দেশের বিভিন্ন জায়গায় রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় সন্ত্রাসী হামলা, জমি দখল ও চাঁদাবাজির ঘটনায় গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছে নাগরিক সমাজ।
সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন জায়গায় রাজনৈতিক ও পেশিশক্তির প্রভাব খাটিয়ে ভূমি দখল, বাড়ি দখল, চরের খাস জমি দখলসহ বিভিন্ন বাড়িঘরে হামলার ঘটনা ক্রমবর্ধমান হারে বেড়ে চলেছে, যা জনমনে গভীর উদ্বেগ ও আতঙ্কের সঞ্চার করছে।
মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে তারা এ উদ্বেগ ও ক্ষোভ জানান। বিবৃতিতে স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে রয়েছেন আনু মোহাম্মদ, সুলতানা কামাল, খুশী কবির, শিরীন পারভিন হক, ড. ইফতেখারুজ্জামান, আবু সাঈদ খান, জেড আই খান পান্না, সারা হোসেন, শাহীন আনাম, শহিদুল আলম।
বিবৃতিতে তারা বলেন, ‘আমরা বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম থেকে জানতে পারছি, বিগত কিছুদিনে দেশের বিভিন্ন জেলায় ভূমি দখল, বাড়ি দখল চরের খাস জমি দখলসহ বিভিন্ন বাড়িঘরে হামলার ঘটনা অহরহ ঘটে চলেছে, যা কখনো হচ্ছে প্রকাশ্য দিবালোকে আবার রাতের অন্ধকারে। সম্প্রতি রাজধানীর মিরপুর-১ এর রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা, স্থাপনা ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে।’
রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারটি ১৯৭৪ সালে মিরপুরের সুবিধাবঞ্চিত ও নিম্ন আয়ের মানুষের মাতৃ ও শিশুসেবা দেওয়ার উদ্দেশ্যে কার্যক্রম চালিয়ে এসেছে। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি শিশুদের টিকাদান, শিশু স্বাস্থ্যসেবা, প্রজনন স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনাসহ বিভিন্ন সেবা দিয়ে আসছিল। এর রেশ না কাটতেই এবার রাজধানীর মোহাম্মদপুরে কয়েকশ’ লোক নিয়ে হামলা-ভাঙচুর করে জমি দখলের অভিযোগ উঠেছে, যোগ করেন তারা।
গাবতলী-সদরঘাট বাইপাস সড়কের পাশে মোহাম্মদপুর বেড়িবাঁধ সাতমসজিদ হাউজিং সংলগ্ন এলাকায় এ ঘটনা ঘটেছে। প্রায় দুই থেকে তিন ঘণ্টা ধরে তাণ্ডব চালিয়ে ওই জমিতে থাকা স্থাপনা ও হাউজিংয়ের অফিসে ভাঙচুর করে নগদ ১৫ লাখ টাকা, জমির দলিল, এসি, ফ্যান, জানালা-দরজা, আসবাবপত্রসহ মালামাল লুট করা হয় বলেও বিবৃতিতে বলা হয়।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, রাজধানীর ইসিবি চত্বরে কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের ‘ব্রাউনফিশ স্টুডিওতে’ হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। সালমানের অভিযোগ ‘সরকার দলীয়’ চাঁদাবাজদের চাঁদার টাকা না দেওয়ায় তার স্টুডিও ভাঙচুর করা হয়। এ ছাড়া পটুয়াখালির চরবাংলা, নোয়াখালির সদর উপজেলার ভাটিরটেক ও চরফ্যাশন, ভোলার চরসহ আরও নানা স্থানে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে সন্ত্রাসীরা চরে বসবাসরত ভূমিহীনদের উচ্ছেদ করে জমি দখলের কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে।
জমিতে থাকা ফসলও তারা রাতের অন্ধকারে লুট করে নিয়ে যায়। এ ছাড়া ছিনতাইয়ের ঘটনা ঢাকা মহানগরসহ সব বড়-ছোট শহরে আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলছে শিশু ধর্ষণ ও নারীদের বিরুদ্ধে সহিংসতা। পুলিশের পক্ষ থেকে কোনো কোনো এলাকাকে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা ঘোষণা করে সাবধানে চলাচল করার কথা বলা হয়েছে। এ সবই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আশঙ্কাজনক অবনতির ইঙ্গিত দেয়।
জনমনের দৃঢ় বিশ্বাস, এই সব ঘটনা শুধুমাত্র সন্ত্রাসী কার্যক্রমই নয়। এর সঙ্গে শাসকদলসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল সংশ্লিষ্ট প্রভাবশালী মহল, পতিত সরকারের সশস্ত্র অনুসারী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাংশ সরাসরি জড়িত, যা সারা দেশে মহামারির মতো ছড়িয়ে পড়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়।
এই সকল ঘটনার অবশ্যই দ্রুত উচ্চ পর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দোষী ব্যক্তি, গোষ্ঠী এবং তাদের দেশে-বিদেশে মদদ দাতা ও পৃষ্ঠপোষকদের চিহ্নিত করে কঠোর শাস্তির আওতায় আনতে হবে।
প্রত্যক্ষদর্শী জনগণ ও গণমাধ্যমের প্রতিবেদন থেকে এটা স্পষ্ট, কখনো বিভিন্ন রাজনৈতিক গোষ্ঠীর নিজস্ব বাহিনী, আবার কখনো ভাড়া করা বাহিনী দিয়ে তারা এসকল ঘটনা ঘটনাচ্ছে। জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যতই দাবি করুন না কেন সারা দেশে আইনশৃঙ্খলার উন্নতি হচ্ছে আদতে, তার বক্তব্যের সঙ্গে বাস্তবতার কোনো মিল নেই।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ‘আমরা তাই এই সন্ত্রাসী কার্যকলাপের প্রতিবাদ ও নিন্দা জানানোর পাশাপাশি স্পষ্ট ভাষায় বলতে চাই, এ সকল ঘটনায় শুধু স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নয়, সামগ্রিকভাবে সরকারের এর জাবাবদিহি করার দায় রয়েছে।’


