বজ্রপাত থেকে মানুষকে সুরক্ষা দিতে দেশের বজ্রপ্রবণ এলাকাগুলোতে বিশেষ আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করবে সরকার। বজ্রপাতের ঝুঁকি দেখা দিলে এসব কেন্দ্রে ৩০ মিনিট আগে সাইরেন বাজিয়ে সতর্ক করা হবে। কৃষকেরা গবাদিপশুসহ আশ্রয় নিতে পারবেন। জেলেরাও সাইরেন শুনে নিরাপদ স্থানে যেতে পারবেন।
বুধবার রাজধানীর বাংলাভিশন কার্যালয়ে এক গোলটেবিল বৈঠকে এ কথা বলেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু।
মুসলিম এইড-ইউকে বাংলাদেশের ফিল্ড অফিস, ইকো-সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (ইএসডিও) ও বাংলাভিশন যৌথভাবে ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক, কমিউনিটি-নেতৃত্বাধীন দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও জলবায়ু অভিযোজনকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপদান’ শীর্ষক এ বৈঠকের আয়োজন করে।
মন্ত্রী বলেন, দেশে প্রতি বছর বজ্রপাতে ৩০০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হচ্ছে। এ ঝুঁকি মোকাবিলায় সাইক্লোন শেল্টারের আদলে বিশেষ আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করা হবে।
বিদ্যমান আশ্রয়কেন্দ্রগুলোর ব্যবহার বাড়ানোর বিষয়ে তিনি বলেন, বছরের বেশির ভাগ সময় এসব কেন্দ্র অব্যবহৃত থাকে। সারা বছর ব্যবহারের উপযোগী করতে সমাজকল্যাণ ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা চলছে। মন্ত্রণালয় দুটি এ বিষয়ে ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে।
মন্ত্রী বলেন, সিলেট, ময়মনসিংহ, রংপুর, চট্টগ্রাম ও ঢাকা দেশের অন্যতম ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকা। ভূমিকম্প মোকাবিলায় এক লাখ স্বেচ্ছাসেবক তৈরির নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ইতোমধ্যে প্রায় ৭০ হাজার স্বেচ্ছাসেবকের তথ্যভান্ডার তৈরি হয়েছে। তাদের প্রশিক্ষণও শুরু হয়েছে।
তিনি বলেন, ঢাকায় ভূমিকম্প হলে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। রাজধানীর অনেক ভবন নির্মাণে নিয়মকানুন মানা হয়নি। এ দুর্যোগে মানুষকে নিরাপদ আশ্রয় দিতে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় ৪৪৫টি স্থান প্রস্তুত করেছে সরকার। এসব স্থান গেজেটভুক্ত করা হয়েছে।
উদ্ধারকাজের প্রস্তুতি হিসেবে সরকারি সংস্থার পাশাপাশি বড় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর যন্ত্রপাতির তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। উদ্ধারকাজে ব্যবহারের জন্য কার কাছে হেলিকপ্টার রয়েছে এবং বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে কতটি শয্যা আছে, সেই তথ্যও রাখা হয়েছে।
মন্ত্রী বলেন, দুর্যোগ মোকাবিলায় সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয় জরুরি। সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।
মন্ত্রী বলেন, প্রতি ঈদের আগে সরকার ভিজিএফ (ভালনারেবল গ্রুপ ফিডিং) সহায়তা দেয়। সারা বছর জিআর (জেনারেল রিলিফ) কর্মসূচির আওতায়ও ত্রাণ বিতরণ করা হয়।
তবে ত্রাণের সমন্বিত তথ্যভান্ডার নেই। কারা, কতটুকু ও কখন ত্রাণ পাচ্ছেন, তা যাচাইয়ের ব্যবস্থাও নেই। এ সমস্যা সমাধানে ত্রাণ কার্যক্রমের তথ্যভান্ডার তৈরির নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। শিগগিরই এ কাজ শেষ হবে বলে আশা প্রকাশ করেন মন্ত্রী।
বাংলাভিশনের ডেপুটি চিফ রিপোর্টার তাইমুর রহমানের সঞ্চালনায় বৈঠকে বক্তব্য দেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মুহাম্মদ আনোয়ার হোসেন, পানি উন্নয়ন বোর্ডের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. সাজ্জাদ হোসাইন, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী এ এইচ এম খালেকুর রহমান এবং সেভ দ্য চিলড্রেনের সিনিয়র ম্যানেজার সায়মন রহমান।
এ ছাড়া বক্তব্য দেন কেয়ার বাংলাদেশের ‘নবপল্লব’ প্রকল্পের চিফ অব পার্টি সেলিনা শেলী খান, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সাবেক মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবু নাঈম মো. শহীদুল্লাহ, মুসলিম এইড-ইউকে বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত হেড অব প্রোগ্রাম মো. আকরামুল হক, ইএসডিওর মো. মশিউর রহমান, বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার মো. আব্দুস সালাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জিল্লুর রহমান এবং সিপিডির অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান।
বৈঠকে আরও বক্তব্য দেন ইএসডিওর প্রকল্প ব্যবস্থাপক মো. শামসুল হক মৃধা, মুসলিম এইড-ইউকে বাংলাদেশের প্রকল্প সমন্বয়ক এস এম মনোয়ার হোসেন এবং সংস্থাটির কান্ট্রি ডিরেক্টর মুহসীন সিদ্দিকী।
বক্তারা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির কার্যকারিতা বাড়ানো, টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ, নিরাপদ পানির সংকট নিরসন এবং দুর্যোগসহনশীল জীবিকার প্রসারে গুরুত্ব দেন। পাশাপাশি আশ্রয়কেন্দ্রের ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন, দুর্যোগ মোকাবিলায় অর্থায়ন ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করার বিষয়ে আলোচনা করেন।
তারা দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাসের পরিকল্পনা ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ের উন্নয়ন পরিকল্পনা এবং বাজেটে অন্তর্ভুক্ত করার সুপারিশ করেন। স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বাড়ানো এবং পানি ও স্যানিটেশন অবকাঠামোর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের ওপরও গুরুত্ব দেন।
দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও জলবায়ু অভিযোজনের উদ্যোগ টেকসই করতে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও উন্নয়ন সহযোগীদের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর তাগিদ দেন বক্তারা। কার্যকর উদ্যোগগুলো বৃহত্তর পরিসরে ছড়িয়ে দেওয়া এবং স্থানীয় পরিকল্পনা ও নীতিমালার সঙ্গে সমন্বয়ের ওপরও গুরুত্ব দেন তারা।


