃতা-বিবৃতিতে ভোটকেন্দ্রে কারচুপি কিংবা ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’-এর অভিযোগ তুললেও দলের মহাসচিব বলেছেন, তারা তেমন কোনো ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’-এর আশঙ্কা করছেন না।


