তীব্র গরমের কারণে বাংলাদেশের শ্রমজীবী মানুষের কর্মক্ষমতা কমছে। এর প্রভাব পড়ছে মানুষের স্বাস্থ্য ও দেশের অর্থনীতিতে। অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে উৎপাদনশীলতা কমে শুধু ২০২৫ সালেই বাংলাদেশের সম্ভাব্য আয়ের ক্ষতি হয়েছে আনুমানিক এক হাজার ৭৫০ কোটি মার্কিন ডলার।
জলবায়ু পরিবর্তন ও স্বাস্থ্য নিয়ে প্রকাশিত ‘ল্যানসেট কাউন্টডাউন রিপোর্ট ২০২৬’-এ এসব তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৬ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত তীব্র গরমের কারণে বাংলাদেশে প্রতিবছর গড়ে দুই হাজার ৬০০ কোটির বেশি সম্ভাব্য কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়েছে। নব্বইয়ের দশকের বার্ষিক গড়ের তুলনায় এই ক্ষতি ৭১ শতাংশ বেশি।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে শিশু, প্রবীণ ও খোলা জায়গায় কাজ করা শ্রমজীবী মানুষের ওপর। ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে শিশুরা বছরে গড়ে এক সপ্তাহের বেশি সময় (৭.৬ দিন) তাপপ্রবাহের মুখে পড়েছে। একই সময়ে ৬৫ বছরের বেশি বয়সী মানুষের ক্ষেত্রে এ সংখ্যা ছিল ৭ দশমিক ২ দিন।
১৯৮৬ থেকে ২০০৫ সালের গড়ের তুলনায় শিশুদের তাপপ্রবাহের সংস্পর্শে আসার সময় বেড়েছে ১৬২ শতাংশ। প্রবীণদের ক্ষেত্রে তা বেড়েছে ১৩৬ শতাংশ।
তীব্র গরমের কারণে প্রবীণদের মৃত্যুর অর্থনৈতিক ক্ষতিও বাড়ছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ৬৫ বছরের বেশি বয়সী মানুষের তাপজনিত মৃত্যুর কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বছরে গড়ে ৩৮০ কোটি ডলারের ক্ষতি হয়েছে।
এই ক্ষতির পরিমাণ প্রায় দুই লাখ ১৬ হাজার মানুষের এক বছরের আয়ের সমান। একই সঙ্গে ২০০০ থেকে ২০০৪ সালের গড় অর্থনৈতিক ক্ষতির তুলনায় তা প্রায় পাঁচ গুণ বেশি।
সোমবার ঢাকার ব্র্যাক সেন্টার ইনে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে ল্যানসেট কাউন্টডাউন প্রতিবেদনে বাংলাদেশের পরিস্থিতিসংক্রান্ত এসব তথ্য তুলে ধরা হয়।
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চ এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের জলবায়ু পরিবর্তন ও স্বাস্থ্য উন্নয়ন ইউনিটের সমন্বয়ক ইকবাল কবির।
গত দশকের তুলনায় ২০১৬ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত জলবায়ু পরিবর্তনজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও দ্রুত বেড়েছে। এ পরিস্থিতিতে জলবায়ুবিষয়ক নীতি প্রণয়ন ও অর্থ বরাদ্দের সিদ্ধান্তে জনস্বাস্থ্যকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়েছে।
তীব্র গরমের পাশাপাশি বায়ুদূষণও বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্যের ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি করছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালে মানবসৃষ্ট কর্মকাণ্ডের ফলে বাতাসের অতিক্ষুদ্র বস্তুকণার দূষণের সঙ্গে আনুমানিক দুই লাখ ৩৯ হাজার মানুষের মৃত্যুর সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
বাতাসে ভাসমান এসব অতিক্ষুদ্র কণা শ্বাসের সঙ্গে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলেও প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়।
২০১৬ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে এ ধরনের বায়ুদূষণসংশ্লিষ্ট মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েছে ৪০ শতাংশ। ২০২৩ সালে এসব মৃত্যুর ৩৭ দশমিক ৫ শতাংশের জন্য দায়ী ছিল কয়লা, তেল ও গ্যাসের মতো জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে সৃষ্ট দূষণ।
