ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন এলাকায় কোনো বাড়ির মালিক দুই বছরের আগে ভাড়া বাড়াতে পারবেন না। বাড়িওয়ালা ও ভাড়াটিয়াদের দীর্ঘদিনের বিবাদ নিরসনে নতুন ‘বাড়িভাড়া নির্দেশিকা’ তৈরি করেছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)।
মঙ্গলবার দুপুরে ডিএনসিসির নগর ভবনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এই নির্দেশিকার বিস্তারিত তুলে ধরেন উত্তর সিটির প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ। মূলত ১৯৯১ সালের বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইনের আলোকে এই নতুন গাইডলাইন তৈরি করা হয়েছে, যা কার্যকর হলে শহরের একটি বড় অংশের ভাড়াটিয়াদের জীবনযাত্রায় স্বস্তি আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, নতুন নির্দেশিকা অনুযায়ী কোনো বাড়ির মালিক দুই বছরের আগে ভাড়া বাড়াতে পারবেন না। ভাড়া পরিবর্তনের ক্ষেত্রে সময় হিসেবে জুন-জুলাই মাসকে নির্ধারণ করা হয়েছে। নির্দেশিকায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, বার্ষিক ভাড়ার পরিমাণ সংশ্লিষ্ট বাড়ির বাজারমূল্যের শতকরা ১৫ ভাগের বেশি হতে পারবে না। এছাড়া ভাড়া নেওয়ার সময় বাড়িওয়ালারা সর্বোচ্চ এক থেকে তিন মাসের ভাড়ার সমপরিমাণ টাকা অগ্রিম হিসেবে নিতে পারবেন।
আবাসন সংকটের চিত্র তুলে ধরে ডিএনসিসি প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ বলেন, প্রায় সাড়ে তিন কোটি মানুষের এই শহরে বাড়ির সংখ্যা মাত্র ২০ থেকে ২৫ লাখ। ফলে বিশাল একটি জনগোষ্ঠী ভাড়াটিয়া হিসেবে বসবাস করেন। গবেষণায় দেখা গেছে, আয়ের সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ আবাসন খাতে ব্যয় করা গ্রহণযোগ্য হলেও ঢাকায় অনেক ক্ষেত্রে তা ৫০ থেকে ৬৫ শতাংশে গিয়ে ঠেকছে। ১৯৯১ সালের আইনের যথাযথ প্রয়োগের অভাব ও অস্পষ্টতার কারণে এতদিন বাড়িভাড়া নিয়ে অরাজকতা চলে আসছিল, যা নিরসনে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
নির্দেশিকায় বাড়িওয়ালাদের জন্য বেশ কিছু বাধ্যবাধকতা রাখা হয়েছে। বাড়ির মালিককে অবশ্যই ঘর বসবাসের উপযোগী রাখতে হবে এবং গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির নিরবচ্ছিন্ন সংযোগ নিশ্চিত করতে হবে। নিরাপত্তার স্বার্থে শর্তসাপেক্ষে ভাড়াটিয়াকে ছাদ ও মূল গেটের চাবি প্রদানের নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, ভাড়াটিয়াদের প্রতি মাসের ১০ তারিখের মধ্যে ভাড়া পরিশোধ করতে হবে। বাড়িওয়ালা বাধ্যতামূলকভাবে ভাড়া প্রাপ্তির রসিদ প্রদান করবেন। বাড়িতে ভাড়াটিয়ার যেকোনো সময়ের প্রবেশাধিকার সংরক্ষিত থাকবে এবং কোনো পরিবর্তন বা শৃঙ্খলা রক্ষায় বাড়িওয়ালা পদক্ষেপ নিতে চাইলে ভাড়াটিয়ার মতামত নিতে হবে।
চুক্তিভঙ্গ বা উচ্ছেদের বিষয়ে নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, আবাসিক ভবনের ক্ষেত্রে চুক্তি বাতিল করতে হলে উভয় পক্ষকে দুই মাসের নোটিশ দিতে হবে। নির্দিষ্ট সময়ে ভাড়া পরিশোধে ব্যর্থ হলে মালিক প্রথমে মৌখিক সতর্ক করবেন। পরবর্তী ধাপে দুই মাসের লিখিত নোটিশ দিয়ে উচ্ছেদ প্রক্রিয়া শুরু করতে পারবেন। তবে সব ক্ষেত্রেই বাড়িওয়ালা ও ভাড়াটিয়ার মধ্যে লিখিত চুক্তিনামা থাকা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
বিবাদ নিরসনে স্থানীয় পর্যায়ের সম্পৃক্ততা বাড়াতে প্রতিটি ওয়ার্ডে বাড়িওয়ালা ও ভাড়াটিয়াদের সমন্বয়ে সমিতি গঠনের কথা বলা হয়েছে। কোনো সমস্যা দেখা দিলে প্রাথমিক পর্যায়ে এই সমিতিগুলোর মাধ্যমে আলোচনার ভিত্তিতে সমাধান করতে হবে। সেখানে সমাধান না হলে ভুক্তভোগী পক্ষ ঢাকা উত্তর সিটির সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে প্রতিকারের আবেদন জানাতে পারবেন।
সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং জটিলতা এড়াতে জোনভিত্তিক মতবিনিময় সভার আয়োজনও করা হবে।