অন্যদিকে রান্না ও গৃহস্থালির কাজে সৃষ্ট ঘরের ভেতরের বায়ুদূষণের সঙ্গে ২০২৩ সালে ৭৭ হাজার ৫০০ মানুষের মৃত্যুর সম্পর্ক পাওয়া গেছে। ২০১৬ সালে এ সংখ্যা ছিল ৯০ হাজার ৭০০। অর্থাৎ এ ধরনের দূষণসংশ্লিষ্ট মৃত্যুর সংখ্যা কিছুটা কমেছে।
স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়লেও বাংলাদেশের জ্বালানিব্যবস্থায় কার্বন নিঃসরণের মাত্রা কমেনি। বরং ২০১৬ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে ব্যবহৃত জ্বালানির বিপরীতে কার্বন নিঃসরণের মাত্রা ৯ দশমিক ৯ শতাংশ বেড়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালে জীবাশ্ম জ্বালানিতে সরকারের নিট ভর্তুকির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫৩০ কোটি ডলার। এই অর্থ বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের বাজেটের ৫২ দশমিক ৯ শতাংশের সমান।
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ফন্ডাজিওনে সিএমসিসির পরিবেশ অর্থনীতিবিদ এবং গ্রান্থাম রিসার্চ ইনস্টিটিউটের অতিথি জ্যেষ্ঠ ফেলো শৌরো দাশগুপ্ত। তিনি ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা ও বায়ুদূষণের কারণে অর্থনীতি এবং জনস্বাস্থ্যের ওপর তৈরি হওয়া প্রভাব তুলে ধরেন।
পরিবেশ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক জিয়াউল হক বলেন, ‘ল্যানসেট কাউন্টডাউন রিপোর্ট ২০২৬’ জলবায়ু পরিবর্তনজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যপ্রমাণ তুলে ধরেছে। বিশেষ করে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বোঝার ক্ষেত্রে প্রতিবেদনটি গুরুত্বপূর্ণ।
সেন্টার ফর অ্যাডভান্সড স্টাডিজের নির্বাহী পরিচালক আতিক রহমান বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন ও জনস্বাস্থ্য সরাসরি সম্পর্কিত। ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা কর্মজীবী মানুষের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। একই সঙ্গে মা ও শিশুরা জলবায়ু পরিবর্তনজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে আরও বেশি অরক্ষিত হয়ে পড়ছে।
ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের ল্যানসেট কাউন্টডাউনের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক মারিনা রোমানেলো বলেন, পরিচ্ছন্ন জ্বালানির ব্যবহার এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রস্তুতিতে অগ্রগতি হলেও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব মোকাবিলায় বৈশ্বিক উদ্যোগ যথেষ্ট গতি পাচ্ছে না।
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চের ইমেরিটাস অধ্যাপক আইনুন নিশাত বলেন, প্রতিবেদনটি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ তথ্যপ্রমাণ দিয়েছে। তবে বাংলাদেশের বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়েই এসব ঝুঁকি মোকাবিলার উদ্যোগ নিতে হবে।
তিনি বলেন, ‘অনেক মানুষের তীব্র গরমের মধ্যেও খোলা জায়গায় কাজ করা ছাড়া কোনো উপায় নেই। বর্তমান হারে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বাড়তে থাকলে চলতি শতাব্দীর শেষ নাগাদ গড় তাপমাত্রা ৩ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বাড়তে পারে।’
আইনুন নিশাত স্বাস্থ্য খাতের জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দেন। বিশেষ করে খাদ্যনিরাপত্তা, পুষ্টি এবং মশা ও অন্যান্য বাহক প্রাণীর মাধ্যমে ছড়ানো রোগ প্রতিরোধে বিশেষ মনোযোগ দেওয়ার আহ্বান জানান।


